নেপথ্যে সম্পত্তি, পরকীয়া: চার মাসে ৯৪ শিশু হত্যা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

নেপথ্যে সম্পত্তি, পরকীয়া: চার মাসে ৯৪ শিশু হত্যা

প্রকাশিত: ৭:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০১৬

নেপথ্যে সম্পত্তি, পরকীয়া: চার মাসে ৯৪ শিশু হত্যা

23413_f6সম্পত্তি, পরকীয়া, মানসিক বিপর্যস্ততা এমনকি ছোটখাটো বিরোধের জের ধরে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। নির্যাতনের শিকার হয়ে গত ২০শে মে হাছিনা নামে ১২ বছরের এক শিশু মারা গেছে। শিশুটি ব্যবসায়ী শরীফুল ইসলামের রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সূরী রোডের ১৬ নম্বর বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতো। এ ঘটনায় শরীফুল ও তার স্ত্রী ফারজানা লিজাকে আটক করেছে পুলিশ। তার আগে গত ১০ই মে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় দক্ষিণ বড়পিলাক  থেকে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১০ বছর বয়সী ওই শিশুর নাম আবু ইউসুফ। খেলার মাঠে শিশুরা মারামারি করেছিলো। তা মেনে নিতে পারেননি অভিভাবকরা। প্রচণ্ড হিংস্রতায় ওই শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন অন্য শিশুর স্বজনরা। এ ঘটনায় তিন জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার আগে চাঞ্চল্যকর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে রাজধানীতে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত আমান অরণী ও হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র আলভী আমান। ভাইবোন। গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি রামপুরার বনশ্রীর নিজ বাসায় হত্যা করা হয় তাদের। হত্যাকারী আর কেউ না। অবিশ্বাস্যভাবে নিজ মা মাহফুজা মালেক জেসমিন হত্যা করেন দুই সন্তানকে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় সর্বত্র। তার আগে ২৭শে ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দক্ষিণ রসুলপুরে সৎ ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় মেহেদি ও মনি নামে দুই সহোদর। সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার জের ধরেই তাদের হত্যা করা হয়। ১২ই ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের চার শিশু নিখোঁজ হওয়ার পাঁচদিন পর তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অভিভাবকদের সঙ্গে শত্রুতার জেরে শিশুদের হত্যা করা হয়।
আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে শিশু হত্যা। তুচ্ছ কারণে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। বড়দের রোষানল, ক্ষোভের শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। শিশুর সবচেয়ে নিরাপদস্থান মা-বাবা। ওই নিরাপদস্থানে নিরাপদে নেই শিশুরা। তাদের হাতে ঘটছে শিশু সন্তান হত্যাকাণ্ড। এ জন্য সামাজিক নানা অসঙ্গতি, অস্থিরতা ও অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।
শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে ৯৪ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২৩ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে মা-বাবার হাতে। এরমধ্যে জানুয়ারিতে তিন,  ফেব্রুয়ারিতে ছয়, মার্চে সাত ও এপ্রিলে সাত শিশু। জানুয়ারি মাসে অপহৃত হয়েছে ১৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ২৭ ও এপ্রিলে ২২ সহ ৯২ শিশু। এই চার মাসে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১০ শিশুকে। জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার ৩৩, ফেব্রুয়ারিতে ৩৪, মার্চে ২৯ ও এপ্রিলে ৪২ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে পাঁচ শিশুকে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শিশু হত্যার হার এর আগের বছরের চেয়ে কিছুটা কমেছিলো। কিন্তু চলতি বছরে আশঙ্কাজনকভাবে এই হার বেড়েছে। তার আগে ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শিশু হত্যার হার ছিল ক্রমবর্ধমান। সারা দেশে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক হাজার ৮৫ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৬৬ এবং ২০১৫ সালে ২৯২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, সমাজে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতাই শিশুদের ওপর নৃশংস আচরণের জন্য দায়ী। শিশু নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বলেই একের পর এক শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। একইভাবে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। পারিবারিক বন্ধন বৃদ্ধি, নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। তিনি মনে করেন, সামাজিক অস্থিরতা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন রামপুরার দুই শিশুর মা জেসমিন। শেষ পর্যন্ত দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন তিনি। সমাজে অস্থিরতা বিরাজমান থাকলে মানুষের মনে তা প্রভাব বিস্তার করে। পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ কিংবা স্বার্থ আদায় করার জন্য টার্গেট করা হচ্ছে শিশুদের। এমনকি মানসিক বিকৃতদের ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু। তিনি মনে করেন, প্রতিটি শিশু দেশের সম্পদ। এই সম্পদ সুরক্ষা ও তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্বশীল হতে হবে। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।