বিশ্ব সামাজিক ন্যায় বিচার দিবসে প্রত্যাশা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বিশ্ব সামাজিক ন্যায় বিচার দিবসে প্রত্যাশা

প্রকাশিত: ৯:৪৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

বিশ্ব সামাজিক ন্যায় বিচার দিবসে প্রত্যাশা

পারভীন বেগম:

আজ বৃহস্পতিবার ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব সামাজিক ন্যায় বিচার দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি এ দিবসটি পালন করে থাকে। দিবসটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের মধ্যে এখনো ততটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কী, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ ধারণাটি এত বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে উন্নত দেশগুলোতেও সেগুলোর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন বা সমাধান সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই এখনো আমরা বিশ্বজুড়ে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-অর্থনৈতিক অবস্থা বা জাতীয়তার কারণে মানুষের মধ্যে বৈষম্য দেখতে পাই।

বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশগুলো মানবতা, শান্তি ও ন্যায়বিচার রক্ষার নামে সর্বদা চমৎকার শব্দাবলি উচ্চারণ করে থাকে। কিন্তু এসব তাদের বাইরের অভিব্যক্তি অন্যদের দেখানোর জন্য, ভেতরে তাদের নিজস্ব বাস্তবায়ন কৌশল অনুযায়ী কাজ করে থাকে। তা না হলে কেন বিশ্বজুড়ে মানুষ এখনো ভোগান্তির শিকার? কেন এখনো যুদ্ধ, ক্ষুধা, মানবাধিকার বা নিজের দেশে বসবাসের বৈধ অধিকার পীড়িত মানুষের হাহাকার শোনা যায়? আমার বিশ্বাস, এসবের উত্তর আমাদের সবারই জানা আছে। ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব সামাজিক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। আর দিবসটি প্রথমবার পালিত হয় ২০০৯ সালে।

এ দিবসটি পালনের ধারণা আসে ১৯৯৫ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে সামাজিক উন্নয়নের ওপর অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত কোপেনহেগেন ঘোষণাপত্র এবং কর্মপরিকল্পনাটি যখন ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সামাজিক উন্নয়ন কমিশনের বৈঠকে পর্যালোচনা করে। আমরা জানি, শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অনুধাবন করেই জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, লিঙ্গ সমতা, অভিবাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপরাধ ইত্যাদি বিষয় মোকাবেলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি, সমৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করা হয়। আসলে দিবসটি পালনের মাধ্যমে বিশ্বসমাজ এবং নেতাদের বিদ্যমান এ সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার এবং অবস্থার উন্নয়নের জন্য তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্যও এ বিষয়গুলোর উন্নয়ন অপরিহার্য।

‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ বলতে সমাজের এমন একটি পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জাতি-লিঙ্গ-ধর্ম বা বর্ণ-নির্বিশেষে সবার বাঁচার, চলাফেরার এবং কাজ করার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার যেমন অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করে; তেমনি বয়স-বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গ বা শারীরিক পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট বৈষম্যকে নির্মূল করে। সামাজিক অবিচার এমন একটি পারমাণবিক বোমা, যা সম্প্রীতি, শান্তি এবং উন্নয়নকে ধ্বংস করার মাধ্যমে সমগ্র সমাজব্যবস্থাকেই অচল করে দেয়।

বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবসটি মূলত দারিদ্র্য, বঞ্চনা, কর্মসংস্থান, লিঙ্গ সমতা এবং সামাজিক কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সবার অধিকার ইত্যাদি বিষয় মোকাবেলার জন্য কী কী প্রচেষ্টা প্রয়োজন তা চিহ্নিত করে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করে থাকে। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সবার প্রচেষ্টা দেশের অভ্যন্তরে এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং ন্যায্যতা সব সমাজেরই মৌলিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে গঠন করে। এই মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে সব সরকারকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

তবে বিশ্বনেতাদের সততা ও আন্তরিকতা না থাকলে এই ধারণা শুধু কাগজপত্রেই লিখিত থাকবে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চারটি মৌলিক নীতি অনুসরণ করে থাকে, যা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া সংবিধানে নির্ধারিত। আমাদের সংবিধান ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং পশ্চাৎপদ বা অবহেলিত গোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের সমান অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করে।

সরকার গত ১০ বছরে সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কিত বিষয়গুলোর যেমন—দারিদ্র্য বিমোচন, বয়স্ক ভাতা, গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিবন্ধী শিশুদের এবং তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা, সবার জন্য শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অধীনে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্প, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরিকাঠামো নির্ধারণ, বিশেষ করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য. অভিবাসী শ্রমিক এবং মানবপাচার, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সম্প্রীতি ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করেছে। এসব ক্ষেত্রের আরো উন্নয়নের জন্য সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বাংলাদেশ একটি সম্প্রীতির আবহে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দেশ হতে পারে, যেখানে নাগরিকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে একটি ন্যায্য সামাজিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ বিষয়গুলোয় কাজ করার এখনো পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে।

সর্বোপরি আমাদের জনগণকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। বিশ্বের নেতারা বিভিন্ন সময়ে আয়ের সমবণ্টন এবং ন্যায্যতা, সমতা ও সবার জন্য সমান সুযোগের মাধ্যমে সম্পদে অংশীদারির ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছেন। অনেক দেশের সরকারই স্বীকার করেছে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ন্যায্যতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, যাতে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধিকার নিশ্চিত করা যায়। এদিকে ন্যায্য বৈশ্বিকীকরণ এবং ন্যায্য বাণিজ্যবিষয়ক আলাপ-আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি বিশ্বসমাজ, বিশেষত উন্নত বিশ্ব, অনিয়মিত বা জোরপূর্বক অভিবাসন, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, মানব শোষণ এবং হতাশার মতো সমস্যাগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করে যাচ্ছে।

এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু এসব চিন্তাধারা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন রয়েই যায়। আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরিতে সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন দূরদর্শী, দেশপ্রেমিক ও জনগণের নেতা হিসেবে বিশ্বনেতাদের কাছে সুপরিচিতি ও সমাদৃত। তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও মনোযোগের কারণে সারা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

বিশ্বের অনেক দেশই বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে অনুসরণ করছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গণমাধ্যম যথাযথ প্রচারণার মাধ্যমে উন্নত সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গণসচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা আশা করি, আমাদের গণমাধ্যম অবশ্যই আমাদের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে আসবে।

আমাদের একান্ত বিশ্বাস, এ দিনটি শুধু উদ্যাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদি এ দিনটি সামাজিকভাবে সমন্বিত সমাজের সন্ধানে উদ্যাপন করা হয়, তবে আমাদের সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে আন্তরিকতা, বিশ্বাস এবং অঙ্গীকার থাকতে হবে। অন্যথায় এতে সময় এবং অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই অর্জিত হবে না। এ ছাড়া জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবিশ্বাসও সৃষ্টি হতে পারে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •