পুলিশের টর্চের আলোয় নিভে গেল দুই জীবন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

পুলিশের টর্চের আলোয় নিভে গেল দুই জীবন

প্রকাশিত: ৪:৩৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০১৮

পুলিশের টর্চের আলোয় নিভে গেল দুই জীবন

হাইওয়ে পুলিশের টর্চ লাইটের আলোয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন বাসচালক। এতে বাসের নিচে চাপা পড়ে একটি বাইসাইকেল। বাসটিও গিয়ে পড়ে রাস্তার পাশে পুকুরে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সাইকেল আরোহী এক কলেজছাত্র। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় বাসের যাত্রী এক শিশু।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার পালাহার এলাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে গত রোববার রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন বাসের যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরে উত্তেজিত জনতা ঘটনাস্থলে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে ধরে মারধর করে। আগুন ধরিয়ে দেয় তাঁদের মোটরসাইকেলে।
বাসচাপায় নিহত কলেজছাত্রের নাম জাহাঙ্গীর আলম। নান্দাইলের মুশুলি ইউনিয়নের পালাহার গ্রামের মৃত সৈয়দ মিয়ার ছেলে তিনি। পড়তেন কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতেও চাকরি করতেন। আর নিহত শিশুটির পরিচয় পাওয়া যায়নি। বয়স আনুমানিক পাঁচ বছর।
ঘটনার রাতে ও গতকাল সোমবার দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির অন্তত ১৫ জন যাত্রী এবং পালাহার ও আগমুশুলি গ্রামের অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা অভিযোগ করেন, হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে চালকদের কাছ থেকে টাকা তুলছিল। রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রামগামী একটি যাত্রীবাহী বাস পুলিশের থামানো যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে যেতে অগ্রসর হয়। তখন পুলিশ সদস্যরা চালকের চোখে টর্চ লাইটের আলো ফেললে চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। চাপা দেয় সামনে থাকা একটি বাইসাইকেল। বাসটি রাস্তা থেকে পড়ে যায় পাশের পুকুরে। বাসচাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান সাইকেল আরোহী জাহাঙ্গীর। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় শিশু। বাসে থাকা ৪০ যাত্রীর প্রায় সবাই আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, এ ঘটনায় সেখানে থাকা জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তারা হাইওয়ে থানা-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) প্রদীপ কুমার মজুমদার ও কনস্টেবল মো. কামাল মিয়াকে ধরে মারধর করেন। পুলিশের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। গণপিটুনিতে আহত হয়েও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থল থেকে পালাতে সক্ষম হন। অন্যরা পালিয়ে যান আগেই। এরপর শত শত লোক জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে নান্দাইল মডেল থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জনতাকে শান্ত করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আবেদিন খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুড়ে যাওয়া নিজেদের মোটরসাইকেলটি গভীর রাতে উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাইওয়ে পুলিশ।
গতকাল বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় নিহত কলেজছাত্র জাহাঙ্গীরের মা রোকেয়া বেগম (৫০) ঘটনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমার পুত লেহাপড়া শিইখ্যা দেশ ও দশের উপহার করব, এইডা ভাইব্যা হেরে কলেজে পাডাইছলাম। আমার ছেড়া কেরে মরল, এইডার জওয়াব চাই।’
গ্রামবাসীর অভিযোগ, নান্দাইল হাইওয়ে থানা-পুলিশ রাতে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন থামিয়ে চাঁদাবাজি করে। পুলিশ মুশুলি ও পালাহারের মাঝে নির্জন স্থানটিতে প্রতিদিন বিকেল থেকে অবস্থান নেয়। রাত হলেই তারা গাড়িচালকদের চোখে টর্চ লাইটের আলো ফেলে গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজি করে।
সাংসদ আনোয়ারুল আবেদিন খান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর গ্রামবাসী আমার কাছেও অভিযোগ করেছে যে প্রতি রাতে পুলিশ ওই স্থানে লাইটের আলোয় যানবাহন থামিয়ে চাঁদাবাজি করে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নান্দাইল হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মামুন রহমান বলেন, ‘আমার কাছে পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ নেই’। আগের রাতের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে জানান, আগের রাতে আহত এসআই প্রদীপ কুমার নান্দাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন আছেন।
আর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাইওয়ে পুলিশের এক সদস্য রোববার রাতে দুই পুলিশ সদস্যের গণপিটুনির শিকার হওয়ার কথা প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল