নিখোঁজ ইলিয়াস আলীঃঅপেক্ষার শেষ কোথায়? –দিদার ইবনে তাহের – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

নিখোঁজ ইলিয়াস আলীঃঅপেক্ষার শেষ কোথায়? –দিদার ইবনে তাহের

প্রকাশিত: ৮:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৬

নিখোঁজ ইলিয়াস আলীঃঅপেক্ষার শেষ কোথায়? –দিদার ইবনে তাহের

13022423_1309429045750736_355962223_nলস্কর। ১৭এপ্রিল ২০১২! ভোর রাত থেকেই মিডিয়ার কল্যাণে চারিদিকে আচমকা অবিশ্বাস্য এক দুঃসংবাদ।কিন্তু ধীরেধীরে সেই অবিশ্বাস্য সংবাদটিই সত্য হল।ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল সারা দেশ।মিছিল মিটিং অবরোধ বিক্ষোভে সারাদেশের ন্যায় অচল হয়ে গিয়েছিল গোটা সিলেট।সকাল ৮টার মধ্যেই পাড়া মহল্লা থেকে বিএনপি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পাশাপাশি সাধারন জনগনের খন্ড খন্ড মিছিল আর জমায়েতে লোকে লোকারন্ন হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্ট।এমনকি দলের অভ্যন্তরিন সকল মতানৈক্য ভূলে সকলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে প্রায় অচল হয়ে পড়ে গোটা শহর। সাধারন জনগনের স্বতঃস্ফুর্ত সমর্থন আন্দোলনের মাত্রাকে আরো বেগবান করে তুলে।আন্দোলনের তীব্রতায় জনরোষে দিশেহারা প্রশাসনের নির্দয় বোলেটের আঘাতে মূহুর্তেই ঝরে পড়ে বিশ্বনাথের তিন তিনটি তাজা প্রান। তারপরেও যখন নিয়ন্ত্রন প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল তখন বাড়ানো হয় রাস্ট্রীয় বন্দুকদারী অতিরিক্ত বাহিনী।তবুও উত্তাল যেন বাড়তেই থাকে বিশ্বনাথের মাটিতে।যেখানে জন্মগ্রহন করেছিলেন অলংকারী ইউনিয়নের অলংকার,রামধানা গ্রামের গর্বিত ধন,সূর্যবান বিবির কোলে জন্ম নেয়া সূর্য সন্তান কিংবদন্তি জাতীয় নেতা এম ইলিয়াস আলী। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামধনা গ্রামে জন্মগ্রহনকারী এম ইলিয়াস আলী শিশু কাল থেকেই ছিলেন মেধাবী এবং আত্বপ্রত্যয়ী। স্হানীয় রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন শেষে সিলেটের সুনামধন্য মুরারি চাঁদ(এমসি)কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে ভর্তি হন ঐতিহাসিক মেধার কোষাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।কলেজ জীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকা অবস্তাতেই স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সফল নেতৃত্বদানের মাধ্যমে ছাত্র সমাজের আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হন। এরই প্রেক্ষিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ আস্তাভাজন এই তুখোড় ছাত্রনেতা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১ম নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক হিসেবে ছাত্ররাজনীতির উজ্জল ইতিহাসে স্হান করে নেন। পরবর্তীতে পরিণত বয়সে বিএনপির রাজনীতিতে হাল ধরেন কিংবদন্তী এই সাবেক ছাত্রনেতা।১৯৯৬ সাল এবং ২০০১সালের জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-২(বিশ্বনাথ-বালাগজ্ঞ-ওসমানীনগর) আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বিচিত হন। দক্ষতা,পরিশ্রম আর কর্মগুনে নিজের নির্বাচনী এলাকার বৈপ্লবিক উন্নয়নের পাশাপাশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন গোটা সিলেটবাসীর হৃদয়ে। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচিত হয়ে দ্বায়িত্ব গ্রহন করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে।দলের ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে দলের জাতীয় নির্বাহি কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।তৃনমূল পর্যায় থেকে সুসংগঠিত করে সংগঠনকে মজবুত ভিত্তিতে দাড় করিয়েছিলেন তৃনমূলের এই কর্মীবান্ধব নেতা। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি সরাসরি নেতাকর্মীদের পাশে থেকে মনবল জোগান দিতেন তিনি। যার প্রমান তাঁর সময়ে বাকশালী সরকার বিরোধী প্রতিটি হরতালে অচল থাকতো গোটা সিলেট।দল ঘোষিত যে কোন বিক্ষোভ সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিনত হত, তাঁর আপোষহীন বিদ্রোহী কণ্ঠের বক্তব্য শুনার জন্য দলের নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণের লক্ষণীয় উপস্তিতি থাকত সবসময়। দীর্ঘ ৪ বৎসর থেকে দলের নেতাকর্মী সহ দেশবাসীর উত্তর না জানা একটাই প্রশ্ন, কেন ইলিয়াস আলীকে অপহরন করে গুম করা হয়েছে?? -তাঁর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তাই কি তাঁর অপরাধ? -ভারতের টিপাইমুখঁ বাধ বিরোধী আন্দোলনকে তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন যা জাতীয় আন্দোলনে রুপ ধারন করেছিল, এটিই কি তাঁর অপরাধ? -দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঢাকা থেকে সিলেটে ২০১১সালে দেশের সর্ববৃহৎ লংমার্চ এবং স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসভার সফল অায়োজনই কি তাঁর অপরাধ? -ক্ষমতাসীন সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে আপোষহীন বিদ্রোহী কণ্ঠরোধের জন্যই কি তাঁকে গুম করা হয়েছে? -বিএনপিকে সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল এবং নেতৃত্বশূন্যের উদ্দ্যেশে কি তাঁকে গুম করা হয়েছে? রাষ্ট্রীয় মসনদ দখল করে রাখা ক্ষসতাসীনদের যেখানে রাষ্ট্রের জান-মালের হেফাজত রাখার দ্বায়িত্ব এবং কর্তব্য সেখানে এ রকম হাজারো প্রশ্নের জবাব আজ উত্তরহীন প্রশ্নের মধ্যেই আটকা পড়ে রয়েছে! নিখোঁজের পরপরই অবুঝ শিশু-সন্তানদের সাথে নিয়ে নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানের আকুতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার তাহসিনা রুশদীর লুনা যখন প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে আশ্বস্তকরে বলেছিলেন, স্বজন হারানোর বেদনা আমিই বুঝি।কিন্তু দীর্ঘ ৪বৎসর অতিবাহিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে আজও কোন স্বদুত্তর পায়নি নিখোঁজ এই নেতার স্বজনেরা।ছেলে-মেয়েদের দিনের পর দিন কাটছে প্রিয় বাবার স্নেহময়ী আদর পাওয়ার আশায়,সন্তানহারা মা আজ শয্যাশায়ী প্রিয় সন্তানের অপেক্ষায়,স্বামীর অপেক্ষায় স্ত্রীর চোখের জল আজ শেষ হয়নি,কবে ফিরছেন ইলিয়াস সেই অপেক্ষায় স্বজনরা এখনও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করছেন।হাজারো নেতাকর্মী,ভক্ত,অনুসারীএবং সাধারণ জনগন এখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কবে ফিরবেন প্রিয়নেতা? আজ সেই দুঃস্বপ্নের ৪৮মাস বা ৪ বছর পূর্ণ হল কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি এম ইলিয়াস আলী এবং তাঁর গাড়ী চালক আনসারের! নিজের পারিবারিক এবং কর্মস্তলের শত ব্যস্ততার পরেও দলের নেতাকর্মী এবং নির্বাচনী এলাকার জনগনকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে আগলে রেখেছেন এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেত্রী,বর্তমান কেন্দ্রীয় বিএনপি নেত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনি।সকল গুম,হত্যার বিচার কোন না কোন সময় হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।সরকার এই গুমের দায় এড়াতে পারেনা।সরকারেরই দ্বায়িত্ব এই গুমের রহস্য উদঘাটন করে নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর সন্ধান দেয়া। আত্বীয়-স্বজন,দলের নেতাকর্মী সহ সর্বসাধারণের প্রাণের দাবী অবিলম্বে জননেতা ইলিয়াস আলী,তাঁর গাড়ী চালক আনসার আলী,ছাত্রদলনেতা ইফতেখার আহমদ দিনার,জুনেদ আহমদ সহ গুম হওয়া সকলকে অক্ষত এবং জীবন্ত অবস্ততাতেই ফেরত চাই। কিন্তু সেই প্রশ্ন থেকেই যায়, এ অপেক্ষার শেষ কোথায়?