বিভিষীকাময় ২১ আগস্টে সিলেটের দুই নেতার অসাধারণ অবদানের স্মৃতিচারণ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বিভিষীকাময় ২১ আগস্টে সিলেটের দুই নেতার অসাধারণ অবদানের স্মৃতিচারণ

প্রকাশিত: ৮:০০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০১৬

বিভিষীকাময় ২১ আগস্টে সিলেটের দুই নেতার অসাধারণ অবদানের স্মৃতিচারণ

1077আবুল মোহাম্মদ, ২২ আগস্ট ২০১৬, সোমবার: সিলেটঃ ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিভিষীকাময় সে দিনটির জলন্ত স্বাক্ষী সিলেটের দুই কৃতি সন্তান বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অকুতোভয় সৈনিক জগদীশ চন্দ্র দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ। আজ ২১ আগস্টের ১২তম বার্ষিকীতে তাদের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় সুনিপুনভাবে ফুটে উঠেছে ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা আর পৈশাচিকতার লোমহর্ষক বর্ণনাগুলো। আওয়ামীলীগ পরিবারের ত্যাগী পরীক্ষিত ও কৃতজ্ঞ এই দুই নেতার ২১ আগস্টের স্মৃতিচারণ আমাদের অভিভূত করে দিয়েছে। জীবনকে তুচ্ছ করে দিয়ে ঘাতকদের একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরনের মাঝেও এই দুই নেতা দৃঢ়তার সাথে জাতির জনকের প্রাণপ্রিয় কন্যা শেখ হাসিনাকে নিরাপদ রাখতে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি নিজেদের উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ করেছিলেন গ্রেনেড হামলার শুরু আর শেষ মুহূর্তের নারকীয়তাকে। এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে যুবলীগের তৎকালীন সিলেট জেলা সভাপতি জগদীশ চন্দ্র দাশ ও সাধারণ সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ তাদের জীবনের স্মরণীয় এই দিনটির কথা চমৎকার ভাবেই উপস্থাপন করেছেন।
২০০৪ সালের ২০ আগস্ট কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি বর্তমান কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর্জা আজম এমপির আহ্বানে জগদীশ দাশ ও আজাদুর রহমান আজাদ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ঢাকাস্থ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এর সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে ঢাকায় যান।
২১ আগস্ট বিকেলে ৪টায় সমাবেশ প্রাঙ্গনের পার্শ্বে কেন্দ্রীয় যুবলীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে আলাদা অবস্থান নেয় যুবলীগ। বিকাল ৫টার দিকে শেখ হাসিনা সমাবেশ স্থলে পৌছলে তাকে স্বাগত জানিয়ে যুবলীগ একটি মিছিল বের করে। তারা নেত্রীকে সমাবেশস্থলে বরণ করে নিয়ে আসেন। সেই মিছিলে এই দুই নেতা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সমাবেশে শেখ হাসিনা উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মী ও জনসাধারণের উদ্দেশ্য হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। সে সময় নেত্রীর সাথে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, সাজেদা চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আমির হোসেন আমু, সরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপি সহ কেন্দ্রীয় আরো সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। তাছাড়া আওয়ামীলীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। এসময় যুবলীগ নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার অবস্থানের কাছাকাছি স্থানে অবস্থান নেয়। সমাবেশে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে যখন সিলেটের বোমা হামলা ও গুলশানের গ্রেনেড হামলার কথা বলছিলেন, তখন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ ও সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের নাম উল্লেখ করেন। তিনি এই দুই নেতার উপর গ্রেনেড হামলার বিষয়টি অবতারণা করেন। নেত্রীর এই বক্তব্য শোনা মাত্র জগদীশ দাস সমাবেশ স্থল থেকে মোবাইল ফোনে এডভোকেট মিছবাহ উদ্দিন সিরাজকে জানান যে নেত্রী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও মিছবাহ উদ্দিন সিরাজের নাম বক্তৃতায় বলেছেন। ফোনে যখন এসব কথা চলছিল ঠিক তখনই হঠাৎ বিকট শব্দে সমাবেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নেত্রীর উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। এরপর আরো তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। যার ফলে সমাবেশস্থল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সমাবেশে উপস্থিত মানুষ প্রাণ নিয়ে যে যেদিকে পারেন গিয়ে আত্মরক্ষা করেন। সামবেশস্থল হয়ে উঠে ভয়াবহ এক মৃত্যুপুরী। এতো নির্মমতার পরও আশ্চর্য্য হলেও সত্যি যে পৈশাচিকতার সেই মুহূর্তে পুলিশ প্রচুর কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ করে। তাদের নিক্ষেপ করা টিয়ারসেল থেকে নিঃসরিত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় রাজপথ। আর সেই ধোঁয়ার সুযোগে খুব সহজেই ঘাতকরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ধৈর্য্য ও সাহসিকতার সাথে মানবপ্রাচীর রচনা করেন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতারা। যে মানবপ্রাচীরে পাশেই ছিলেন জগদীশ দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ। তারা মানবপ্রাচীরের ভিতর দিয়ে নেত্রীকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গাড়িতে তুলে দেন। এ অবস্থায় সন্ত্রাসীরা গাড়ী লক্ষ করে গুলি করে। এই গুলিতে শেখ হাসিনার বডিগার্ড মর্মান্তিকভাবে মারা যান। গাড়ীর পিছনের গ্লাসে গুলি লেগে ঝাঝরা হয়ে যায়। তারপরও থেমে থাকেন নি ত্যাগী ও প্রকৃত নেতাকর্মীরা। তারা এসময় স্লোগান দিতে দিতে নেত্রীর গাড়িকে বিদায় দেন। তারপরের দৃশ্য দেখে দিশেহারা হয়ে যান জগদীশ দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ সহ সিনিয়র নেতারা। তারা তখন চারিদিকে দেখতে পান শুধু লাশ আর লাশ। শত শত নেতাকর্মী আহত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণায় রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছেন। এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞের খেলায় তখন মেতে উঠে ঘাতকরা। তারপর তৎকালীন কেন্দ্রীয় যুবলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিলে হতাহত অনেক লোকজনকে ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রেরণ করেন। এরপর জগদশী দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ যখন নিজেদের আবিস্কার করেন তখন দেখতে পান তাদের সমস্ত জামাকাপড় রক্তে লাল হয়ে গেছে। আহত নিহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর সময় তাদের গায়েও রক্তের দাগ লেগে থাকে। সেই রক্তমাখা জামা-কাপড় নিয়েই আহত নিহতের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান এই দুই নেতা। ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে গিয়ে তারা দেখেন হাসপাতালে কোনো সিনিয়র চিকিৎসক নেই। সরকার দলের নির্দেশে গ্রেনেড হামলায় হতাহতদের যাতে চিকিৎসা না দেওয়া হয় সে লক্ষে সিনিয়র চিকিৎসকদের হাসপাতাল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতো বড় ভয়াবহ ও মর্মন্তদ ঘটনার পর হাসপাতালে গিয়েও উপযুক্ত চিকিৎসা মিলেনি। শিক্ষানবিশ ডাক্তাররা জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মূহুর্তে সাহায্যের হাত বাড়ান স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের চিকিৎসকরা। তারা সে সময় আন্তরিকতার সাথে হতাহতদের সেবা দিয়েছেন। তখন জগদীশ দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ দুইজন গুরুতর আহত ব্যক্তিকে দুই ব্যাগ রক্ত প্রদান করেন। এসময় এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মুন্নী সাহা তারা দুজনের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঘটে যাওয়া গ্রেনেড হামলার বর্ণনা শুনেন। এসময় মিডিয়াকর্মীরা অন্যান্য নেতাকর্মীর কাছ থেকে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে বক্তব্য নেন। পরবর্তীতে জানা যায়, গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান ও সুরঞ্জিসন সেন গুপ্ত গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের অবস্থা আশংকাজনক। সে কথা শুনে ক্লিনিকে ছুটে যান তারা দুজন। সেখানে গিয়ে দেখা যায় সুরঞ্জিত গুপ্তকে ওটিতে রাখা হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা শংকামুক্ত আছে। সে খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসেন জগদীশ দাস ও আজাদুর রহমান আজাদ। পরে তারা আইভী রহমানকে দেখতে যান।
উল্লেখ্য, জগদীশ দাস তার রাজনৈতিক জীবনে বার বার কারাবরণ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ১৩ বার কারাবন্দি হন তিনি। তার জীবনের ১০টি বছর কারাগারেই কেটে যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়। তাছাড়া দীর্ঘ দিন ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।
ক্রীড়ানুরাগী আজাদুর রহমান আজাদ টিলাগড়ে একটি ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিলেন। সেই টুর্নামেন্টের অনুষ্ঠানে ভয়াবহ গ্রেডেন হামলা হয়। সে সময় অল্পের জন্য রক্ষা পান আয়োজকসহ প্রধান অতিথি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সহ অতিথিবৃন্দ। সিলেটের আওয়ামী ঘরনার রাজনীতিতে আজাদুর রহমান আজাদ বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। যুব সমাজকে সুসংগঠিত করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। বার বার তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তাছাড়া সংগঠনের দুঃসময়ে তার অবদান অনস্বীকার্য।
আজাদ বলেন, মহান আল্লাহরতায়ালার রহমতে অলৌকিকভাবে ২১ আগস্ট বেঁচে যান নেত্রী। বিভিষীকাময় পরিস্থিতিতে তিনি বেঁচে আছেন কি-না তা বুঝা যায় নি। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা আর দোয়ার কারনে অনিবার্য এক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান তিনি। কেননা দুর্র্বৃত্তরা তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করতেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ছিলো।
এদিকে গ্রেনেড হামলার সংবাদে এই দুই নেতার পরিবারে ছিল অজানা আতংক। পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় সমাবেশে অংশ নেওয়া জগদশী দাস ও আজাদুর রহমান আজাদের অবস্থা জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠেন। একের পর এক ফোন আর খবরাখবর সংগ্রহের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন এই দুজন সুস্থ আছেন। তারপর এই দ্জুন ত্যাগী নেতা ঢাকা থেকে বাড়ীতে ফিরে আসেন।