‘প্রবাসী দিবস’ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি: প্রবাসী সংহতি সিলেট – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

‘প্রবাসী দিবস’ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি: প্রবাসী সংহতি সিলেট

প্রকাশিত: ৫:৫৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২০

‘প্রবাসী দিবস’ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি: প্রবাসী সংহতি সিলেট

প্রবাস ডেস্ক:
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। এরমধ্যে বড় একটি অংশ দ্বৈত নাগরিক এবং সিলেটি। তাঁরা নাড়ীর টানে দেশে আসা যাওয়া করছেন। অর্থনীতি থেকে শুরু করে আর্ত সামাজিক নানা উন্নয়নে সম্পৃক্ত তাঁরা। বিদেশে থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের বন্ধন আরও দৃঢ় করতে একটি দিবস ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। বছরের যে কোনো একটি দিন ‘এনআরবি ডে’ অথবা ‘প্রবাসী দিবস’ ঘোষণা করলে প্রবাসীদের আরও কাছে টানা হবে।

গত রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) রাতে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ মতামত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী কমিউনিটির সংগঠকসহ সিলেটের বিশিষ্টজনেরা। প্রবাসীদের সম্মান জানাতে বাংলাদেশে একটি দিবস ঘোষণায় সরকারের পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সিলেটের দুজন সাংসদ থাকায় দিবস ঘোষণায় সরকারি উদ্যোগে দুই মন্ত্রীর সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।

‘প্রবাসী সংহতি, সিলেট’ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকটি বৈঠক সঞ্চালনা করেন সিলেট বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সহসভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সংগঠক রানা ফেরদৌস চৌধুরী। ‘এনআরবি ডে’ বা ‘প্রবাসী দিবস চাই’ শীর্ষক ধারণাপত্র পাঠ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম।

বৈঠক সঞ্চালকের বক্তৃতায় রানা ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, সিলেটি নাবিকদের বিজয়ের ইতিহাসই বাঙালি জাতির প্রবাস যাত্রার ইতিহাস। উন্নত জীবন ও দেশে থাকা পরিবার-পরিজনকে স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রবাস যাত্রা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই বিদেশগামী মানুষের কল্যানে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে স্বস্তিতে আছে। প্রবাসী আয়ের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনতা অর্জন কাল থেকে অর্থনীতির ভীত মজবুত হয়েছে। অনাবাসী বাংলাদেশীরা সার্বিকভাবে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উপর ভিত্তি করেই দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। তাই সরকারি ভাবে প্রবাসী দিবস পালন করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ ইনভারমেন্ট নেটওর্য়কের অস্ট্রেলিয়া শাখার আহবায়ক ও উদিচীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান খান বলেন, আগে বিদেশে গেলে সবাই বলতে ‘হি ইজ লস্ট’ কিন্তু এই ধারনা পরিবর্তন হয়েছে। এখন যে বিদেশ যায় সে একটি পরিবারের ও দেশের সম্পদ হয়ে উঠে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের বিরাট ভূমিকা আছে। তাই আমাদের সবার দাবী এই দিবস রাষ্ট্রীয় ভাবে পালনে সরকার উদ্যোগী হবে।

সিলেট চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, প্রবাসী দিবস এখন সময়ের দাবী। শুধু সিলেট নয় ৬৪টি জেলার মানুষদের নিয়ে এ ব্যাপারে মুভমেন্ট দরকার। এ ব্যাপারে আমি আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাহায্য করতে পারবো। তিনি বলেন, ইয়ং প্রবাসীদের বাংলাদেশকে জানা দরকার। বাংলাদেশের ভাল দিকগুলো তাদের জানা প্রয়োজ। তাই সরকারের এই দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। এই দিবসের মাধ্যমে প্রবাসীদের কিছু স্পেশাল বেনিফিট দেওয়া যেতে পারে। এতে করে দেশের রেমিটেন্স আরও বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।

সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, প্রবাসী দিবস ঘোষনা নিয়ে একটু দ্বিধা আছে। কারণ দেশের কয়েকটি জায়গায় ইতোমধ্যে এনআরবি দিবস পালন হয়েছে। সেসব অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রীরাও গিয়েছেন। তাই দিবস ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে সকলের স্বচ্চ ধারণা থাকা দরকার। প্রবসীদের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সরকারি ভাবে এই দিবস ঘোষণা করলে দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং দেশ আরও লাভবান হবে। তাই এই দিবস নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসা প্রয়োজন।

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, দেশে এখন প্রতিদিনই দিবস পালন হয়। সরকারীভাবেও অনেক দিবস পালন হয়। এসব দিবস নিয়ে আবার হাস্যরসও হয়। যত যাই হোক দিবসের প্রয়োজন আছে। তিনি বলেন, প্রবাসী মানেই সিলেটি নয়। সারা দেশেই প্রবাসী আছেন। সিলেটে প্রবাসীদের সংখ্যা বেশি। তাই প্রবাসী দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে প্রবাসীরা কাজ করছেন। এটা একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিবস। সেজন্য আজকের যারা আয়োজক তাদেরকে পেশাদারভাবে এগোতে হবে।

‘প্রবাসী সেল’ সিলেট কমিটির সদস্য অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, পাকিস্তান আমলে দেশে বৃটিশ হাই কমিশন ছিল না। কিন্তু ভিসা সেকশন ছিল। এখন বাংলাদেশে বৃটিশ হাই কমিশন আছে অথচ ভিসা সেকশন নেই। আমাদেরকে এখন ভিসা করাতে হয়ে ভারত যেতে হয়। এটা প্রবাসীদের এবং তাদের পরিবারের জন্য অনেক কষ্টকর। কারণ লন্ডন বা আমেরিকাতে বিয়ে, জন্মদিন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে মেহমান যায়। বিশেষ করে এটা আমাদের সিলেটিদের জন্য খুব কমন বিষয়। তাই ভিসা করাতে গেলে আমাদের অনেক ভোগান্তী পোহাতে হয়। এটা ছাড়াও প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা থাকে। দেশের আর্ত সামাজিক উন্নয়নে কাজ করার জন্য ইচ্ছা থাকে। প্রবাসীদের জন্য সরকার একটি দিবস ঘোষণা করলে ওই বিশেষ দিনটিতে সবকিছুই উঠে আসবে। তাই বাংলাদেশে প্রবাসী দিবস করা প্রয়োজন।

প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন বলেন, ১৯৭২ সালের পর থেকে মেধাবীরা বিদেশ চলে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটা রির্ভাস করতে হবে। যে মেধাবীরা বিদেশ গিয়েছেন বা যাচ্ছেন তারা যেন বাংলাদেশে এসে কাজ করতে পারেন সেজন্য সেজন্য এনআরবি দরকার। এই দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করাতে হলে পেশাদারী কাগজপত্র তৈরি করে কাজ করতে হবে। ফলোআপ করতে হবে। দিবস শুধু এক দিন পালনের জন্য নয়। এই বিষয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগাতে হবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, প্রবাস জীবন নিয়ে আমার দীর্ঘ ৮ বছরের অভিজ্ঞতা আছে। লেখাপড়ার সুবাধে আমি প্রবাসে ছিলাম। খুব কাছ থেকে এ দেখেছি প্রবাসীদের অনুভূতি। বর্তমানে প্রবাসীদের তিন প্রজন্ম রয়েছে। এই তিন প্রজন্মের তিন ধরনের অনুভূতি। বর্তমান ইয়ং যে প্রজন্ম আছে তাদের জন্য এবং প্রবাসীদের দেশের অর্থনীতিতে স্বতস্পূর্তভাবে সম্পৃক্ত করানো জন্য বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবাসী দিবস পালন করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, শুধু ইউরোপ নয়, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। তারা কষ্টে অর্জিত রেমিটেন্স বিশ^ অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এই দিবস রাষ্ট্রীয় ভাবে পালন করলে সরকার লাভবান হবে। তাই প্রবাসী দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের জন্য সরকারের অগ্রারধিকার ভিত্তিতে কাজ করা দরকার।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক ও অনুবাদক জেসমিন চৌধুরী বলেন, ৩২ বছর দেশের দেশের বাইরে আছি কিন্তু এখনো মাতৃভূমির সাথে বন্ধন অটুট আছে। প্রবাসে শুধুমাত্র আমাদের দেহ থাকে কিন্তু প্রাণটা বাংলাদেশেই থেকে যায়। প্রবাসী দিবস ঘোষনা করলে বাংলাদেশের সাথে প্রবাসীদের বন্ধন আরও শক্তিশালি হবে। তাই প্রবাসী দিবস ঘোষনা করা প্রয়োজন।

প্রবাসী কমিউনিটি নেতা গোলাম জাকির চৌধুরী বলেন, আমরা এই দেশের প্রেমে পাগল। তাই টাকা পয়সার কথা চিন্তা না করে দেশে ছুটে চলে আসি। দেশের মানুষের জন্য কিছু করে আনন্দ পাই। তাই প্রবাসী দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া খুব জরুরী। আমরা প্রবাসীরা এই দেশকে দিতে এসেছি, নিতে আসিনি।

প্রত্মতত্ত্ব সংগ্রাহক ও ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার বলেন, আমাদেরকে শুধু দিবসের স্বীকৃতির জন্য কাজ করলে হবে না। প্রবাসীদের নিয়ে, তাদের সমস্যা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

প্রবাসী সংহতির গোলটেবিল বৈঠকে প্রবাসীদের জন্য দিবস ঘোষণার দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন সিলেট চেম্বারের সহসভাপতি তাহমিন আহমদ, সিলেটে টেলিভিশন সাংবাদিকদের ‘ইমজা’ সভাপতি মাহবুবুর রহমান রিপন, উদীচী সিলেটের সভাপতি এনায়েতুল হাসান মানিক, সমাজ অনুশীলন সিলেটের সদস্য সচিব মুক্তাদীর আহমদ, বাংলাদেশ এনভারমেন্ট নেটওয়ার্কের (বেন) অস্টেলিয়ার নিলুফার জাহান, প্রথম আলো সিলেটের নিজস্ব প্রতিবেদক উজ্জ্বল মেহেদী, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি সিলেট শাখার এনামুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক কর্মী এনামুল মুনির, হ্যান্ডিবাজার লিমিটেডেরে চেয়রম্যান খায়রুন নাহার চৌধুরী লাভলী, আমেরিকা প্রবাসী নেছারুল হক চৌধুরী বুসতান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কমিউনিটি নেতা আহিয়া চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও কমিউনিটি নেতা ফক্কু চৌধুরী, আলমগীর কুমকুম, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সংগীত শিল্পী সৈয়দা নাসিম কুইন, চৌধুরী আব্দুল মুকিত চৌধুরী মন্জু, আমেরিকা প্রবাসী কামরুল হাসান চৌধুরী, লন্ডন প্রবাসী জহির চৌধুরী, মো. হিজকিল গুলজারসহ প্রমুখ।

প্রায় তিন ঘন্টা চলা গোলটেবিল বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর প্রবাসী দিবস ঘোষণায় সরকারকে উদ্যোগী করা ও প্রবাসী দিবসকে বাংলাদেশের গেজেটভুক্ত করার জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরি করার সিদ্ধান্ত হয়। গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালক রানা ফেরদৌস চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে প্রবাসী দিবস ঘোষণার প্রস্তাব সংবলিত একটি ধারণাপত্র তৈরি করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। এ ব্যাপারে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সর্বাত্মক সহায়তা দেবে বলে বৈঠকে ঘোষণা করা হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল