বাংলাদেশ: আস্থার সংকট – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বাংলাদেশ: আস্থার সংকট

প্রকাশিত: ৬:৪৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৮, ২০২০

বাংলাদেশ: আস্থার সংকট

ড. রেজা কিবরিয়া

করোনাভাইরাস সংকটের বিষয়টি প্রলম্বিত পর্যায়ে স্বীকার করে নেয় সরকার। এরপরেও পার হয়েছে ১০০ দিনেরও বেশি। মানুষের কাছে এই সময়টা ছিল দুর্বিষহ অসহায়ত্ব, অযথা মৃত্যু, ক্ষোভ আর গভীর হতাশার সময়। অব্যবস্থাপনায় ভরা লকডাউন কেবল অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাই তৈরি করতে পেরেছে, পারেনি ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে। সরকার পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছে। সংকট যখন ঘনিয়ে আসছিল, স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে প্রস্তুত করতে পারেনি। পরীক্ষা, কনটাক্ট ট্রেসিং ও কোয়ারেন্টিন বাস্তবায়নে অবহেলার পরিচয় দিয়েছে। মহামারি মোকাবিলা ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কী কৌশল নেওয়া হবে, তা নিয়ে সরকার এখন চুপ হয়ে গেছে। এক সংস্থা এক ধরণের ঘোষণা দেয়। কয়েকদিন পর সাংঘর্ষিক আরেক ঘোষণা দেয় আরেক সংস্থা। এতে বাড়ে মানুষের বিভ্রান্তি। পরীক্ষার পরিমাণ ছিল কম। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, পরীক্ষার হার এখন আরও কমিয়ে ফেলা হয়েছে। সুরক্ষামূলক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির কারণে বহু স্বাস্থ্যসেবা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। সামগ্রিক স্বাস্থ্য কাঠামোই এক নিশ্চল অবস্থায় পতিত হয়েছে। রোগীরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছেন ভর্তি হওয়ার আশায়। মুষ্টিমেয় লোকের ভাগ্যে হয়তো সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অসাধারণ সেবা জোটে। অবশিষ্ট কেউ কেউ হয়তো ব্যাংকক, লন্ডন ও কানাডায় যেতে পেরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের শিকার হওয়া মানুষের তালিকার দিকে তাকিয়ে বাকি সবার মনে প্রশ্ন, ‘এর পরে কে?’

স্পষ্ট ও সমন্বিত করোনাভাইরাস নীতিমালা ও কৌশলের অভাব এবং ক্রমান্বয়ে গভীর হতে থাকা আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতা সকলকে হতাশ করেছে। এমনকি বছরের শুরুতে সরকারকে সমর্থন করেছেন যারা, সেই গুটিকয়েক মানুষজনও এই কাতারে পড়েন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গরিব মানুষের জন্য সরকারের নেওয়া ‘ত্রাণ’ প্রকল্পের পরিকল্পনাই ছিল অত্যন্ত খারাপ। আর তার বাস্তবায়ন ছিল আরও খারাপ। যেমনটা অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বরাদ্দকৃত তহবিলের বড় একটি অংশই যাচ্ছে দুর্বৃত্ত কিছু ব্যবসায়ী ও শাসক দলের নেতাদের পকেটে। ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বেকারত্ব বেড়েছে। সামনে কী গতি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাজে রূপ ধারণ করেছে এমন ধারণার কারণে যে এই সরকার পথ হারিয়েছে। যেই একটি বিষয়ে মানুষজন একমত তা হলো এই পরিস্থিতি আরও খারাপ দিকে যাবে।

আওয়ামী লীগ সরকার গায়ের জোরে দেশ শাসন করতে গিয়ে দেখতে পেয়েছে যে জাতীয় ঐক্য গঠন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ, করোনাভাইরাস মহামারি ও অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল। একেবারে মার্কা-মারা সমর্থক ব্যতিত অন্য যে কারও সমালোচনা, এমনকি গঠনমূলক পরামর্শের প্রতি এই শাসকগোষ্ঠী যেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা দলটির নেতাদের আতঙ্ক আর জনবিচ্ছিন্নতারই বহিঃপ্রকাশ। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাসক দলের নেতাদের প্রতি পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ঝেড়েছেন, তাদেরকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি ১৪ বছর বয়সী বালকও বাদ যায়নি। মানুষের মধ্যে এই ক্ষোভের মূল কারণ অনুসন্ধান না করে, সরকার কেবল উপসর্গ নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। সমস্যা হলো, এই দেশের অসংখ্য মানুষ আওয়ামী লীগের এই পরিণতি সমর্থন করে না। একসময়কার জনপ্রিয় দলটিকে নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেন, তারা নিশ্চয়ই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো আস্থার সংকট। গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার পতনই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বিষাদের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা এখন বন্যার সম্মুখীন। কিন্তু মানুষের দুঃশ্চিন্তা ও ভয় এর চেয়েও বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসছে যে, মেধাবী যুবকরা এই দেশের ভবিষ্যতের ওপর সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছে। এসব অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তারা দেশ ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজছে, যদিও বৈশ্বিক মন্দার কারণে লাখ লাখ প্রবাসী দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের প্রতি ক্ষোভ থেকে এক ধরণের সমর্পনের অনুভূতি জন্মাতো একসময়, এখন সেটা লজ্জায় পরিণত হয়েছে।

বলা হয় যে একটি জাতি তার প্রাপ্য সরকারই পায়। আমি দ্বিমত করি। কোনো জাতিরই এই ধরণের সরকার প্রাপ্য নয় যারা কিনা জনস্বার্থের প্রতি এতটা উদাসীন। পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হতো, তারা হয়তো পার পেয়ে যেত। অতীতে অর্থনীতি খারাপ হলেও, বিদেশী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যেত। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসলে অর্থ আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। স্পষ্টতই, সেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। জাতির যেই ক্ষতি হয়েছে তা অত্যান্ত মারাত্মক, তবে অসংশোধনযোগ্য নয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট থেকে দেশের উত্তরণ ঘটাতে যেই আত্মবিশ্বাস, বিচক্ষণতা আর দূরদৃষ্টি প্রয়োজন, তা কি সরকারের আছে?

ঢাকা, ১৪ জুলাই ২০২০ : ওয়াশিংটন, ডিসি’তে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করে লেখক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি কম্বোডিয়ায় আইএমএফ’র ম্যাক্রো ফিসক্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন ও গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।