প্যারিস জীবন শুরুর কথা ও বাস্তবতা:আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

প্যারিস জীবন শুরুর কথা ও বাস্তবতা:আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

প্রকাশিত: ৪:০৭ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২০

প্যারিস জীবন শুরুর কথা ও বাস্তবতা:আব্দুল ওয়াদুদ ময়নুল

আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে আমার প্যারিসে আসা। দেশের পরিচিত এক বাল্যবন্ধু ও সহপাটি আমাকে রিসিভ করে বাসায় নিয়ে গেল। বন্ধুটির অবদানে প্রবাসের প্রথম যাত্রার দুঃখগুলো বুঝি নাই। যদিও সে ছিল প্যারিসে নতুন। মাত্র কয়েক মাস আগে এসেছে। প্যারিসের রাস্তাঘাট তেমন চেনে না। ভাষাও তেমন জানে না। তার মুখ থেকেই প্রথম প্রবাস জীবনে অমানবিকতার গল্প শুনতে হয়েছে! আমি আসার মাত্র মাসখানেক আগে সে অসুস্থ হয়ে দশ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তার নিকটজন থাকা সত্ত্বেও একদিনের জন্য হলেও কেউ হাসপাতালে দেখতে যায়নি। হাসপাতালে একাই গিয়েছিল আবার একাই আসতে হয়েছিল! যদিও সেসময় আমাদের আরেকটি কাছের বন্ধু এখানে ছিল কিন্তু তারও প্যারিস জীবনের বয়স ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ…

প্যারিসে পা রাখতেই তার এ গল্প শুনার পর প্যারিস জীবনে অভিজ্ঞতার ঝুড়ি বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করিনি। যাই হোক, এলাকার কয়েকজন স্বজনের ভালবাসায় প্যারিস জীবনের প্রথম কষ্টগুলো নিজে অর্জন করার সৌভাগ্য না হলেও প্যারিসে আসা নতুন মানুষের কষ্ট দুর্দশা খুব কাছ থেকে দেখেছি।

এখানে প্রথমে আসার পর নিজ দেশে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সামাজিক হয়রানির শিকার বলে নিম্ন আদালত “অফরা”-তে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে হয়। এই অফিসটি কোথায়, তাও জানিনা। তার উপরে প্যারিসের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্যাচালে পড়ে যে কাউকে প্রথমে হিমশিম খেতে হয়। দেশে বাস, সিএনজি ও রিকশা চড়া লোকটিকে কেউ হাতে কলমে রাস্তাঘাট দেখিয়ে না দিলে মেট্রো-ট্রেনের জিলাপির প্যাঁচের মত রাস্তাটির কারুকর্যতা কে বুঝবে? -তো আমি নিম্ন আদালতে আবেদন করার অফিসে আবেদন পত্র জমা দিতে যেতে হবে । আমাকে বলা হল যে, “বাল দো ফতনে”- ট্রেন স্টেশনে গিয়ে একটি লাল বিল্ডিং দেখলে বুঝে নিবে এটাই নিম্ন আদালত (অফরা) অফিস। কথামত যাওয়া হল। গিয়ে দেখি আশেপাশের সবটিই লাল অফিস! অনেককে বাংলা-ইংলিশে প্রশ্ন করে অফিসটির অবস্থান জিজ্ঞেস করেছি, কেউ কথাই বুঝেনা। তো ঘন্টাখানেক পর একটি লোক আমাকে যথাযথ স্থানে নিয়ে গেল। ত্রিশ মিনিটের রাস্তাটি যেতে হল পাঁচ ঘন্টায়!

এখানে আসার পর প্রথমেই নানা ধরণের ফরম পূরণের জন্য দোভাষী জানা একজন লোকের সহযোগিতা খুবই দরকার। এই ধরনের লোকের কাছে ভিড়তে আপনাকে যা লাঞ্ছনা পোহাতে হয়, তা বলে শেষ করা যাবেনা। তাদের ভাব-সাব যেকোন দেশের মন্ত্রী-এমপির পর্যায়ে ধরে নিলেও কম বলা হবে।

তারপর একটি এড্রেস (ঠিকানার) জন্য কত নিচু শ্রেণীর লোককেও ধরনা দিতে হত, তা প্যারিসে তৎকালীন বসবাসরত লোকদের কাছ থেকে গল্প শুনে নিতে পারেন। তাদেরকে তুমি নেতা সুলভ ভঙ্গীতে আচরণ করলে কিছুটা সদয় পেতে পার। কিন্তু একটা সময় ব্যাঙের ছাতার মত তুমার খোঁজ নিত যখন থানা, জেলা পর্যায়ের কোন কমিটি গঠন করা হত। এই সিস্টেমটা এখনো আছে।

তখনকার সময়ে “অবৈধ” বসবাসরত হলে কাজ পাওয়া মানে তুমি সোনার হরিণের দেখা পেয়েছো। মেট্রো রেলের আশেপাশে বা কোন টুরিস্ট এলাকায় মোবাইলের সীম কার্ড, সিডি-বিসিডি ও খেলনা সামগ্রী বিক্রি করাই ছিল বেশিরভাগ স্বদেশির জীবন জীবিকার প্রধান মাধ্যম। এখানে বৈধভাবে বসবাসরত স্বদেশি লাটদের পেছনে শুধু একটু কাজ বা সুযোগ সুবিধার আশায় পেছনে পেছনে ঘুরপাক খেত প্যারিসে আসা নতুন অসহায় বাংলাদেশীরা। কতভাবে যে তাদেরকে সম্মান দেখানোর হতো।

কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, বিগত পাঁচ বছরে প্যারিসে বাংলাদেশী প্রবাসীরা সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়সহ অনেক উপায়ে বাংলাদেশী ভাইয়েরা এখন বৈধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রও বাড়ছে প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের। বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশীরা কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। কারণ, এখন যারাই আসছে তারা বেশিরভাগই শিক্ষিত, আধুনিক এবং সমাজে চলার মত যোগ্যতাসম্পন্ন লোক। তাদের নিজের সব ভালবাসা দিয়ে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে। হিংসা-বিদ্বেষ আর হাব-ভাব আগেকার চেয়ে অনেকটা নেই বললেই চলে। অপরিচিত কারো পেছনে পেছনে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়না। বিবেক মস্তিষ্ক সম্পন্ন লোকেরা ফ্রান্সে আসায় বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও সমাজের পরিবর্তন হয়েছে। আমরা একে অপরের প্রতি ভালবাসায় অনিহা প্রকাশ করিনা। সুখে দুঃখে পাশে একে অপরের পাশে থাকার চেষ্টা করি। এলাকার বা পরিচিত কেউ আসলে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর শিক্ষা নিয়ে দেশ থেকে শিখে এসেছে।

এখনকার যারা আসে শিক্ষিত বিধায় কম সময়ে ফ্রেঞ্চ ভাষা আয়ত্ব করতে সক্ষম। যে কেউ এসে তার নিজের পরিচিত যে কাউকে পেয়ে যায়, যে ভাষা জানে। আগের মতো কারো পেছনে একটা ফরম পূরণের জন্য লাইন পেতে বসতে হয়না। ধরনা দিতেও হয়না এড্রেস (ঠিকানা) যোগাড়ের জন্য কোন বাংলাদেশী পাতি নেতাদের। প্যারিসে বাংলাদেশী ভাইদের বাসা-বাড়িও এখন চোখে পড়ার মতো। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনও কিছু বাংলাদেশী অমানুষরা তাদের এড্রেসটি (ঠিকানা) কোন অসহায় নিজ দেশীয় ভাইদের কাছে চড়ামৃল্য বিক্রির খবর শোনা যায়। তাদেরকে এমন বলে ধরে নেওয়া যায় যে, “তারা এমন কিছু প্যারিসে এসে পেয়েছে, যা পাওয়ার যোগ্যতা তাদের ছিলনা”। এ রকম লোকদের পারিবারিক আবহ কিছুটা হলেও বুঝা সম্ভব।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশীরা এখনও একটা বিষয়ে পিছিয়ে আছে, তা হল “ঐক্যতা”। এই বিষয়টি বাঙালি জাতির প্রধান সমস্যা। যার কারণে যে কোন দেশের লোক আমাদের নিরীহ প্রাণীর মতো মারতে ভালবাসে। আমরা এখানে প্রতিনিয়তই আফ্রিকানদের মার খেয়েই যাচ্ছি। প্রচুর বাংলাদেশীরা প্রতিনিয়ত আফ্রিকানদের হামলার শিকার হতে হচ্ছে। জানিনা আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে…!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •