নবীগঞ্জে দৃষ্টিনন্দন নহরপুর জামেয়া মসজিদ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

নবীগঞ্জে দৃষ্টিনন্দন নহরপুর জামেয়া মসজিদ

প্রকাশিত: ৫:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২১

নবীগঞ্জে দৃষ্টিনন্দন নহরপুর জামেয়া মসজিদ

 

মোঃ হাসান চৌধুরী নবীগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।
গোর-আজাব থেকে এ গুনাহগার পাইবে রেহাই।
কত পরহেজগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত
ঐ মসজিদে করে রে ভাই, কোরআন তেলাওয়াত।
সেই কোরআন শুনে যেন আমি পরান জুড়াই।।
সুফি কবি কাজী নজরুল ইসলামের এমন আকুতি প্রতিটি মুমিন-মুসলমানের হৃদয়ে দুলা দেয় ।এ যেন প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ের কথা শেষ সমাধির চাওয়া ।মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের ধারা শুরু হয় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ইসলাম প্রচারের সময় থেকে। আরবের পবিত্র নগরী মদিনা মনোয়ার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত কুবা বা মসজিদে কিবলাতাইন হলো পৃথিবীর প্রথম মসজিদ।মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসার পর এই মসজিদ তৈরি হয়।বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে নান্দনিক ইসলামিক স্থাপনা। এসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মসজিদ।মুসলমানদের কাছে মসজিদ যেমন আধ্যাত্বিক প্রশান্তি ইবাদাত -বন্দিগীর কেন্দ্রবিন্দু ঠিক তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশা-পাশি মসজিদ গুলো বহন করে ইসলামের অতীত ঐতিহ্য-স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্যের নিদর্শন।তেমনি এক দৃষ্টিনন্দন নহরপুর জামেয়া মসজিদ ইসলামের নিদর্শনের এক সুন্দরতম স্থাপনা।মসজিদটি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ পৌর; এলাকার নহরপুর গ্রামে অবস্থিত। প্রায় দুই একর জায়গা নিয়ে ১৯৯৬ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকালে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থ ছিল ৭০ ফুট। মসজিদটিকে বেশ কয়েকবার সংস্করণ করা হয়েছে। প্রথমাবস্থা থেকেই এর আকৃতি ছিল আয়তাকার। মসজিদের উপরিভাগে বৃত্তাকার বিশাল একটি গম্বুজ রয়েছে, গম্বুজটি নীল রঙের মদিনা মনোয়ার আধলে। রয়েছে সুউচ্চ মিনার যা প্রায় ৫ তালা বাড়ীর সমান হবে তার উপর রয়েছে আরেকটি নীল রঙের গম্বুজ ।এই আকর্ষণীয় মিনার ও গম্বুজটির কারণেই মূলত মসজিদটি সাবার কাছে সুন্দরতম ।নানা কারুকাজ,আধুনিক টাইলস ও বর্ণিল আলোর ঝলকানিতে রাতে মসজিদটি হয়ে ওঠে আরও সুন্দর।মসজিদের পূর্ব দিক এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিক কাচের গেরা জানালা এবং বিতরে পাঁচটি এবং প্রধান একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। বিতরের পাঁচটি দরজা কাঠের শৈল্পিক কারোকাজ খুদাই করা। মসজিদটির বিতরটি আরো মনোমুগ্ধকর, রয়েছে আধুনিক টাইলস শিল্পের জ্বলমলে টাইলস ।টাইলসের উপর খুদাই করা রয়েছে সোনালি আরবি হরফে পবিত্র আল কোরআনের আয়াত সমূহের নকশা।এবং পবিত্র কাবা শরিফ মদিনা মনোয়ার নীল গম্বুজ ও মিনার রয়েছে টাইলসের উপর খুদাই করা । টাইলসের উপরে বড় করে লেখা রয়েছে সোনালি আরবী হরফে “বিসমিল্লাহীর রাহমানির রাহিম” যা মসজিদটির বিতরের সুন্দর্য আরো বাড়ীয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ । শীতাতাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য রয়েছে ১৪টি ফ্যান।এছাড়াও ডিজিটাল ঘড়ি,পবিত্র কোরআন ও ইসলামিক বই রাখার জন্য রয়েছে দুটি বুক সেলফ ।রাতের আলোক সজ্জার জন্য ৭০-৮০ টি আধুনিক লাইটিং ।দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদে মূল সৌন্দর্য ও আকর্ষণ হচ্ছে রাতে আধুনিক লাইটিং এর নানা রঙের ঝলকানি যা মুগ্ধ করে পথ-চারী ও মুসল্লীদের।ঈমাম ও মুয়াজ্জীন তাকার জন্য রয়েছে একাদিক কক্ষ।এছাড়াও রয়েছে আধুনিক ওজু খানা যাতে এক সঙ্গে অনেক মুসল্লীরা ওজু করতে পারেন,প্রায় ২০ শতাংস জায়গা নিয়ে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর ।মসজিদটিতে জুমাতুল বিদা, ঈদ ও বিশেষ নামাজে এক সঙ্গে প্রায় হাজারেরও অধিক মুসল্লী অংশ গ্রহন করতে পারেন ।এদিকে ২০২১ সালে এ.ডি.পি’র অর্থায়নে মসজিদটির ঈদগাঁও সৌন্দর্যবদনের কাজ সংস্কার করা হয়।বর্তমানে মসজিদের ঈদগাঁসহ দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট ও প্রস্থ ৬০ ফুট ।২০২১ সালের ১৫ই মার্চ পুরনো এই মসজিদের ঈদগাঁ ও সৌন্দর্যকরণ কাজের শুভ উদ্বোধন করেন, নবীগঞ্জ পৌর; মেয়র আলহাজ্ব ছাবির আহমেদ চৌধুরী।নহরপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বারা গঠিত কমিটি বর্তমানে এই মসজিদটিকে পরিচালনা করছেন। মসজিদের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন, জাতীয় শ্রমিকলীগের নবীগঞ্জ উপজেলা সভাপতি-মো; আব্দাল করিম ,সহ-সভাপতি মো; মহিনুর রহমান ,সাধারন সম্পাদক-মো;ছায়াদ আহমেদ ,অর্থ-সম্পাদক, মো; জহুরুল ইসলাম রাহুল, সদস্যবৃন্দ; মো;সিরাজ মিয়া,আব্দুল রউফ মিয়া , মো; তাজ উদ্দিন ,মো; ফজলু মিয়া ,মো; চনর মিয়া,মো; আব্দুল জব্বার,মোহিতুর রনি,মো; সুমন আহমেদ,মো; কলিম উল্লাহ ,জয়নাল আবেদিন, আফজল মিয়া ,মো;আব্দুল রহিম, মো;কনর মিয়া ,মো; আকল মিয়া, অলি আহমেদ , প্রমূখ ।এছাড়াও মসজিদটির পরিচ্ছন্নতাও সার্বিক দেখভাল করছেন, মো; সাহেল মিয়া,মো; দোলন মিয়া,মো;পারসু মিয়া।মসজিদটির বর্তমান ঈমান হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন,তরুন উদিয়মান ইসলামিক লেকচারার,নহরপুর গ্রামের কৃতিসন্তান হযরত মাওলানা মো; আমির হোসাইন আবুহুরাইরা (আল হাদীস-সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা) ।মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদ ।রাসুল (সা.) হিজরতের প্রথম দিনই মসজিদ নির্মাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। মদিনায় হিজরতের সময় যাত্রাবিরতিকালে তিনি কুবা নামক স্থানে ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে মদিনায় পৌঁছে তিনি মসজিদ-ই-নববী স্থাপন করেন। এবং সেখান থেকেই ইসলামের জ্যোতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন।মসজিদ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারীদের মহান আল্লাহ ভীষণ পছন্দ করেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন (বুখারি, হাদিস : ৪৫০)। মসজিদ নির্মাণ এমন একটি পুণ্যময় কাজ, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যত দিন সেই মসজিদে আল্লাহর ইবাদত হবে, তত দিন নির্মাণকারী এর সওয়াব পেতে থাকে। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা বোঝা যায়, মসজিদ নির্মাণ অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আল্লাহর প্রিয় হওয়ার মাধ্যম। কিন্তু শর্ত হলো, এতে কোনো রকমের অহমিকা, গৌরবের বিষ অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা যাবে না। মসজিদ নির্মাণ করতে হবে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মসজিদ নিয়ে অহংকার করা কিয়ামতের আলামত। লোকেরা মসজিদ নিয়ে পরস্পর গৌরব ও অহংকারে মেতে না উঠা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না বলেও হাদিস শরিফে এরশাদ রয়েছে (সূত্র আবু দাউদ, হাদিস : ৪৪৯)।তাই আমাদের উচিত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় মসজিদ নির্মাণ করা। কারো সেই সামর্থ্য না থাকলে কমপক্ষে সহযোগিতা করবে। মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে আত্মনিয়োগ করবে। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, মুসল্লিদের মসজিদে এসে নামাজ পড়া এবং দাওয়াত দেওয়ার মাধ্যমে নামাজ কায়েম করা। আল্লাহকে ভুলে যাওয়া মানুষদের আল্লাহর পথে নিয়ে আসা। মসজিদের সঙ্গে তাদের মন সম্পৃক্ত করে দেওয়া।কিয়ামতের দিন সেসব মানুষকে আরশের ছায়ায় স্থান দেওয়া হবে, যাদের অন্তর মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই সৌভাগ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল