পরিকল্পনামন্ত্রীর এপিএস হাসনাত শিবির ক্যাডার ! – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

পরিকল্পনামন্ত্রীর এপিএস হাসনাত শিবির ক্যাডার !

প্রকাশিত: ১১:৫০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০১৯

পরিকল্পনামন্ত্রীর এপিএস হাসনাত শিবির ক্যাডার !

নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। নাম বদলে শান্তিগঞ্জ করা হচ্ছে এ উপজেলার নাম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এ এলাকার সন্তান। পরিকল্পনামন্ত্রীর দূরদর্শিতায় দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা হয়ে উঠেছে বর্তমান সময়ের আলোকিত এক উপজেলা। এ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের কৃষক মৃত মকবুল হোসেনের পুত্র হাসনাত হোসেন। হাসনাত হোসেন এখন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের এক আলোচিত নাম। বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রীর একসময়ের এপিএস ছিলেন তাই আজও তিনি ‘এপিএস হাসনাত’ নামেই পরিচিত। মন্ত্রীর নাম ও প্রভাব খাটাতে তার জুড়ি মেলা ভার।
দূরদর্শী পরিকল্পনামন্ত্রীর এপিএস পদবিতে নিজের ভাগ্য নিয়ে দূরদর্শী কাজ কারবার করে যাচ্ছেন হাসনাত হোসেন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার যেকোনো সরকারি কাজে তিনিই সর্বেসর্বা।
হাসনাত হোসেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের একজন কর্মী ছিলেন। সিলেট সরকারি কলেজের ছাত্রাবস্থায় তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। শিবিরের ক্যাডার হিসেবে সিলেট সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসে মনজুর হোসেন নামের এক ছাত্রকে মারাত্মকভাবে আহত করে মৃত ভেবে ড্রেনের পাশে ফেলে দিয়ে আসার পর মনজুর হোসেন পরবর্তীতে সুস্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলাও করেন। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে মামলায় দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।
ক্ষমতার পালাবদলে নিজের ভোল পাল্টে আওয়ামী রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের আনুকূল্য লাভ করেন। উপজেলা কমপ্লেক্স, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট এর সব নির্মাণাধীন কাজে হাসনাত বাহিনী নিয়োজিত। নামে-বেনামে তারা সব কাজ করেন। হাসনাত বাহিনীর সদস্য হিসেবে এলাকায় পরিচিত আছেন ডুংরিয়া গ্রামের কামরুল ইসলাম শিপন, মন্ত্রীর ভাগ্নে জাবেদ, সিলেট বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য ডুংরিয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রয়েল, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান, পাথারিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশীদসহ আরো অনেকে। নতুন স্থাপনার মালামাল সরবরাহ করতে হলে তাদের ইশারা ছাড়া এলাকায় কোনো কাজ হয়না। টেক্সটাইল ইন্সটিটিউটের বালু ও পাথর সরবরাহ করছেন মন্ত্রীর ভাগ্নে জাবেদ, ডুংরিয়া গ্রামের কামরুল ইসলাম শিপন, জয়কলস গ্রামের জাহাঙ্গীর আহমেদ, পাথারিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশীদ। পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন হাসনাত হোসেন।
বিগত ৭ আগস্ট ২০১৯ ‘বোগলা নদী’ ও ‘বোকা নদী’ খাস কালেকশনের দরপত্র জমাদানের শেষ তারিখে পিটাপই গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মো. মুজিবুর রহমানকে দরপত্র কিনতে না দেয়ার জন্য পুলিশের সহায়তায় থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে দুপুর ২.৩০ মিনিটে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। দরপত্র কার্যক্রম নির্বিঘেœ করার জন্য তাকে আটক রাখা হয়েছিলো এবং পরবর্তীতে মো. মুজিবুর রহমান ১৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ঘটনা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বরাবরে টেন্ডার বাতিলের আবেদন করেন। মো. মুজিবুর রহমান আরো অভিযোগ করেন যে, ৬/৮/২০১৯ তারিখে দরপত্র আহবান করে তড়িঘড়ি করে ৭/৮/২০১৯ তারিখেই তা সমাপ্ত করা হয়। যা নিয়মনীতি বহির্ভুত। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
শিবির ক্যাডার ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের মুখোশধারী নেতা মন্ত্রীর আনুকূল্যে উপজেলার সব জায়গায় নিজের প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। মন্ত্রী নিজে যেখানে বিপুল ভোটে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হন সেখানে উপজেলা ও ইউনিয়ন নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের ভরাডুরি ঘটে। শিবির ক্যাডার হাসনাত হোসেনের খবরদারি যেসব আওয়ামী নেতা মেনে নেননা তারাই নির্বাচনে পরাজিত হন। এ নিয়ে এলাকায় অনেকেই হাসনাত হোসেনের উপর বিরক্ত। মন্ত্রীর আনুকূল্য তাকে বেপরোয়া করে তুলেছে বলে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। গত উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম পরাজয়ের কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশে না পাওয়ার কথা জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে আক্ষেপের সাথে তুলে ধরেছেন। অথচ এ নির্বাচনে হাসনাত হোসেনের ভাই নুর হোসেন ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
সুনামগঞ্জ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের কাজ শুরু হওয়ার আগেই হাসনাত সিন্ডিকেট তাদের কর্মীবাহিনী রেডি করে ফেলার অভিযোগ পাওয়া যায়। ব্যবসালোভী আরো কিছু রাঘববোয়ালের নামও এখানে জড়িত। বিগত কয়েকমাস ধরে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ও সুনামগঞ্জ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের প্রকল্প পরিচালক ডা. আশুতোষ দাশ এর ‘গিভ এন্ড টেক’ ফর্মুলার পার্টনারও এই হাসনাত হোসেন। প্রকল্প পরিচালক হওয়ার জন্য তিনি হাসনাত হোসেনকে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলে মুখরোচক গল্প রয়েছে। মেডিকেল কলেজের কাজের মাধ্যমে হরিলুটের পরিকল্পনা সম্পন্ন বলে জানা যায়।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ এলাকায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা, সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ, এলজিএসপি, কর্মসৃজন বিষয়ক সরকারি যেসব কর্মকান্ড আছে সবকিছুতেই রয়েছে হাসনাত বাহিনীর হস্তক্ষেপ। চেয়ারম্যানদের সাথে যোগসাজশে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করিয়ে হরিলুটের মহোৎসব চলে এখানে। এসব কাজে তার অন্যতম সঙ্গী শিমুলবাক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জিতু। যিনি একসময় সিলেট মদিনা মার্কেট এলাকায় টোকাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাবার বাড়ি জগদল ইউনিয়নে, মায়ের বাড়ী মুরাদপুরে। মামাদের সহযোগিতায় এ এলাকার ভোটার থেকে আজ তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। নামে-বেনামে অনেকেই তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছেন।
সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় এক নাম হাসনাত হোসেন। তার নির্দেশনা ছাড়া কেউ এখানে ধান সরবরাহ করতে পারেননি। যাদের নামে ধান সরবরাহ হয়েছে তাদের অধিকাংশই কৃষক নন এবং নিজেরাই জানেন না। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় হাসনাত এই কাজ নির্বিঘেœ করে গেছেন।
জানা যায়, নিজে সরবরাহ না করে সুনামগঞ্জ জেলার এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছে ৩ হাজার প্রতি টন কমিশন নির্ধারণ করে ৪০০ টন ধান সরবরাহ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। চতুর হাসনাত হোসেন বেশীরভাগ কাজেই তার চ্যালাচামুন্ডা বা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে এসব কাজ করেছেন। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজে একজন কৃষক হওয়া স্বত্ত্বেও হাসনাত হোসেনের নিজের লোক না হওয়ায় তিনি নিজের উৎপাদিত কোনো ধান সরকারী খাদ্যগুদামে সরবরাহ করতে পারেননি।
দল বদল হলো, টাকা, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি হলোÑএবার হাসনাত হোসেনের নজর দলীয় পদের প্রতি। সগৌরবে ঘোষণা দিয়েছেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার। এজন্য ইতিমধ্যেই কোণঠাসা করে ফেলেছেন পোড় খাওয়া তৃণমূল ও পরীক্ষিত আওয়ামী লীগারে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাসনাত হোসেন বলেন, আমি শিবিরকর্মী ছিলাম না। এসব তথ্য কোথায় পেলেন? প্রমাণ দিন। আর তদবীর বাণিজ্য সম্পর্কে এলাকায় খোঁজ নিলেই জানা যাবে। তিনি বলেন, নিশ্চয় এসব আমার প্রতিপক্ষ কেউ করছে।