বলপ্রয়োগ ও বিচারহীনতায় উগ্রপন্থার উত্থান – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বলপ্রয়োগ ও বিচারহীনতায় উগ্রপন্থার উত্থান

প্রকাশিত: ৮:০৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০১৬

বলপ্রয়োগ ও বিচারহীনতায় উগ্রপন্থার উত্থান

001ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস্‌ গ্রুপ মনে করে, বলপ্রয়োগ ও ন্যায় বিচারহীনতার কারণে বাংলাদেশে চরমপন্থি সংগঠনগুলোর উত্থান ঘটছে। আর ক্ষমতাসীন সরকারই এই সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, নিজ স্বার্থেই সরকারের এ পথ থেকে সরে আসা উচিত। না হলে সহিংস চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজনৈতিক হুমকির মোকাবিলা উভয়ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ হতে পারে।
সোমবার প্রকাশিত ‘পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট, এক্সটিমিজম অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে- বিএনপি’র সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শত্রুতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, একই পাল্লায় বেড়েছে নির্যাতনও। গভীরভাবে রাজনীতিকৃত ও অকার্যকর বিচার কাঠামো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে খর্ব করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উচিত নিজেদের ‘অর্থনৈতিক প্রভাবকে’ ব্যবহারের মাধ্যমে সুশীল ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে ঢাকাকে চাপ দেয়া। পাশাপাশি প্রতিবেদনে ভারতের প্রতিও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সমপর্ক ব্যবহার করে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। যাতে করে বিরোধী দলগুলো যৌক্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস্‌ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সমালোচনা করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মূলত সরকার ও বিরোধী দলগুলোর তীব্র শত্রুতার মধ্যে নিহিত। এছাড়া সরকারের শত্রুদের টার্গেট করার কাজ দেয়া হয়েছে পুলিশকে। চাপে পিষ্ট বিচার কাঠামো বিরোধী নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করতে বাধ্য। এখন আবার তারা সহিংস চরমপন্থিদের নতুন হুমকির মুখোমুখি। কেবলমাত্র ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে, বিরোধী দল বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দুই যুগ্ম মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য সহ প্রায় ২৪০০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৫০০টি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, প্রশ্রয়প্রবন আইনি পরিবেশ চরমপন্থি সংগঠনগুলোকে পুনর্সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। এ সংগঠনগুলো সেক্যুলার ব্লগার ও বিদেশি হত্যা এবং গত বছর গোত্র ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে উল্লসিত। অপরদিকে সরকার এ ক্রমবর্ধমান চরমপন্থা মোকাবিলায় যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে যথাযথ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা অনুসরণ করা হয়নি। অনেক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ বিষয়টি ‘বিচ্ছিন্নতায় ইন্ধন দিচ্ছে, যা চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি অপব্যবহার করবে’।
প্রতিবেদনে সুপারিশের সুরে বলা হয়েছে, বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মিটমাট, তথা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে রাজনৈতিক ছাড় এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর নিপীড়নমূলক ব্যবহার ও আদালতের অপব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া, রাজনৈতিক বিরোধীদের স্তব্ধ করতে পুলিশের রাজনীতিকরণ ও এলিট ফোর্স বিশেষ করে র‌্যাবকে ব্যবহারের মধ্যে নিহিত আছে ভবিষ্যতের সহিংসতার বীজ।
বিরোধী দলকে টার্গেট করতে মনোযোগ দেয়ার ফলে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তারের ফলে কারাগারগুলো ভারে ন্যূব্জ হয়ে পড়ছে। এছাড়া বিচার ও রায়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করায় বিচার বিভাগকে ভাবা হচ্ছে দলীয়। ফলে এটি গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। বিচার বিভাগ সাধারণ মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে শোচনীয়ভাবে শ্লথ ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অপরদিকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা ব্যতিরেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে বেগবান!
সতর্ক করে দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি মূলধারার বিরোধী পক্ষকে নিশ্চুপ করিয়ে রাখা হয়, আরও বেশি সরকারবিরোধীরা ভাবতে শুরু করবে সহিংসতা ও সহিংস গোষ্ঠীগুলোই তাদের একমাত্র সমাধান।
কড়া পদক্ষেপের ফলে সরকারের বৈধতা খর্ব হচ্ছে। পাল্টা সহিংস প্রতিক্রিয়া উস্কে দেয়া হচ্ছে। ফলে আদতে লাভবান হচ্ছে দলীয় সহিংস শাখা ও এ ধরনের চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলো।
দ্য ক্রাইসিস্‌ গ্রুপ বলেছে, বিএনপি এখন দৃশ্যত সরকার পতনে সহিংসতার আশ্রয় নিতে অনেক কম আগ্রহী। রাজনীতির মূলধারায় ফিরেছে দলটি। কিন্তু এখনও নিজেদের কার্যক্রম চালানোর কোনো সুযোগ দলটিকে দেয়া হচ্ছে না। বিএনপি’র মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত সরকারকে একটি সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগ ব্যবহার করে সরকারের উচিত বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরু করা। নিজেদের আন্তরিকতার প্রমাণ দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, সরকারের উচিত হবে বিরোধী পক্ষকে টার্গেট ও সমালোচকদের নিস্তব্ধ করতে আইনি প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের চর্চা বন্ধ করা। এছাড়া বিরোধী পক্ষের যৌক্তিক পথসমূহ মেনে নিলে, সরকার নিজেদের হারানো বৈধতা (লেজিটিমেসি) এবং বিচার ও নিরাপত্তার প্রতি জনগণের বিশ্বাস কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, যতদিন পর্যন্ত দেশে বিরোধ ন্যায়সঙ্গতভাবে মীমাংসায় স্বাধীন কোর্ট সিস্টেম থাকবে না, ততদিন নিজেদের দাবি রাজপথে নিয়ে যাবে দলগুলো। কিন্তু মৌলিক নীতি সমুন্নত রাখা ও নির্বাহী বাড়াবাড়ি প্রতিহত করার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ উত্তেজনা নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে।