বেগম জিয়া – ‘আঁধার-দশকের’ অবসান শুধু তাঁর হাতেই – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বেগম জিয়া – ‘আঁধার-দশকের’ অবসান শুধু তাঁর হাতেই

প্রকাশিত: ৫:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০১৮

বেগম জিয়া – ‘আঁধার-দশকের’ অবসান শুধু তাঁর হাতেই

শওকত মাহমুদ

“কোনও ইতিহাস স্বত্বের ইতিহাস নহে, তাহা সত্যের ইতিহাস। যে মহান সত্য নানা আঘাত-সংঘাতের মধ্য দিয়া পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে (রবীন্দ্রনাথ)।”

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন সত্যটি আঘাতে-সংঘাতে পূর্ণ হয়ে উঠছে? ফ্যাসিবাদের চলমানতা না গণতন্ত্রের পুনঃউন্মেষ? জালেমের রোষাগ্নি, না মজলুমের উত্থান? কোনটা চলবে আর কোনটা ঘটবে? মনে হতে পারে, দেহে-মনে ফ্যাসিবাদ মেখে বসে আছে যে স্বৈরাচার, তার বুঝি অবসান নেই। বিধ্বস্ত গণতন্ত্রের ভাগাড়ে বাংলাদেশ যেন পচতেই থাকবে। এক নেতার এক কন্যার মালিকানার যে গড়াপেটা ইতিহাস, তা বজ্রপাত ঘটিয়েই চলবে। বিশেষজ্ঞেরা জনমত যাচাই সম্পর্কে এমন এক দ্ব্যর্থ উপসংহারে একমত যে, যত গর্জে তত বর্ষায় না। বজ্রপাত সাময়িক। তা দেখে জনমত ঠাহর করা ভুল। প্রকৃত জনমত হচ্ছে ভোরের শিশিরের মতো, নীরবে নিঃশব্দে প্রতি বর্গ ইঞ্চি মাটি ও তৃণমূলকে ছেয়ে ফেলে। সত্যের উপলব্ধি সেখানেই। ইতিহাসের চালচলন নিয়ত সত্যাভিমুখী। জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা, ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লবে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের উচ্চ নিনাদ, এক বলিষ্ঠ ও আধুনিক বাংলাদেশ গঠনে শহীদ জিয়ার সুর্কীর্তির সম্ভার এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার তা বিকশিত করার সফল অভিযাত্রা, সর্বোপরি স্বৈরাচার বিরোধী আপসহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এক নতুন বিএনপি নির্মাণ ইতিহাসেরই এক সোনালী অধ্যায়। এ সত্যকে উপড়ে ফেলার দেশীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

ইতিহাসের নির্দেশ হচ্ছে, অন্যায় অনিয়ম ও পরনিন্দা আর খুনোখুনির মধ্য দিয়ে জালেম সরকারের যে প্রলম্বিত অবৈধ শাসন, তার ইতি আসন্ন। দিন বদলাবেই এবং তা হবে ইতিহাসের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী চরিত্র বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। এই সত্যটাই সুবহে সাদেকের মত দৃশ্যমান। কেন এবং কীভাবে? পতনের গল্পটা কোত্থেকে উঠবে? এর আখ্যান-ব্যাখ্যানই বা কী? মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে দণ্ড দেয়া থেকে? নাকি সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচন থেকে? ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ক্রান্তিলগ্নে এখন বাংলাদেশ। এর প্রতি জনপদই গণতন্ত্রের সুতীব্র আকাঙ্খায়, সভ্যতা ও আইনের শাসনের অসহনীয় তৃষ্ণায় অস্থির হয়ে উঠেছে এবং সেই গণবিস্ফোরণ ঘটবে বেগম জিয়ার ঈমানী নেতৃত্বে এবং জিয়া-সন্তান অসম্ভব জনপ্রিয় তরুণ নেতা আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের সেনাপতিত্বে। এই সত্যটাই আঘাতে-সংঘাতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সহ্যের অতীত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত নিপীড়নের কঠিন ঝঞ্ঝায় শুধুমাত্র প্রত্যয় নিষ্ঠার ওপর ভর করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যে, সভাতার এক নতুন জাগরণের জন্যে বেগম জিয়া সর্বাত্মক বিজয় ছিনিয়ে আনবেনই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একমাত্র বেগম জিয়ারই সক্ষমতা আছে এবং তা দু’বার করে ইতিপূর্বে তিনি দেখিয়েছেনও।

ইতিহাসের এই আলোকিত সত্যকে কে অস্বীকার করবেন যে, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরাজমান। সবচেয়ে বেশি আসনে নির্বাচিত হবার কৃতিত্ব তাঁরই। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসীর অকুণ্ঠ জনসমর্থন আর সুতীব্র সহানুভূতি তাঁকে ঘিরে আছেই। রাস্তায় নামলেই লক্ষ মানুষের ঢল। তরুণেরা তাঁর গাড়ি ঘিরে রাখে লৌহবেষ্টনীর মতন। রাজনীতির শুরুই হয়েছে এরশাদের স্বৈরশাসনকে ‘মানি না’, এই বজ্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং স্বৈরাচারী এরশাদের অশুভ আঁতাতে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নৈরাজ্য নীতিহীনতার ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। তা থেকে বাঁচানোর একমাত্র উজ্জ্বল বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়া। বুক ভরা সাহসে লড়াইটা জনগণের পক্ষে একাই করেন। নব্বইয়ে তিন জোটের রূপরেখা থেকে আজ অব্দি সেই সৎ, নীতি-নিষ্ঠ রাজনীতি তিনি ধরে রেখেছেন। কেউ বলতে পারবেন না, তিনি বাংলাদেশের কোনো অবৈধ শাসনকে ‘আই এম নট আনহ্যাপি’ অথবা ‘আমার আন্দোলনের ফসল’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এরশাদ এবং মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের স্বৈরতন্ত্রকে বেগম জিয়া অনমনীয় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায় করেছেন। বর্তমান দুনিয়ায় এমন কোন রাজনৈতিক নেতার কৃতিত্ব আছে  দু’টি সামরিক শাসন হঠানোর? ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রকে খুন করেছিল। বেগম জিয়া তা ফিরিয়ে আনলেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা অনিবার্য প্রধানমন্ত্রী – এমন ধারণায় ইতিহাসকে যখন সাব্যস্ত করা হচ্ছিল, অলক্ষ্যেই সেই শিশিরভেজা সত্যটি দৃশ্যমান হল। নাহ! আন্দোলনের সাচ্চা নেত্রী বেগম জিয়াই প্রধানমন্ত্রী, তার হাতে গড়া নতুন বিএনপিই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। বেগম জিয়ার গণতন্ত্র-বোধ পরিমাপে একটি দৃষ্টান্ত অবশ্য-উল্লেখ্য। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন হবার বিধান ছিল ওয়ার্ড কমিশনারদের ভোটে। এতে করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী জেতে। কিন্তু তিনি মেয়র পদকে জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হবার বিধান করলেন। আর সংবিধানের প্রতি আনুগত্য? তিন জোটের রূপরেখা অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টির তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার যুগপৎ আন্দোলন ছিল নব্বই দশকে একটি অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সংসদ থেকে আগেই পদত্যাগ করে ওইসব দল বেগম জিয়াকে এই বিপদে ফেলতে চেয়েছিল যে, তিনি ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেন সংসদে এ সংক্রান্ত বিল পাস করাতে না পারেন। তিনি যেন কোনো সংবিধানসম্মত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে না পারেন। পর্দার অন্তরালে ওই অশুভ আঁতাত সামরিক অভ্যুত্থানের প্ররোচনাই দিচ্ছিল। এটা হত বেগম জিয়ার সারা জীবনের জন্য কলংক। কিন্তু বেগম জিয়া শুধুমাত্র সংবিধান সংশোধনের নিমিত্তে ’৯৬ সালে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিলেন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে এই চক্রান্ত নস্যাৎ করলেন। জেনারেল নাসিমের ক্যু হয়েও হতে পারলো না। রাজনীতির নীতি-নৈতিকতা বেগম খালেদা জিয়া জীবনজুড়ে মেনে চলেছেন। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে যাননি। ’৮৬, ’৮৮, ২০১৪ তার উদাহরণ। এবারের লড়াই তাঁর চূড়ান্ত লড়াই। জালেম হাসিনা সরকারের অধীনে ভোট নয়। আজ প্রমাণ হয়েছে, ২০১৪ তে ভোটে না গিয়ে তিনি কতো বড়ো প্রজ্ঞা এবং নৈতিক ধারাবাহিকতার পরিচয় দিয়েছেন। গোটা বিশ্ব আজ একমত, বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন মানে ৩০০ আসনে স্ব-দলীয় প্রার্থীর অর্ধেকের বেশি বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া।

শুধুই কি গণতন্ত্রের সংগ্রামের জন্যে খালেদা জিয়া চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন? তাঁর দেশ পরিচালনাকালে আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্বত্র প্রশংসিত। ঢাকা থেকে সবগুলো মহাসড়ক দিয়ে বাইরে গেলে দু’পাশে আজ যে শুধু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনার সম্ভার, তা তাঁর আমলেই। ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপকতার দরুন দশ গ্রাম মিলে সাপ্তাহিক হাটের বদলে প্রত্যেক গ্রামে আজ বাজার বসে, টাকা দিয়ে লেনদেন হয়। নারীরা ক্ষুদ্র ঋণে স্বাবলম্বী- এটা তাঁর সাফল্য। খাদ্যে, মাছে স্বয়ম্ভরতা, নারী শিক্ষার বিপ্লব, রফতানির সমৃদ্ধি সবচেয়ে বড় কথা ২০০৫-৬ অর্থবছরে ৭০ হাজার কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি এবং জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ এ পৌঁছার অবিশ্বাস্য কাহিনীর নির্মাতা বেগম খালেদা জিয়াই। আজকের স্বৈরাচারের মতো গণতন্ত্র হত্যা করে উন্নয়নের যজ্ঞে তিনি মাতেননি। এই উন্নয়ন হচ্ছে দুর্নীতি-তাড়িত। খালেদা জিয়া গণতন্ত্র অর্থাৎ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে উন্নয়ন করেছেন। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায় যা হচ্ছে Freedom oriented development বা অধিকারভিত্তিক সমৃদ্ধি।

প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী যে পদে থাকুন বা না থাকুন, বেগম জিয়া রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে সর্বদাই। তাঁর গণতান্ত্রিক ঔদার্যকে উপহাস করা হোক, তাঁকে নিয়ে গীবৎ, কটু-কাটব্য যতই বর্ষিত হোক, তাঁকে ঘরছাড়া করা হোক বা বাড়ি ও অফিসে অন্তরীণ রাখা হোক, তাঁর ওপর মরিচের গুঁড়া স্প্রে করা হোক, তাঁর গাড়িতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হামলা করুক, তাঁর পথের দু’পাশে উদ্বেলিত জনতাকে পুলিশ পেটাতে থাকুক, বেগম জিয়া আছেন অবিচল। মামলার তারিখ যত দ্রুতই দেয়া হোক, তিনি হাসিমুখে আদালতে যান, ঠায় বসে থাকেন। তাঁকে জনসভা করতে দেওয়া হয় না, সংবাদ সম্মেলন সরাসরি সম্প্রচার করতে বাধা দেয়া হয়। কেননা তাঁর কথায় মানুষ উদ্বোধিত হয়।

বিশেষ করে ২০০৭ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কেটেছে বাংলাদেশ ও তার গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকায়। সাধারণ মানুষ, দলের নেতা কর্মীর জন্য তাঁর সহানুভূতি ফুরোয় না। অপার তাঁর নিজস্ব মনোবেদনা। পারিবারিকভাবে নি:সঙ্গ। এক-এগারোর সময় জেলে ছিলেন, মৃত্যুশয্যায় মাকে দেখতে পারেননি। দুই ছেলেকে জেলে নির্যাতন করা হচ্ছে। তারেক রহমানকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল ১-১১র বর্বর ক্ষমতাদর্পী শাসককুল। কী বিভীষিকার দিনগুলো ছিল তখন! রাজনীতি থেকে বিয়োগ করার জন্য কী চাপ, বিদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু বেগম জিয়া বেগম জিয়াই। দেশ ছেড়ে দেশের জনগণকে ছেড়ে তিনি বিদেশে গেলেইন না। তারেক রহমান মুক্তি পেয়ে যেদিন পিজি হাসপাতালে, কী অঝোর কান্নায় জড়িয়ে ধরে ছিলেন সন্তানকে। মানুষ দেশনেত্রীর সেই কান্নায় কেঁদে ছিল। আজ তারেক রহমান মিথ্যা মামলায় মামলায় দুর্বিষহ অবস্থায় বিদেশে। দুর্নীতির খলনায়ক বানাবার হাজারো অপচেষ্টা বিফলে গেছে। তিনি দেশে আসতে পারেন না। আরাফাত রহমান কোকো ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু লাশ হয়ে। সরকারের নির্যাতনে কষ্টে কষ্টে ওই প্রাণবন্ত তরুণটি অকালে মরে গেল। জানাজার নামাজে লক্ষ লক্ষ মুসল্লি অশ্রুভেজা চোখে তাতে অংশ নিল। ২০০৮ এর নির্বাচনের সময় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের এক অংশে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন- “মানুষ হিসেবে আমি ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলাম না। ব্যর্থতার গ্লানিও আমাকে অনেক সময় স্পর্শ করেছে; কিন্তু যে সীমাহীন কুৎসা এবং অপপ্রচারের শিকার আমাকে হতে হচ্ছে, সেটা কি আমার প্রাপ্য? আপনারা দেখেছেন, অপপ্রচারের পথ ধরেই আমাকে আপনাদের কাছ থেকে মাইনাস করার, বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা হয়েছে। এ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে আমাকে বিনা অপরাধে ছয় মাস গৃহবন্দী ও এক বছর নির্জন কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে, আমি আমার মায়ের মৃত্যুর সময়ও তাঁর পাশে থাকতে পারিনি। গুরুতর অসুস্থ সন্তানদেরও দেখতে দেয়া হয়নি। তারপরও যতদিন বাঁচি, আপনাদের মাঝেই থাকব। প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশই আমার একমাত্র ও শেষ ঠিকানা।”

অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ক্রসফায়ারে নিহত ও গুমে নিখোঁজ স্বজনেরা এবং নানা নির্যাতনে ক্লিষ্ট মানুষেরা যখন বেগম জিয়ার সান্নিধ্যে যান, তখন তিনি এমনভাবে সান্ত্বনা দেন যেন তাঁর কোনো নিজস্ব বেদনা নেই । তারা আশ্চর্য হয়ে যান এই মহিলার অসম্ভব মনের জোর ও আত্মপ্রত্যয় দেখে। জীবনভর সংগ্রামই করে চলেছেন, তবু মাথা নোয়াবার নয়। মহান স্বাধীনতার ঘোষকের স্ত্রী, হানাদার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহী ও যুদ্ধ সূচনাকারীর সহধর্মিণী হিসেবে পরিবারসহ বন্দী ছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে সংসারে নিভৃতে ছিলেন। শহীদ জিয়া যেমনিভাবে দরখাস্ত করে ক্ষমতার মঞ্চে আসেননি, তেমনি খালেদা জিয়াও বিএনপির চেয়ারপার্সন স্বেচ্ছায় হননি। দল এবং জনগণের অনুরোধে ওই দায়িত্ব নিয়ে কী সংগ্রামী জীবনই না যাপন করছেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র রহমত তাঁর প্রতি আছে। নইলে এমন রাজনৈতিক নেতা কে আছেন, যাঁর প্রতি নির্যাতনের কুঠারাঘাত প্রতিনিয়ত বর্ষিত হয়। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে বিএনপি আজ সুবিশাল দল। বৃহত্তম দল। জালেমদের শত প্রলোভনে-নির্যাতনে কেউ দল ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যাননি। ২০১৪ সালে শাসক দলের কর্তারা ঢেঁকুর তুলতেন, আরেক বিএনপি ভোটে আসবে।

ডজন ডজন মিথ্যা মামলার বিষচক্রের পাশাপাশি তাঁকে প্রতিদিন সইতে হয় বিদ্রুপ ও অপপ্রচারের বিষবাষ্প। এ ক্ষেত্রে খোদ শেখ হাসিনা বাড়বাড়ন্ত। মূলত সততায় জিয়া পরিবার অনেক উচ্চতায় বলেই সইতে হয় এ কুৎসা। বেগম জিয়া ও তারেক রহমান শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে সম্প্রতি তিনি অভিযোগ করেছেন এবং কেন তার দেয়া অনুমতিপ্রাপ্ত টিভিগুলো তা প্রচার করেনি, তা নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। খবর নিয়ে জেনেছি, অধিকাংশ টিভি স্টেশন সেই তথ্যের সূত্র সত্যতা খুঁজে পায়নি বলে প্রচার করেনি। অথচ মন্ত্রীরা এখনও বলে বেড়াচ্ছেন-প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন, তখন নিশ্চয়ই প্রমাণ আছে। বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এ বিষয়ে আইনি নোটিশের মাধ্যমে একটা মোক্ষম অস্ত্র ছুঁড়ে দিয়েছেন। এখন উল্টো হুমকি দেয়া হচ্ছে-কেন নোটিশ? প্রত্যাহার করা হোক নোটিশ। আসলে ‘তথ্য’ বলতে কি বোঝায়, জালেমের ঝুলিতে তথ্যের সংজ্ঞা কি এ সম্পর্কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপেন্দু চক্রবর্তীর ‘তথ্যের অধিকার চর্চা’ শীর্ষক একটা লেখা পড়েছিলাম। তার মতে, ‘তথ্য হচ্ছে সেই বস্তু যা অপরকে ঘায়েল করার জন্য জড়ো করা হয় এবং নিজেদের বাঁচানোর জন্যে অদৃশ্য করা যায়, অথবা ঘুলিয়ে দেয়া যায়।” তথ্য সন্ত্রাস এখন বড় হাতিয়ার। সম্প্রতি খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশে এসেছিলেন। আওয়ামী লীগের তথ্যসন্ত্রাস সম্পর্কে অবহিত হয়েই বলেছিলেন কিনা জানি না নইলে কেন তিনি এক বক্তৃতায় বলে বসলেন- ‘পরনিন্দা এক ধরনের সন্ত্রাসবাদ’।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আমাদের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা গীবত করা, অন্যের নামে অপবাদ দেয়াকে ভীষণ অপছন্দ করেন। পবিত্র কোরআন শরীফে সুরা হুজুরাত এর ১১ ও ১২ নং আয়াতে তিনি বলেছেন, “হে যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কোনো পুরুষ কাউকে যেন বিদ্রুপ না করে, কেননা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে তারা উত্তম হতে পারে আর মহিলাদের মধ্য থেকে কোনো মহিলা যেন কোনো মহিলাকে বিদ্রুপ না করে, কেননা বিদ্রুপকারীদের চাইতে সে উত্তম হতে পারে এবং তোমরা খোঁটা দিও না পরস্পরকে, মন্দ নামে অভিহিত করে ডেকো না। ঈমানের পর ফাসিক নাম যুক্ত হওয়া অত্যন্ত মন্দ বিষয়। আর যারা এ জাতীয় কাজ থেকে তওবা করেনি তারাই যালিম। হে, যারা ঈমান এনেছো, তোমরা বিরত থাকো, অনেক ধারণা অনুমান থেকে, অবশ্যই কোনো কোনো ধারণা-অনুমান গুনাহ, আর তোমরা দোষ খুঁজে বেড়িও না এবং তোমাদের কেউ যেন অপরের গীবত না করে”।

রাসুল্লাহ সা. বলেছেন, “গীবত যিনা বা ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য গুনাহ। কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে গুনাহ মাফ হয়ে যায়, কিন্তু যে গীবত করল তার গুনাহ প্রতিপক্ষের মাফ করা ছাড়া মাফ হয় না। অতএব শেখ হাসিনার গীবতের পাপ বেগম খালেদা জিয়া মাফ না করলে মাফ হবে না। উদার মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী ক্ষমাপরায়ণ বেগম জিয়া সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে মাফ করে দিয়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা এর মর্ম কি বুঝতে পেরেছেন?

বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুছে দিতে কতই না হিংস্র প্রয়াস চলছে। কিন্তু রাজনীতি করার, দেশটাকে বাঁচাবার, জাতিকে গণতন্ত্র দেবার ইচ্ছেটা কখনও তাঁর মনে মরেনি, মরবেও না। ৩৫ বছরের রাজনীতিতে তিন নম্বর স্বৈরশাসনকে গণজাগরণের মধ্য দিয়ে বিদায় দিতে তিনি দৃঢ়সংকল্প। তাঁর চূড়ান্ত বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

বেগম জিয়ার মতো অসামান্য রাজনৈতিক নেত্রীর পক্ষেই মানুষকে এমন সভ্য স্বপ্ন দেখানো সম্ভব, যখন তিনি বলেন, “শরতের আকাশে সাতটি রংয়ের বিচিত্র প্রভাব নিয়ে রংধনু যেভাবে মনোরম সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ ঘটায়, আমরা চাই সকল মত ও পথকে নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন ও পরিপুষ্ট করতে যে সংস্কৃতি বাংলাদেশকে একটি রংধনু জাতিতে (Rainbow Nation) পরিণত করবে। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ও ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। এ জন্য নতুন এক সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে বিএনপি সচেষ্ট হবে (ভিশন-২০৩০)।” হয়তো আওয়ামী লীগের দুঃশাসন প্রলম্বিত হয়েছে। কিন্তু জালেমের গলায় এখন ফাঁস পড়ে গেছে। গায়ের জোরে জবরদস্তিতে আরেক মেয়াদ থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সকল প্রজন্মের কাছে উৎকটভাবে নগ্ন হয়ে পড়েছে। এক দীর্ঘ ঘোর অমানিশায় গেঁথে গেছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। সে দিন দূরে নয়, মেগা দুর্নীতি, লোমহর্ষক গুম-খুন, অবিশ্বাস্য ভোট চুরি ও লাগামহীন স্বেচ্চাচারিতার ঘটনাগুলো উদঘাটিত হয়ে যাবে। বেগম জিয়ার ধৈর্যে আমরাও ধৈর্যশীল। ফার্সি ভাষায় একটা প্রবাদ আছে ‘দের আয়েদ দূরস্ত আয়েদ’। যা দেরিতে আসে, সাজানো-গোছানোই আসে। এক দশকের অন্ধকারের সমাপ্তি বেগম জিয়ার হাতেই।

  • লেখক – ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি এবং সাংবাদিক।