বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী আজ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ৮:১০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০১৬

বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী আজ

13988850_1280831188603079_1096539883_nএস.কে.এইচ.সাহান: আজ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাত্রিতে জাতির জনকের হত্যাকারীদের নিষ্ঠুর, বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তিনিও শাহাদাৎ বরণ করেন। তিন বছর বয়সে পিতা ও পাঁচ বছর বয়সে মাতাকে হারানো রেণু নামের শিশুটি ১৯৩০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা, বিয়ে ও সংসার শুরুঃ- শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর থেকে রেণুকে তার শাশুড়ি বঙ্গবন্ধুর মাতা সাহেরা খাতুন নিজের সন্তানদের সঙ্গেই মাতৃস্নেহে লালন-পালন করে বড় করেছেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া এবং ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য মৌলভি এবং বাংলা, ইংরেজি ও অংক শিক্ষার জন্য গৃহশিক্ষক রাখার সেকালীন রেওয়াজ অনুযায়ী পড়ালেখা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে এটুকু হলেও এই মহিয়সী নারী প্রমাণ করেছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ না করেও কিভাবে নিজে মহান হওয়া যায়, মানুষ গড়া যায় এবং সেই মানুষকে দিয়ে নতুন দেশ জন্ম দেওয়া যায়। রাজনৈতিক ভুমিকায় স্বামীকে প্রেরণাঃ এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়, ১৯৪৬ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তিকালের দুটি ঘটনার। সদ্য প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে বেগম মুজিবের স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আব্বা, মা, ভাই- বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি কিছু টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্রুসজল’ বোধহয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। বলল, “একবার কলকাতা গেলে আর আসতে চাও না। এবার কলেজ ছুটি হলেই বাড়ি এস।” এতেই বুঝা যায় স্বামী অন্তপ্রাণ স্ত্রীর অনুভূতি। এর পরে ১৯৪৭ সালের বিভক্তির চূড়ান্ত সময়ের প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে যার শুরু মূলত জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’কে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ সালে ১৬ আগষ্ট থেকেই। সেটার ধারাবাহিকতা ১৯৪৭ এর বিভক্তির পরেও চলছিল। সেই দাঙ্গার সময়ে যুক্তবাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। শেখ মুজিবের প্রিয় নেতা মুজিবকে বললেন, ‘এই দাঙ্গার সময়ে শুধু সরকারি কর্মচারীদের উপরে ভরসা করতে পারছি না। তাই তুমি যদি ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডের একটা ভলান্টিয়ার কোর গঠন করে বর্ডারে গিয়ে শরর্ণার্থীদের আসা-যাওয়ার বিষয়টি তদারক কর তবে আমি নিশ্চিন্ত থাকি।’ একথা বলেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী দ্বিধাগ্রস্তভাবে শেখ মুজিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি জানি রেণুর শরীর ভালো নয়। তার উপর বাচ্চা হারিয়েছে (১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে তাদের প্রথম ছেলে সন্তান জন্ম হয়ে মারা যায়)। তোমার উচিৎ তাকে সঙ্গ দেওয়া। অবশ্য আরো প্রায় দশ দিন সময় বাকি আছে কাজ শুরু হতে। তুমি ভেবে দেখো। আর তোমার পক্ষে সম্ভব না হলে অন্য কারো নাম সাজেষ্ট করতে পারো।’ শেখ মুজিব শুধু কয়েকদিন সময় নিয়ে চলে এলেন। তখন বেগম মুজিব অন্তসত্ত্বা ছিলেন। এর আগে সন্তান হারানোয় এবার ভেবেছিলেন হয়তো স্বামীকে কাছে পাবেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতার ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করে লিখলেন চিঠি। তার স্ত্রীও উত্তর দিলেন। সেই উত্তরে স্বামীকে নিশ্চিন্তে তার কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে লেখেন, “আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপরে আমার ভার ছেড়ে দিন।” এরকম চিঠি অন্য কোনো পতিব্রতা নারী লিখেছে কি না ইতিহাসে তেমন পাওয়া যায় না আজও। অথচ গ্রামের অল্পবয়সী একজন নারী যার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই বললেই চলে তিনি লিখেছিলেন সেই ব্রিটিশ ভারত যুগে। এখানেই স্বামীকে দেশের জন্য উৎসর্গ করা একজন বিদূষী নারীর চরিত্র ফুটে ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান এই চিঠি পাওয়ার পরেই তার নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নিকট গিয়ে শরণার্থীদের তদারকিতে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করেন। শহীদ সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘তুমি রেণুর সঙ্গে পরামর্শ করেছো?’ মুজিব হ্যা সুচক জবাব দিয়ে বললেন, চিঠি পেয়েছি। সে নিশ্চিন্তে দেশের কাজে যেতে বলেছে।’ শহীদ সাহেব রাশভারী মানুষ ছিলেন। ভাবাবেগ প্রকাশ করতেন না। কিন্তু সেদিন শেখ মুজিবকে বললেন, ‘Mujib, She is a very precious gift to you from God. Don’t neglect her please.’ অথাৎ ‘মুজিব, সে তোমার জন্য খোদার দেওয়া অমূল্য দান। তাকে অবহেলা করো না।’ পরবর্তী ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা কত সঠিক। পাকিস্তান আমলে আন্দোলনঃ এর পরের ইতিহাস শুধুই কষ্টের শুধু ত্যাগের। যে পাকিস্তানের জন্য পরোক্ষভাবে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ভূমিকা রেখেছিলেন সেই পাকিস্তানেই শুরু হলো নতুন দেশ জন্মের আদিপাঠ। যে আন্দোলনের পুরোভাগে অধিনায়কত্ব করেছেন শেখ মুজিব আর অন্তরালে বেগম মুজিব। কেননা বেগম মুজিব আর দশজন সংসারী নারীর মতো স্বামীকে শুধু ঘরে আটকে রাখেননি। অনুপ্রেরণা, শক্তি, সাহস, মনোবল ও প্রেরণা যুগিয়ে স্বামীকে সংগ্রামী হওয়ার জন্য নিজে সকল রকম ত্যাগ স্বীকার করেছেন এই মহিয়সী নারী। ‘৭১ এ মুক্তির সংগ্রামের শুরু তথা অসহযোগ আন্দোলনঃ স্বামীর সংগ্রাম ও অধিনায়কত্বের ধারাবাহিকতায় বাঙালি মুক্তির স্বাধ পেতে বিপ্লবী ভূমিকায় আবিভূত হয়। অপরদিকে পাকিস্তানি হায়েনাদের হিংস্রতায় সমগ্র বাঙালির জীবনে নেমে আসে ‘৭১ এর দুযোগময় দিন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবাবের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ভূবনখ্যাত ভাষণের রাতেই ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িতে খাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার যা বলার ছিলো আজকের জনসভায় তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যে কোন মুহূর্তে গ্রেফতার বা হত্যা করতে পারে। সেজন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দু’বেলা আমার সঙ্গে একত্রে খাবে’। শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল, শেখ শহীদ, ড এম এ ওয়াজেদ মিয়া এবং বেগম মুজিবকে উদ্দেশ করে এমনটিই বলেছিলেন। সেই থেকে ২৫শে মার্চ দুপুর পর্যন্ত একবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি।

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল