পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা তাওহীদের অপকর্ম, নিরুপায় সাধারণ শিক্ষার্থী – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা তাওহীদের অপকর্ম, নিরুপায় সাধারণ শিক্ষার্থী

প্রকাশিত: ১০:২১ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা তাওহীদের অপকর্ম, নিরুপায় সাধারণ শিক্ষার্থী

বিশেষ প্রতিনিধি :: অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জন করতে হচ্ছে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে পড়তে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীদের। কলেজর স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে রেখেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা ভয় দেখিয়ে চাঁদা নেয়া থেকে শুরু করে অনেকভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে হেনস্তা করে। স্টাইপেন, ট্রান্সফার, রেগুলার, এডমিট কার্ড, বিভিন্ন খাতে জোর করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীকেই ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৮০০টাকা করে দেয়া হয়। ওইসব শিক্ষার্থীদেরকে অগ্রণী ব্যাংক বাবনা শাখা থেকে টাকা তুলতে হয়। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন তারিখে টাকা প্রদান করে অগ্রণী ব্যাংক। শিক্ষার্থীরা ব্যাংকে টাকা আনতে গেলে সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নিয়ে বসে থাকে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শিক্ষার্থীরা যখন টাকা তুলে আসতে চায় তাদেরকে ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে তাদের কাছ থেকে ৫০০/১০০০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

শুধু তাই নয় ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকা যেসব শিক্ষার্থীদের দেয়া হবে তাদেরকে প্রতিষ্ঠানে ২য় পর্বে অধ্যয়ণরত থাকাকালীন ফরম পূরণ করে ওই টাকার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। তার জন্য অধ্যক্ষের স্বাক্ষর করা ফরম প্রতিষ্টানের রেজিস্ট্রি শাখা থেকে আনতে হয়। ফরম নিতে হলেও চাঁদাবাজি করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী ট্রান্সফার নিতে চাইলে অধ্যক্ষ স্বাক্ষর দিলেও ট্রান্সফারের কাগজ আটকে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বদলে বিপুল পরিমাণ টাকা চাঁদা দাবি করে তারা।

এরকমই ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় ওই প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা মিনহাজুর রহমানকে (১৭)। তার মূল বাড়ি নরসিংদীতে। প্রতি বছরই অনেক শিক্ষার্থী তার পড়ালেখার সুবিধার্থে নিজ এলাকার পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ট্রান্সফার নিয়ে চলে যায়। মিনহাজের বড় ভাই মাসুদুর রহমান নরসিংদীতে থেকে আসেন মিনহাজকে ট্রান্সফার নিয়ে নরসিংদী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তাদেরকে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতাদের অনেক হেনস্তার শিকার হতে হয়।

মিনহাজের বড় ভাই মাসুদুর রহমান সিলেটের দিনকালকে জানান, ইলেকট্রিক্যাল ২য় পর্বে অধ্যয়ণকালীন আমার ছোট ভাই মিনহাজের ট্রান্সফার নিতে চাইলে কাগজ আটকে দেয় সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আমার ভাই তাদের কাছে কাগজ চাইলে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে তারা। আমরা নিরুপায় হয়ে যাই। অনেক সাধারণ পরিবারের ছেলে আমরা। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে তাদের কিছু করার নেই বলে তারা। পরে এলাকার স্থানীয় কিছু লোকদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সমাধান হয়।

ট্রান্সফার নিয়ে নরসিংদী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে যাওয়ার পর ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকার জন্য আবেদন করতে চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষ মিনহাজকে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে যোগাযোগ করার জন্য বলে। মিনহাজ ও তার বড় ভাই মাসুদুর রহমান সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে আসলে ভিন্ন এক ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় তাদেরকে।

এ বিষয়ে মিনহাজের বড় ভাই মাসুদুর রহমান আরো জানান, সিলেটে আসার আগে বাড়ীতে থাকা অবস্থায় সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগ নেতা ইলেকট্রনিক্স ২য় পর্বের অধ্যয়ণরত শিক্ষার্থী আবির (মিনহাজের বন্ধু) ফোন দিয়ে মিনহাজকে বলে ‘তোর ফরম আমার কাছে আছে, সিলেটে আসলে নিয়ে যাবি।’ সিলেটে গিয়ে মিনহাজ তাকে ফোন দিলে ফরমের বিনিময়ে আবির তার কাছে ২০০০ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ফরম দিবেনা বলেও জানায় আবির। কিন্তু আশ্চর্য্যরে বিষয় হলো আমার ভাইয়ের ফরম অন্যজন কিভাবে নিয়ে যায়। কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি এরকম হয় কি শিক্ষা গ্রহণ করবে এখানে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা।

ওই প্রতিষ্ঠানের সুরমা হোস্টেল যেটিকে বিকল করে রেখেছে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যেটি এখন মাদক আর অস্ত্রের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। বার বার সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আগে থেকে জানিয়ে দেয় অভিযানের কথা। সাবধানবশত তারা সবকিছু সরিয়ে নেয়।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, আরডি ভবনে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা কলেজ ইউনিফর্ম ছাড়া প্রবেশ করতে পারি না। প্রবেশ করতে গেলে কারারক্ষী অনেক খারাপভাবে গালিগালাজ করে। কিন্তু যারা অধ্যয়ণরত ছাত্রলীগ করে বা সুরমা হোস্টেলে থাকে তারা আরডি ভবনে নির্ধারিত পোশাক ছাড়া প্রবেশ করতে গেলে কারারক্ষী কিছুই বলে না। আমরা যখন কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করি আপনি তাদেরকে প্রবেশ দিলেন কিন্তু আমাদের দিলেন না। কারারক্ষী বলেন, তাদের ভিতরে যাওয়ার অনুমতি অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ স্যার আগ থেকেই বলে দিয়েছেন। এসব বিষয়ে অধ্যক্ষ স্যারের সাথে বার বার কথা বলতে গেলে উনার সাথে দেখা করা যায় না। বার বার উনার পিয়ন এসে দেখা করে।

গোপন সূত্রে জানা যায়, ড. আব্দুল্লাহ শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে এরকম ব্যবহার করেন। কিন্তু যারা ছাত্রলীগ করে বা সুরমা হোস্টেলে থাকে তাদেরকে তিনি বাঘের মতো ভয় পান। তারা দেখা করতে গেলে তিনি চেয়ার থেকে উঠে এসে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেলায় ঠিক তার উল্টোটি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এর আগে ইন্সটিটিউটে সুশান্ত কুমার বসু নামে একজন অধ্যক্ষ ছিলেন যিনি ছাত্রলীগের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে লাঞ্চিত হন। অবৈধভাবে পূজার নাম করে স্যারের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে গেলে তিনি দ্বিমত পোষণ করলে তার ব্যবহৃত গাড়ি এবং বাসা ভাঙচুর করা হয়। ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের দখলে রয়েছে ইন্সটিটিউট’র ক্যাম্পাস এমনকি কর্তৃপক্ষও। তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই অধ্যক্ষের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী সিলেটের দিনকালকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবেশে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে দেখা যায় ছাত্রলীগের নেতাদের কলেজের অধ্যক্ষ, স্যাররাও পর্যন্ত ভয় পান। তাদের মধ্যে কেউ একজন যদি ড্রপও হয় তাহলে স্যাররা তাদের ভয়ে সেই ড্রপকেও পাশে পরিণত করে দেন। তাদের মধ্যে ক্ষমতার এতোই মনোভাব চলে আসে তারা নিজেকে কলেজের শীর্ষ চাঁদাবাজেও পরিণত করে তুলে। একজন সাধারণ ছাত্রকে তারা পরীক্ষার হলে স্যারের সামনে ধমকায় তখন স্যারকে দাড়িয়ে তাকানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। একটি সাধারণ ছাত্রকে যখন কলেজ থেকে কোনো সার্টিফেকেট নিয়ে বের হতে হয় তখন কলেজের স্যাররা আগে আগেই বলে দেন কাগজটা লুকিয়ে নিয়ে বের হইয়ো না হলে সমস্যা হতে পারে। সমস্যা বেশি কিছু না ঐতো বাহিরে গেইটে চাঁদাবাজরা দাড়িয়ে আছে তাদেরকে কিছু টাকা দিলে আপনি সুরক্ষিতভাবে কাগজ নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন।’

শিক্ষার্থীরা সিলেটের দিনকালকে জানান, এই কলেজে পড়ালেখা করতে গিয়ে কতো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। শহীদ মিনারে বসা, পুকুর পাড়ে বসা নিয়েও আমাদের অনেক সমস্যা হয়। তারা আরো বলেন, কলেজের গেইটের পাশে “দেবা উদ্যান” নামে একটি জায়গা রয়েছে যেখানে বসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে ডেঁকে নিয়ে তাদের চাল-চলন, আচার, ব্যবহার পোশাক-আশাক সম্পর্কে বিভিন্ন খারাপ মন্তব্য করে। প্রতিনিয়ত তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে মারধর করে। অধ্যক্ষের কাছে বিচার নিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা মিলে না তার।

জানা যায়, সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ছাত্রলীগের বর্তমান নেতা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছে তাওহীদ হাসান। তার নির্দেশেই এসব অপকর্ম প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত ঘটেই যাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার কাছে অভিযোগ করলেও ইচ্ছে করেই ঘটনাগুলি দৃষ্টিগোচর করে সে। তাওহীদের মূল বাড়ী বরিশাল। তার পড়ালেখা শেষ হলেও জোর করে দখল করে আছে সুরমা হোস্টেল। তার নির্দেশেই এসব অপকর্ম প্রতিষ্ঠানে ঘটছে। তাওহীদ সিলেটের আলোচিত কাশ্মীর গ্রুপের অনুসারী।

মেকানিক্যাল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এ কিউ এ জুবায়েরকে ফোন দেয়া হলে সিলেটের দিনকালকে বলেন, তাওহীদ মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টে পড়ালেখা করলেও এখন সে বিগত হয়ে গেছে।

সিডি/এসআর/১১জুন১৯

  •  
  •  
  •  
  •  
  •