বিএনপির রাজনীতিতে আশা-হতাশার ‘২০১৭’ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বিএনপির রাজনীতিতে আশা-হতাশার ‘২০১৭’

প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭

বিএনপির রাজনীতিতে আশা-হতাশার ‘২০১৭’

কয়েক বছর ধরে জানুয়ারি মানেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনা। সমঝোতার পরিবর্তে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির ক্রমাগত পরস্পর বিরোধী অবস্থান ও বক্তব্যে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও সংশয় সৃষ্টি হয়।

ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এবার সাংগঠনিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। হামলা মামলা গুম খুন ও হত্যার পরও ঘরোয়া রাজনীতিতে সীমিত থাকতে বাধ্যা হওয়া দলটি বছরের শেষের দিকে এসে বেশকয়েকটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠেছে। টার্গেট জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায় করা।

২০১৭ সালে বিএনপি সাংগঠনিক পুনর্গঠনের দিকে যেমন নজর দিয়েছে, তেমনি বছরের শেষ দিকে এসে দীর্ঘদিন পর উন্মুক্ত কর্মসূচিতে বড় ধরনের জমায়েতের মাধ্যমে শক্তির জানান দিতে পেরেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করার পর ক্ষমতা হারানোর দশ বছরে এসে একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে আশা পাচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

বছরের শুরুতে কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ: বছরের শুরুতে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলই মুখোমুখি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়ায়। ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা্ দিবস’ উপলক্ষে ‘কালো পতাকা মিছিলের’ কর্মসূচি দেয় বিএনপি। তবে সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক দেয় দলটি।

নতুন ইসিতে আপত্তি: রাজনৈতিক দল গুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যেমে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচন কমিশন ঘোষণা হলে তাতে আপত্তি জানায় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের মিত্ররা। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ‘প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে’ বলে অভিযোগ আনা হয় জোটের পক্ষ থেকে।

কুসিকে বিএনপির জয়: মার্চে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু বিজয়ী হন। এই জয়ে বিএনপির আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগে। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মনিরুল হক পান ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৭৬৩ ভোট।

ঢাকা মহানগরে বিএনপির নতুন কমিটি: এই বছরের ১৯ এপ্রিল ঢাকা মহানগরে নতুন নেতৃত্ব আনেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রথমবারের মতো সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা মহানগরকে ভেঙে দুটি কমিটি করা হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি করা হয় আগের কমিটির সদস্য সচিব এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলকে। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান আগের কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আবুল বাশার। আর ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় আবদুল কাইয়ুমকে এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান আহসান উল্লাহ হাসান।

খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর: বছরের মাঝামাঝিতে হাঁটু ও চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বপরিবারে আছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও তার বড় ছেলে তারেক রহমান। গত ১৫ জুলাই লন্ডন গিয়ে প্রায় তিন মাস সেখানে অবস্থান শেষে ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন খালেদা জিয়া।

লন্ডনে থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক খবর রটে। বিষয়টি বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সাময়িকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও দলীয় প্রধানের দেশে ফেরায় তারা আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হন। বিএনপি নেত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে বিমানবন্দরে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীরা জমায়েতের মাধ্যমে এর প্রমাণ রাখেন।

খালেদা জিয়ার ‘ভিশন -২০৩০’ চমক: বছরের মাঝাঝিতে এসে গত ১০ মে বিএনপির ভিশন-২০৩০ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন খালেদা জিয়া। তার এই ভিশন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে দাবি করে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যামে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা। ৩৭টি বিষয়ের ওপর ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনার কথা জানান বিএনপি প্রধান।

তছনছ খালেদার কার্যালয়: খালেদা জিয়া বিএনপির ভিশন-২০৩০ তুলে ধরার দশদিন পর গত ২০ মে তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। ‘রাষ্ট্র বিরোধী ও আইন শৃঙ্খলা পরিপন্থি নাশকতা সামগ্রীর খোঁজে’ পুলিশ গুলশানে বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে খালেদার সাক্ষাৎ: বছরের শেষ দিকে ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া।

রোহিঙ্গাদের প্রতি মহমর্মিতা জানাতে উখিয়ায় খালেদা: লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কক্সবাজারের উখিয়া যান রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে, যারা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে শরণার্থী হিসেবে রয়েছেন। ২৮ অক্টোবর উখিয়া যাওয়ার দিন খালেদা জিয়া গাড়ি বহরে হামলা হয়। এতে বহরে থাকা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যামের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিয়ে ফেরার পথেও গাড়ি বহরে হামলা হয়।

বছরের শেষে দীর্ঘদিন পর মাঠে বিএনপি: দীর্ঘদিন ঘরোয়া রাজনীতিতে সীমিত থাকা বিএনপি বছরের শেষ দিকে এসে সমাবেশের মতো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ পায়। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত ১২ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে বিএনপি। নানা প্রতিকুল পরিস্থিতি ডিঙিয়ে ঢাকায় বিএনপির জনসভায় নেতাকর্মীদের ‘ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত’ আর উচ্ছ্বাসের চিত্র নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দলটিকে।

‘উভয়সংকটে’ বিএনপি: বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের নিয়ে প্রায়ই উভয় সংকটে পড়ে দলটি। জোটের বেশ কয়েকটি দলের মধ্যেহ বিভাজন তৈরি হওয়ার পর ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে যাওয়া ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এ বছরও জোটের দুই দল লেবার পার্টি ও জমিয়তে উলামায় ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে যায়। এর আগে যে শরিক দলগুলো ভেঙেছে তার একটি অংশ জোট থেকে বেরিয়ে গেলেও অন্য অংশকে জোটেই থাকতে দেখা গেছে। তবে এবার লেবার পার্টি ও জমিয়তে উলামায়ে দল দুটি ভেঙে গেলেও কোনো অংশই জোট থেকে বেরিয়ে যায়নি। বরং দুটি দলই জোটে থাকতে চাইছে। এ নিয়ে এক প্রকার উভয়সংকটে রয়েছে বিএনপি। যদিও এই বিষয়ে ধীরে চলো নীতিতে রয়েছে জোটের প্রধান দল বিএনপি।

এ বছর যাদের হারিয়েছে বিএনপি: এ বছর বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের নেতাকে হারিয়েছে বিএনপি। বছরের শুরুতে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হুদা, হারুন অর রশিদ খান মুন্নু, সঞ্জীব চৌধুরী, মো. আখতার হামিদ সিদ্দীকী ইন্তেকাল করেন। আবার বছরের শেষ দিকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান বিএনপির নীতি নির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ সদস্য এম কে আনোয়ার।

বিজয় র‌্যালি: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে বিজয় র‌্যালি করেছে বিএনপি। লাখের বেশি লোকের সমাগম ঘটিয়ে র‌্যালির আদলে রাজপথে শোডাউন দেখিয়েছে দলটি।

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত: সম্প্রতি দেশে সফররত তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপির নেতারা মনে করেছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রীর সাথে খালেদা জিয়ার বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

রসিক সিটি করপোরেশন নির্বাচন: জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দাবি করলেও সম্প্রতি ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়েছে বিএনপি। সেই নির্বাচনে বিজীয় হয়েছে জাতীয় পার্টি (এরাশাদ) লাঙ্গল মনোনীত প্রার্থী।

মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ: চলতি বছরে ২৪ ডিসেম্বর বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, আগামী দিনে যে কর্মসূচি দেয়া হবে সেই কর্মসূচি পালনে আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে ক্ষমতায় এবং অনির্বাচিত সংসদ বহাল রেখে দেশে কোন নির্বাচন হতে পারে না। নির্বাচন হবে না।