বিপ্লব ও সংহতি দিবস: মওলানা ভাসানী ও শহীদ জিয়া – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বিপ্লব ও সংহতি দিবস: মওলানা ভাসানী ও শহীদ জিয়া

প্রকাশিত: ২:৪৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০১৭

বিপ্লব ও সংহতি দিবস: মওলানা ভাসানী ও শহীদ জিয়া

স্বাধীনতার পর সমগ্র জাতির প্রত্যাশা ছিল একটি জাতীয় সরকারের, কিন্তু জনগণের সেই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন না হয়ে কায়েম হলো আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার। শুরু থেকেই একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সারা দেশে শুরু হয় অরাজক পরিস্থিতি, একই সাথে সরকারের কঠোর সমালোচনা চলে। এতে সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ততায় পর্যবসিত হতে থাকে।

সমালোচকরা সরকারি দলের ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য হয়, তাদের আখ্যায়িত করা হয় দেশদ্রোহী আর রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে। সরকারে আবু সাঈদ চৌধুরী, জেনারেল ওসমানীর মতো সৎ ও ত্যাগী ব্যক্তিরা থাকলেও সরকারের মধ্যে এক শ্রেণীর নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ ব্যাপকভাবে চলতে থাকে, যা বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত ও বিচলিত করতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীও সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে থাকেন। এরই মধ্যে আবার স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। এ জন্য সরকার অন্য কোনো দলের পরামর্শ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করেনি।
রাষ্ট্রে দেখা দেয় চরম অস্থিতিশীলতা। ১৯৭৪ সালে দেশে চরম দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যায়। মওলানা ভাসানী দেশব্যাপী সমাবেশ করে সরকারকে এ সম্পর্কে অবিরাম সতর্ক করে দিচ্ছিলেন, কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। এরই মধ্যে দুর্ভিক্ষের কালো থাবায় মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। সরকার আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যর্থ হতে থাকে। সীমান্তে শুরু হয় বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের আগ্রাসন। দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী দলকে শায়েস্তার নামে দেশপ্রেমিক সিরাজ শিকদারসহ হাজার হাজার দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয় সরকারের মদদে।

৩০ জুন, ১৯৭৪ থেকে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী সন্তোষে নজরবন্দি ছিলেন। ২৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশ দ্বারা দেশে জরুরি আইন জারি করেন। ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫-এ সংসদে মাত্র ১১ মিনিটে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিবাদে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী এবং ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন।
বাকশাল প্রতিষ্ঠা ও সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বাকশাল প্রতিষ্ঠার ছয় মাস ২০ দিনের মাথায় ’৭৫-এর ১৪-১৫ আগস্ট মধ্যরাতে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন জুনিয়র অফিসার সংগঠিত হয়ে ইতিহাসের নৃশংস ঘটনা, রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেন। ১৩ আগস্ট থেকে মওলানা ভাসানী সন্তোষে তার ইবাদতগৃহে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। ১৫ আগস্ট ফজরের নামাজের পর তিনি ইবাদতগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। এরই মধ্যে বেতারে তিনি ঢাকার অভ্যুত্থানের ঘটনা ও শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। ১৬ আগস্ট জেনারেল ওসমানী প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের নির্দেশে সন্তোষে মওলানা ভাসানীর কাছে গিয়ে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তাঁর বিবৃতি প্রত্যাশা করলে তিনি বলেন, ‘সবই যখন শেষ, তখন আর এই বুড়োর বিবৃতির প্রয়োজন কী?’

২১ আগস্ট মোশতাক ভাসানীর সাথে দেখা করলেও তিনি কোনো বিবৃতি দেননি। ২৪ আগস্ট কয়েকজন রাজনীতিবিদ মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করে অনুরোধ করলে তিনি বিবৃতি দেন, যাতে তিনি ‘মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মচারী, সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী, বেসামরিক নাগরিক এবং মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই নয়, সবার জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্জনের জন্য নিরলসভাবে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান’।
৩ নভেম্বর রাতে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে।

৭ নভেম্বর আরেক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নতুন বাঁক সৃষ্টি হয় যাকে ‘সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বলে অভিহিত করা হয়। বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমান মুক্তি পান।
১৫ আগস্ট দুঃখজনক ঘটনার পর থেকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে অব্যাহত চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ’৭৫-এর ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহি জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে যে প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, মওলানা ভাসানী যদি সেদিন জিয়াউর রহমানকে সমর্থন না জানাতেন; তবে এ সংগ্রাম হয়তো তখন নিঃশেষ হয়ে যেত। আধিপত্যবাদ-সাম্রাজ্যবাদ, ব্রাহ্মণ্যবাদ-আগ্রাসনবাদের কালো থাবা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ দেশের দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার সংগ্রামের পাশে মওলানা ভাসানীর সমর্থন সংগ্রামকে করেছিল বেগবান।

৭ নভেম্বর পরবর্তী শুধু জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি, বরং জিয়ার সরকার এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মওলানা ভাসানী বৃদ্ধ বয়সে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে। জনসভায় বক্তব্যের মাধ্যমে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার করেছেন। পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে করেছেন ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ। ৭ নভেম্বরের চেতনার সাথে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও শহীদ জিয়াউর রহমান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ