প্রধান শিক্ষকের ধমকে হাসপাতালে বাকরুদ্ধ স্বর্ণা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

প্রধান শিক্ষকের ধমকে হাসপাতালে বাকরুদ্ধ স্বর্ণা

প্রকাশিত: ১১:০৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০১৯

প্রধান শিক্ষকের ধমকে হাসপাতালে বাকরুদ্ধ স্বর্ণা

আমি জানতাম না যে এটিই সেই মেয়ে : গৌরা ঘোষ

মো. নাঈমুল ইসলাম
আমরা শিক্ষকদেরকে আমাদের বাবা-মায়ের চেয়েও বড় স্থানে অধিষ্ঠিত করি। শিক্ষাজীবনে তাদের কাছে থেকে জ্ঞান অর্জন সহ কিভাবে সমাজে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হয় সেই শিক্ষাদানে তারা প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন। তারা চান যেন এই সমাজের প্রত্যেকটি মানুষ তার শিশুকাল থেকে যেন একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে সবাইকে জীবনে একবার হলেও শিক্ষকের মুখাপেক্ষী হতে হয়। এক কথায় বলতে গেলে শিক্ষকদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর বলা হয়। কিন্তু এই শিক্ষকরাই যখন অমনুষ্যত্বের পরিচয় দেখান তখন এই সমাজে জন্ম নেয় অমানবিকতা। আর এই সমাজের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীকে অবহেলা আর অনাদরে বড় হতে হয়। এমনই একটি করুণ এবং হৃদয়বিদায়ক ঘটনা ঘটেছে শিক্ষার্থী স্বর্ণার সাথে।
সিলেটের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির পরিবেশ যেমন সুন্দর ফলাফলেও তেমন ভালো। সেখানে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে পড়ালেখা শুরু করে নগরীর শাহী ঈদগাহ’র বাসিন্দা শাকিল আহমদ চৌধুরী ফলিক ও রুহেনা বেগম’র মেয়ে তায়্যিবা চৌধুরী স্বর্ণা (১৬)। হঠাৎ বৃহস্পতিবার তার শরীর গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরা ঘোষ কর্তৃক লাঞ্ছিত হওয়ায় সেটা সহ্য করতে না পেরে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় স্বর্ণা। বিষয়টি জানার পর সিলেটের দিনকাল’র প্রতিবেদক হাসপাতালে যান। কথা হয় তার পরিবারের সাথে।
স্বর্ণার খালা জানান, বিগত বছর স্বর্ণা যখন দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত তখন সে এসএসসি পরীক্ষায় ৪টি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে এবছর তাকে রেফার্ড পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। স্বর্ণা স্কুলের টেস্ট পরীক্ষায় সব বিষয়ে কৃতকার্য হলে আসছে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি বোর্ড পরীক্ষায় তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
বৃহস্পতিবার স্বর্ণা ফরম ফিলাপ করতে স্কুলে যায়। সেখানে যাওয়ার পর স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে ডেকে নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকসহ সবার সামনে তাকে অপদস্ত করেন এবং বলেন, কিভাবে টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করলে তুমি, বোর্ড তোমাকে পরীক্ষার সুযোগ করে দিলেও আমি থাকতে দেখি তুমি কিভাবে এসএসসি পরীক্ষা দাও।
আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি স্বর্ণার খালা আরো বলেন, প্রধান শিক্ষক স্বর্ণা’র বাব-মাকে নিয়েও অনেক খারাপ কথা বলেছেন। স্বর্ণা একটু শান্তপ্রিয় ও ভীতু স্বভাবের মেয়ে। সে যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয় তখন সব স্যার-ম্যাডামরা তাকে অনেক আদর করেন, তাকে কেউ ধমক দিয়ে কথা বলেন না। তার সামনে ধমক দিয়ে কথা বললে অথবা উচ্চস্বরে কথা বললে সাময়িক সময়ের জন্য তার শরীর খারাপ হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষক স্যার বিষয়টি জানতেন তবুও তিনি কেন এরকম আচরণ করলেন তা আমরা বুঝিনি।
আবেগাপ্লুত হয়ে কান্না করে স্বর্ণার মা বলেন, এর আগেও প্রধান শিক্ষক স্যার আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন। আমার মেয়ে স্বর্ণা শান্তশিষ্ঠ ও ভীতু স্বভাবের হওয়ায় যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করিয়ে দেই অন্যান্য সব শিক্ষকদের সহযোগিতায় তখন তারা সবাই খুব আদর করতেন আমার মেয়েকে, এখনও করেন। তারা পরীক্ষার হলে স্বর্ণা যাতে নার্ভাস না হয় সেজন্য আমাকেও প্রত্যেক পরীক্ষায় স্বর্ণার সাথে বসার সুযোগ করিয়ে দেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক স্যার এসে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।
স্বর্ণার অসুস্থ হওয়ার বিষয়ে খালা আরো বলেন, বৃহস্পতিবার বাসায় আসার পর স্বর্ণা কান্না করে আমাদেরকে বলে প্রধান শিক্ষক স্যার তার সাথে কিভাবে ব্যবহার করেছেন। এই কথা বলা থাকা অবস্থায় হঠাৎ তার বমি শুরু হয় এবং কথা বন্ধ হয়ে যায় এক কথায় বলতে গেলে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।
শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় স্বর্ণা অসুস্থ হলে তাকে বৃহস্পতিবার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে খবর পেয়ে তাকে দেখতে যান প্রতিবেদক মো. নাঈমুল ইসলাম ও আলোকচিত্রী জুনেদ আহমদ। রাত পর্যন্ত স্বর্ণা কোনো কথা বলতে পারেনি। যেটার ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ হয় সিল নিউজ বিডি ও সিলেটের দিনকাল’র ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউবে।
হাসপাতালে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তপন চৌধুরীর। তিনি জানান, আমরা অনেক সময় আদর করি, শাসন করি, ¯েœহ করি কিন্তু এমন কোনো আচরণ করিনি যাতে একজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর উপবৃত্তির কাজে নিয়োজিত। হঠাৎ দেখি মেয়েটা আমার রুমে এসে কান্না করছে। আমি সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যাই এবং তাকে জিজ্ঞেস করিÑ কি হয়েছে। সে আমাকে বলে প্রধান শিক্ষক স্যার তাকে ধমক দিয়েছেন। আমি মেয়েটাকে নিয়ে স্যারের রুমে যাই। গিয়ে বলি- স্যার, আপনি নাকি মেয়েটাকে ধমক দিয়েছেন? তখন প্রধান শিক্ষক বলেন, মেয়েটাকে তো আমি চিনিই না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক সিলেটের দিনকালকে জানান, গৌরা ঘোষ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টি শুধু অবনতির দিকে যাচ্ছে। তিনি ঠিকমতো ক্লাস তদারকিও করেন না। বিদ্যালয়ে বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রিসিট ছাড়াই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরকারি ফি’র বাইরে টাকা সংগ্রহ করেন। এই মেয়েটির বিষয়েও আমি শুনেছি। সে টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করলে ফরম ফিলাপ করার জন্য স্কুলে গেলে সে নির্ধারিত টাকার বেশি দিতে না চাইলে প্রধান শিক্ষক তাকে নিয়ে ধমক দেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর ফয়জুল আনোয়ার আলাউরের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি সিলেটের দিনকালকে জানান, প্রধান শিক্ষক স্যার কেন এভাবে ব্যবহার করলেন বুঝিনি। আমরা কঠোরভাবে বিষয়টি দেখবো।
প্রধান শিক্ষক গৌরা ঘোষের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি সিলেটের দিনকালকে জানান, আমি শাসন করেছি। আমি জানতাম না যে-এটিই সেই মেয়ে। আমার একটু ধমকে এমন হবে ভাবিনি। আমি এখন প্রায় পলাতক অবস্থায় আছি। ওই ঘটনার পর কে বা কারা এসে আমার বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর করেছে।
কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এর আগেও একটি ঘটনা ঘটেছে। ওই স্কুলে পডুয়া মেয়েদের হিজাব টানাটানির অভিযোগ উঠে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে সারা বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠে।