নির্বাচন করতে পারবেন তারেক? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

নির্বাচন করতে পারবেন তারেক?

প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০১৬

নির্বাচন করতে পারবেন তারেক?

tarek_rehmanপরবর্তী জাতীয় সংসদসহ সব ধরনের নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্য। দুর্নীতির মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় পরবর্তী নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ হলেন দলটির দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এই সাজা না হলে তারেক লন্ডনে পলাতক অবস্থায়ই নির্বাচন করতে পারতেন।
নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের ১২ ধারায় প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা অংশে বলা হয়েছে, ফৌজদারি আইনে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনেও একই কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ফৌজদারি অপরাধে কেউ দুই বছর বা বেশি সাজা ভোগ করলে এবং সাজা ভোগের পর পাঁচ বছর পার না হলে সেই ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, তারেক রহমানের এখন নির্বাচন করার সুযোগ নেই বললেই চলে। ফৌজদারি মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ‘বিলম্ব মার্জনার আবেদন’ করেও আপিল করার সুযোগ থাকে। আরেক আইনজীবী বলেছেন, তারেক কয়েক দিন জেল খাটার পর যদি তাঁর সাজা মওকুফও করা হয়, সে ক্ষেত্রেও পরবর্তী পাঁচ বছর নির্বাচন করার সুযোগ থাকছে না। একটাই পথ খোলা—এই মামলায় আপিল বিভাগ থেকে তাঁকে স্থগিতাদেশ নিতে হবে, অথবা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে।

বিএনপি একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। বর্তমান সংসদকে ‘অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক’ উল্লেখ করে দলটি তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন হবে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন। তবে নির্বাচন যখনই হোক না কেন, সেই নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা তারেকের জন্য অনিশ্চিত হয়ে গেল। রায়ের কারণে দেশের বাইরে অবস্থান করে পলাতক থেকে তারেকের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।

কয়েকজন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ বলেছেন, তারেকের পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা অনেকগুলো ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’র ওপর নির্ভর করছে। তা ছাড়া নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য তারেকের যা করা উচিত, সেটা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর পক্ষে করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন তাঁরা। ফলে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি কিছু সুবিধা তারেক রহমানের জন্য ‘কাগুজে সুবিধা’ বলেই মনে হবে।

আইনজীবীরা বলেন, নির্বাচনে ‘যোগ্য’ হতে হলে তারেককে দেশে ফিরে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে। নিয়মিত আপিলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে। অথচ নির্বাচনের আগে এসে আপিল করলে আপিল বিভাগ থেকে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করাতে হবে। রায় স্থগিত না হলে তারেক নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে যখনই আপিল করার চিন্তা করা হোক না কেন, তারেককে আগে আত্মসমর্পণ করে জেলে যেতে হবে। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দাবি, তারেক জেলে যেতে ভয় পান না। কেননা, রাজনীতি করলে জেলে যেতে হতেই পারে। ওই আইনজীবীরাই বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ঝুঁকি তারেক নেবেন না বলেই তাঁরা জানেন। ফলে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাঁর থাকছে না।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, ‘সময় হলে’ তারেক দেশে ফিরে আপিল করবেন। তখন দেখানো হবে, এই মামলা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে করা হয়েছে।

তারেকের সাজার প্রতিবাদে  শনিবার বিএনপির মিছিল-সমাবেশ

অর্থ পাচারের মামলায় তারেক রহমানের সাত বছরের সাজা ‘ন্যায় বিচারের পরিপন্থী’ বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। তারা বলছে, এ ক্ষেত্রে ‘হাইকোর্ট একতরফাভাবে বিচার করেছেন’।
দলের আইনজীবী নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেন ও মাহবুব উদ্দিন খোকন আজ শুক্রবার সকালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ অভিযোগ করেন।
এদিকে জজ আদালতের রায় বাতিল করে তারেক রহমানকে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে বিএনপি শনিবার দেশের সব মহানগর ও জেলা সদরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে। আগামী সোমবার থেকে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পৃথক কর্মসূচি দেবে বলে জানানো হয়।
বিচারককে প্রভাবিত করে তারেক রহমান খালাস পান বলে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এ কথা আমিও বলি, যেহেতু তারা যখন বলছেন যে বিচারিক আদালতকে প্রভাবিত করেছেন। বিএনপির পক্ষে যদি আদালতকে প্রভাবিত করা যায়, তাহলে সরকরে কতটা প্রভাবিত করতে পারেন এবং কোন পর্যন্ত যেতে পারে, তা আপনারাই বিবেচনা করেন।’
এ রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি আপিল করা হবে কি না, জানতে চাইলে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘তারেক রহমানের অনুপস্থিতি মামলাটি করা হয়েছে এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে সাজা দিয়েছেন। সেই ক্ষেত্রে আইনের বিধান মতে যে পর্যন্ত না তারেক রহমান দেশে আসেন এবং এখানে হাজির না হন, সে পর্যন্ত তাঁর পক্ষে আপিল করা সম্ভব নয়।’
এর পর খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘আপনারা জানেন, ফৌজদারি মামলায় সময়ের কোনো লিমিটেশন নেই। ২০-৩০ বছর পরও যেকোনো সময় ফৌজদারি মামলা করা যায়। আমরা বিশ্বাস করি, এ মামলায় একদিন সুবিচার হবে এবং দেশের মানুষ জানতে পারবে, তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য সাজা দিয়েছিল। আমরা আপিল করব এবং দেখাব এ মামলাটি সম্পূর্ণ বেআইনি হয়েছে।’
মাহবুব বলেন, অর্থ পাচারের এ মামলায় দুইটি জিনিস প্রমাণ করতে হবে। এক. অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করেছে; দুই. বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাই বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো টাকা বিদেশে যায়নি। মামলায় চায়না হারবাল কোম্পানির বাংলাদেশি এজেন্ট নির্মাণ ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান খাদেজা ইসলাম তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, তিনি বৈধভাবেই গিয়াস উদ্দিন মামুনকে কনসালটেন্সি ফি দিয়েছেন। অথচ এই খাদেজার কথিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করেই দুদক এ মামলাটি করেছিল।
মামলার বিবরণ উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, টঙ্গীতে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সরকারি দরপত্রে তিনটি বিদেশি কোম্পানি অংশ নেয়। এতে সর্বনিম্ন দর দেয় চায়না হারবাল কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশি এজেন্ট নির্মাণ ইন্টারন্যাশনাল এবং এর চেয়ারম্যান খাদেজা ইসলাম। এ প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্ট ছিলেন গিয়াস উদ্দিন মামুন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আস ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল