নতুন কৌশলে এগোতে চায় বিএনপি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

নতুন কৌশলে এগোতে চায় বিএনপি

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০১৮

নতুন কৌশলে এগোতে চায় বিএনপি

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও আগামী নির্বাচন- এই দুই এজেন্ডায় নতুন কৌশলে এগোবে বিএনপি। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে নেয়া হবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ। সরকারের ওপর জনমত ও আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর চাপ তৈরিতে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি বৃহত্তর প্ল্যাটফরম। কূটনৈতিক মহলের পাশাপাশি তৎপরতা চালানো হচ্ছে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজে। খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বিলম্বের সূত্র ধরেই নতুন এ কৌশল নিয়েছে দলটি। আর সবকিছুই পরিচালিত হচ্ছে, একটি সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে।
টিম গঠনের মাধ্যমে নেতাদের দেয়া হবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব। বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা জানান, চেয়ারপারসনের কারামুক্তি ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আদায়ে কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রাথমিকভাবে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান করে আন্দোলন ও আলোচনার পথে চলবে বিএনপি। পাশাপাশি প্রস্তুতি নেবে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলোর আয়োজন ও বাস্তবায়নে। এককভাবে নয়, জোটসহ দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের মনোভাব এবং পরামর্শকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সে পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান করা হবে। এ ব্যাপারে একটি নীতিগত অবস্থানে পৌঁছাতে ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে আগামীকাল বিকালে চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম মহাসচিবদের অংশগ্রহণে সে বৈঠকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সার্বিক নির্দেশনা দেবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আদায়ের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের বিশেষ একটি উদ্যোগের ভেতর দিয়ে শিগগিরই কয়েকটি দেশ সফর করবে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের এক বা একাধিক প্রতিনিধিদল।
বিএনপির দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা জানান, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পারতো বিএনপি। কিন্তু আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সে পথে এগোয়নি তারা। এ পর্যন্ত আইনের সর্বজনস্বীকৃত পথেই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। আপাতদৃষ্টিতে সেখানে কিছুটা সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হলেও বাস্তবে আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন। এখানে কোনো গাফিলতি করা হচ্ছে না। এ মামলাটির প্রতি দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও সারা দেশের মানুষের কৌতূহলী সজাগ দৃষ্টির কারণে ইচ্ছাকৃত গাফিলতির সুযোগও নেই। তারপরও বিলম্ব হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তি। কারণ পদে পদে নতুন নতুন ফাঁক-ফোকর বের করে কৌশল করছে সরকার। খালেদা জিয়ার মামলায় প্রভাব বিস্তারের সবধরনের লক্ষণ পরিষ্কার। তারপরও আগামীদিনগুলোতে আইনি লড়াইয়ে আরো বেশি সমন্বয় এবং কৌশলের প্রয়োগ ঘটাবেন আইনজীবীরা। নেতারা বলেন, হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার জামিন বিলম্বের গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছিল না। আইনগত ভিত্তি, মৌলিক অধিকারসহ সবগুলো দিকই ছিল খালেদা জিয়ার জামিনের অনুকূলে। কিন্তু রেওয়াজ ভেঙে, নিম্ন আদালতের নথির জন্য অপেক্ষার নতুন নজির সৃষ্টি করে আটকে রাখা হয়েছে তার মুক্তি। এ ঘটনাকে সরকারের আগামীদিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি লক্ষণরেখা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এটা বিএনপিসহ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনায় খুলে দিচ্ছে নতুন দিগন্তের দ্বার। আইনজীবী নেতারা জানান, আইনি লড়াইকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এপথেই সাফল্য অর্জন করতে চাইছে বিএনপি। তাই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় খালেদা জিয়ার মামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ বা পরোক্ষ আইনি পরামর্শের জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইতিমধ্যে দু’জন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল খালেদা জিয়ার পক্ষে লড়তে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন আইনজীবী আশ্বস্ত করেছেন তারা প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শ দেবেন। প্রাথমিকভাবে এটাকে একটি বড় অর্জন বিবেচনা করছে বিএনপি। কারণ দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের এ ইতিবাচক মনোভাব কেবল আদালতেই নয়, রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্বাস করে তারা। দলটির নেতারা জানান, কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তিই নয়, দলের কারাবন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তিতে আইনি লড়াই জোর করতে আইনজীবীদের তাগিদ দিয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের যথাসম্ভব আইনি জটিলতা ও কারামুক্ত রাখতে চায় বিএনপি। পাশাপাশি দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলোর দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
দলের দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মসূচিকেন্দ্রিক একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরির জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। এ প্ল্যাটফরমে কেবল দুই জোটের বাইরের দলগুলোই নয়, সরকারের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রথমদিকে দুই জোটের বাইরে থাকা দলগুলো খুব আগ্রহ না দেখালেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের দিক থেকেও প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে বিএনপি। কেবল বিএনপি নেতারাই নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গড়ে তুলতে কাজ করছেন কয়েকটি রাজনৈতিক দল, বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিক নেতা ও পেশাজীবীরা। দেশে ও দেশের বাইরে চলছে সে প্রক্রিয়া। বৃহত্তর প্ল্যাটফরমটি গড়ে তুলতে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে রাজনৈতিক দলগুলো ও সুশীল সমাজকে নানা বিষয়ে আশ্বস্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। নেতারা জানান, দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও জোর তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি। তারই অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর কূটনীতিকদের ডেকে আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করছে বিএনপি। অনানুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন। বিএনপির কূটনীতিক উইংয়ে দায়িত্বপালনকারী একজন সিনিয়র নেতা জানান, বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ব্যাপারে এখনো কূটনীতিকদের অবস্থান পরিষ্কার নয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তারা উপলব্ধি করতে পারছেন দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কয়েকজন কূটনীতিক নানা ফোরাম ও ব্রিফিংয়ে তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। কূটনীতিকদের এমন উপলব্ধিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করছে বিএনপি। আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের একটি অংশ হিসেবে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ও ইউরোপীয় কমিশনের সহায়তা চেয়েছে বিএনপি। এ জন্য সংস্থা তিনটিকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বানও জানিয়েছে দলটি। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি বুধবার সংস্থা তিনটির প্রধানের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, যে মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা দেয়া হয়েছে এ মামলাটি করার ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এটি রাজনৈতিক রায়। মাইনাস টু ফর্মুলার উদ্দেশ্যে বিগত ওয়ান-ইলেভেন সরকার এ মামলা করেছিল। জামিনযোগ্য মামলায় সরকারের হস্তক্ষেপে জামিন দেয়া নিয়েও শঙ্কার কথা জানানো হয়েছে চিঠিতে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ দেশে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির মতো আরেকটি একতরফা নির্বাচন করতে চাইছে। যাতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত ও সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমঝোতা বৈঠকটি ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দেশে জনমত আরো জোরদার করতে অনানুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিক সফর করছেন বিএনপি নেতারা। পাশাপাশি সাংগঠনিক সফর করছেন বিএনপি সমর্থক পেশাজীবী নেতারাও। নেতারা জানান, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর দলের ঐক্য অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি সুসংহত। নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে এখন এককাতারে অবস্থান করছেন। নেতারাও কথা বলছেন একই সুরে। আগামী দিনে সবার বক্তব্যের সুর যেন একমুখী হয় সে ব্যাপারে নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আগামী দিনে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরো বেশি সতর্ক এবং সহনশীল হবে বিএনপি। সরকারি উস্কানি বা দলের তরুণ নেতাদের অতিউৎসাহে নৈরাজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয় এমন কোনো কর্মসূচিতে যাবে না। আগামীতে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আদায়সহ জাতীয় ও আঞ্চলিক সমস্যাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়া হবে।
নেতারা জানান, সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন আদায়ে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতিও শুরু করবে বিএনপি। চূড়ান্ত নির্বাচনী প্রচারণায় তুলে ধরতে মন্ত্রণালয়ওয়ারি বর্তমান সরকারের অনিয়মসহ নানা তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব কাজে সহায়তা করছে। এছাড়া দলের তরফে জনমত জরিপ, প্রার্থী জরিপসহ কৌশলী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিগত ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে কখনো কখনো ‘শাপেবর’ শব্দটি খুবই অর্থবহ হয়ে উঠে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার রায়, কারাগারে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয়ায় কার্পণ্য এবং উচ্চ আদালতে তার জামিনের ক্ষেত্রে নজির সৃষ্টিকারী বিলম্ব সবকিছুই বিএনপির জন্য হয়ে উঠছে- শাপেবর। খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর সকল আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দলটির তরফে কোনো কঠোর কর্মসূচি না আসা এবং নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কারণে মানুষের অপ্রত্যাশিত সমর্থন পেয়েছে বিএনপি। দলটির ব্যাপারে উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেয়ার যে প্রোপাগান্ডা আন্তর্জাতিক মহলে প্রায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সে ব্যাপারে নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক মহলে। আর এ ইতিবাচক মনোভাব ও ক্রমবর্ধমান জনসমর্থনকে ভিত্তি ধরে এগোনোর সুযোগকে নিশ্চয় হাতছাড়া করবে না বিএনপি।