পলাশ থেকে মিয়াদ ছাত্রলীগের হাতে ১০ খুন ! কমিটি বিলুপ্ত: তদন্ত কমিটি গঠন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

পলাশ থেকে মিয়াদ ছাত্রলীগের হাতে ১০ খুন ! কমিটি বিলুপ্ত: তদন্ত কমিটি গঠন

প্রকাশিত: ৮:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৭

পলাশ থেকে মিয়াদ ছাত্রলীগের হাতে ১০ খুন ! কমিটি বিলুপ্ত: তদন্ত কমিটি গঠন

বিশেষ প্রতিবেদক: দেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সিলেটে তার আদর্শ ও গতিপথ রিয়েছে। ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পরিবর্তে চাঁদাবাজি, বাসা-বাড়ি দখল, টেন্ডারবাজি, খুন, নারী নির্যাতন সহ এমন কোন কজ নেই করছেনা। এতে সাধারন ছাত্রসমাজ ছাত্রলীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বন্ধু ভাবার পরিবর্তে ভয় পায়।
একের পর এক ঘটনায় সারাদেশে সমালোচনার শীর্ষে সিলেট ছাত্রলীগ। হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো জাতীয় ভাবে আলোচিত না হলেও কলেজ ছাত্রী খাদিজাকে বর্বরোচিতভাবে কুপানো ও এমসি কলেজ ছাত্রাবাস পুড়ানোর ঘটনায় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়। সাবেক ছাত্র নেতারাও ছাত্রলীগের বর্তমান কর্মকান্ডে হতাশ।
সিলেটে কতটা বেপরোয়া ছাত্রলীগ? নিচের পরিসংখ্যান থেকে তা সহজেই অনুমাণ করা যেতে পারে। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া সংবাদপত্রের জরিপ উপস্থাপন করা হলো। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, অনেক হত্যাকান্ডের পেছনে ছাত্রলীগ নেতাদের ইন্ধন থাকলেও তা প্রকাশ
হয়নি। অনেক হত্যাকান্ডে সরাসরি ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা অংশ নিলেও তাদের নামে মামলা হয়নি। ২০১০ সালের ১২ জুলাই সিলেট নগরীর টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে নিজ সংগঠনের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন উদেয়েন্দু সিংহ পলাশ। এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটাই ছিল ছাত্রলীগের হাতে প্রথম প্রাণহানীর ঘটনা। উদয়েন্দু সিংহ পলাশ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ছাত্রলীগের ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা বীরেশ্বর সিংহ। পরবর্তীতে মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এই মামলার বিচার আজও শেষ হয়নি।

এরপর গত ৭ বছরে ছাত্রলীগের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৯ জন। এর মধ্যে একজন ব্যবসায়ী ছাড়া বাকি সবাই নিজ সংগঠনের নেতাকর্মী। ৭ বছরে ১০টি খুনের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়নি। ফলে এসব হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে নিহতের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বুধবার ছাত্রলীগের হাতে খুন হলেন জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম (২২)। ছোট ভাইকে জিম্মি করে মোবাইল ফোনে ডেকে এনে নিজ দলের ক্যাডাররা তাকে খুন করে। বিশেষ করে নগরীর টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে অস্থির স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায়ই নিজেরদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। ১০ খুনের মধ্যে শিবগঞ্জ ও টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগের কোন্দলে ৪ জন খুনের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ গত ১৬ অক্টোবর সোমবার বিকেলে সিলেট নগরীর টিলাগড়ে প্রতিপক্ষ গ্র“পের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ওমর আহমদ মিয়াদ (২২) নামের আরেক ছাত্রলীগ কর্মী। এতে আহত হন আরও দুই কর্মী। মিয়াদ লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র। জগন্নাথপুর উপজেলার বালিশ্রী গ্রামের আকুল মিয়া ও ডালিয়া বেগম দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। এবছরের নগরীর টিলাগড়ে প্রতিপক্ষ গ্র“পের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে নিহত ওমর আহমদ মিয়াদ (২২) হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার (১৮ অক্টোবর) রাতে নিহতের পিতা আকুল মিয়া বাদী হয়ে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীকে প্রধান আসামী করে ১০জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৪-৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে এ হত্যা মামলা দায়ের করেন। অবারও এ হত্যাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করেছে পাশাপাশি প্রতিবারের মত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি মাকসুদ রানা মিঠু প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট নগরীর জিন্দাবাজারের এ্যালিগেন্ট শপিং সিটির পার্কিংয়ের সামনে মোটর সাইকেল রাখা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে জেলা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সহ সভাপতি এম. সুলেমান হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই মার্কেটের ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে ছুরিকাঘাত করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মামুন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় পরদিন সুলেমান হোসেন চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আজীবনের জন্য বহিস্কার করে। এ খুনের ঘটনায় এখনো সুলেমানকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ১০ জুলাই ২০১৬ সালে নগরীর পাঠানটুলায় একটি বাসার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ
ক্যাডারদের হামলায় খুন হন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুল্লাহ অন্তর। এ ঘটনায় অন্তরের স্ত্রী বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলেও এখনো হত্যাকান্ডের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

১ মে ২০১৬ সালে নগরীর শামীমাবাদে ইসলাম হোসেন নামের এক শ্রমিককে কুপিয়ে খুন করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদি হয়ে থানায় মামলা করলেও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ধরা পড়েনি। ২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি সিলেট সফরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগের দিন নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান হাবিব। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪ ছাত্রকে বহিস্কার করে। এদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ও ওই হত্যা মামলার আসামি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরায় হত্যাকারীরা সনাক্ত হলেও এখনো সকল আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ ।

২০১৫ সালের ১২ আগস্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে মদন মোহন কলেজে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল আলী। এ ঘটনায় পুলিশ ছাত্রলীগ ক্যাডার প্রণজিৎ দাশ ও আঙ্গুর মিয়াকে গ্রেফতার করে। প্রণজিৎ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
দিয়েছে। এই দুইজন ছাড়া এই হত্যা মামলার অন্য কোন আসামীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই মদিনা মার্কেটে একটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ ওরফে কচি। এ ঘটনায় কচির ভাই আসাদুল হক মামলা দায়ের করলেও আসামীদেরও বেশিরভাগ রয়েছে অধরা।

২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী সুমন চন্দ্র দাশ। এ ঘটনায় নিহতের মা প্রতিমা দাস থানায় মামলা দায়ের করেন। প্রায় দুইবছরেও এ হত্যা মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়নি।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ বলেন, সিলেটে যে সব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তাতে দলের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। সামাদ বলেন, আমরা চেষ্টা করছি কিন্তু হত্যাকান্ড নিয়ন্ত্রন করতে পারছিনা। এতে সাধারন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। আমরা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের নির্দেশে যখন কোনো ঘটনার কথা শুনছি সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যেহেতু ছাত্রলীগ একটি বড় সংগঠন এবং হাজারো নেতাকর্মী আছে তাই শতভাগ নিয়ন্ত্রন করাও অসম্ভব। খুনের ঘটনায় বিচার হচ্ছেনা কেন এমন প্রশ্নের জবাবে সামাদ বলেন, বিচারের দায়িত্ব আমাদের না। বিচার করবেন আদালত। তবে আমরা অবশ্যই চাই এসব অপরাধী যেন কোনো ভাবেই ছাড় না পায়। এ জন্যে দলের পক্ষ থেকে আইন শৃংখলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, ‘এ সব হত্যাকান্ডের পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে আমি মনে করিনা। ব্যক্তি স্বার্থই এখানে বড় দেখা যাচ্ছে। তবে এতে দলের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা এসব ঘটনায় বিব্রতবোধ করছি। আমাদের সময়ের রাজনীতি এখন যেন গতিপথ হারিয়েছে। তবে এর দায় কোনোভাবেই আমরা  এড়াতে পারবনা। এজন্য দলের স্থানীয় অভিবাবকমহলকে এগিয়ে আসতে হবে’। তা না হলে দল ও সমাজের জন্য এটি অশনিসংকেত বলে মনে করেন এই নেতা।

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মুহাদ্দিস আহমদ বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্টু পরিবেশ, ছাত্রসমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করার কথা ছাত্রলীগের। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তার উল্টোপথে হাটছেঁ ঐতিহ্যবাহি এই সংগঠনটি। আমরা চাই সিলেটের প্রতিটি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপুর্ণ পরিবেশ। সেজন্যে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে ছাত্রলীগেই। আর যেন একটি হত্যাকান্ড না ঘটে সেদিকে কঠোর নজরদারীর পরামর্শ দেন এই শিক্ষাবিদ। এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আসামী পলাতক থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এর অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা বলেন, পুলিশের কাছে অপরাধী অপরাধী বলেই বিবেচ্য হয়। অপরাধীর কোন দল নেই। তবে অনেক খুনের আসামী পলাতক থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করনে তিনি। খুনিরা গাঁ ডাকা দেয়ার কারণে অভিযান দিয়েও গ্রেফতার করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।