বোমা মেশিন এখন বিছনাকান্দিতেও – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

বোমা মেশিন এখন বিছনাকান্দিতেও

প্রকাশিত: ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০১৬

বোমা মেশিন এখন বিছনাকান্দিতেও

companigonjer Boma mtionওপারে ভারতের উঁচু পাহাড় থেকে নেমে এসেছে একটি ছড়া। সীমানা পাড়ি দিয়ে এ দেশের পাহাড়ের পাদদেশে পেতেছে জল-পাথরের প্রাকৃতিক এক শয্যা বা বিছানা। এর নাম বিছনাকান্দি।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার এই বিছনাকান্দির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ। জল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। তাতে ছায়া পড়ে পাহাড়ের। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। এ জন্য সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। ঈদসহ ছুটির দিনগুলোতে এখানে পর্যটকদের ঢল নামে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ওপর এবার কুনজর পড়েছে পাথর ব্যবসায়ীদের। তাঁরা পরিবেশ ধ্বংস করে নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’ দিয়ে পাথর উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, বিছনাকান্দির সঙ্গে মিলিত হওয়া পিয়াইন নদের তীরে অন্তত সাতটি স্থানে বোমা মেশিন বসানোর প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে বিছনাকান্দির সঙ্গে মিলিত হওয়া পিয়াইন নদের একটি বাঁকে বড় বড় পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। এক পাশে চলছে অস্থায়ী ঘর নির্মাণের কাজ।
বোমা মেশিন মূলত পাওয়ার পাম্প ও পাইপ দিয়ে তৈরি একটি যন্ত্র। এটি চালালে বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ হয়। এ যন্ত্রের সাহায্যে মাটির প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করা সম্ভব। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের জাফলং পাথর কোয়ারিতে এ যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর পরিবর্তন হয়ে ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল। এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করলে বোমা মেশিন নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সঙ্গে বোমা মেশিনের ব্যবহার বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
বিছনাকান্দি ও পাশের হাদারপাড়ের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বিছনাকান্দির যে অংশটি পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে, সেখানে কোনো পাথর কোয়ারি নেই। কিন্তু এ পাথরগুলোর প্রতি উত্তোলনকারীদের বদনজর পড়েছে। কোয়ারিতে সনাতন পদ্ধতিতেই পাথর উত্তোলন হচ্ছিল। এবারের বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে বিছনাকান্দির চারজন প্রভাবশালী পাথর উত্তোলনকারী বোমা মেশিন আমদানি করেছেন।
বিছনাকান্দি থেকে পিয়াইন নদ পর্যন্ত একটানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা গেছে, বোমা মেশিন বসানোর কাজ চলছে। এর মধ্যে বাঁশের আড় বসিয়ে তীর থেকে নদ পর্যন্ত বোমা মেশিনের পাইপ স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখানে বড় আকারের তিনটি বোমা মেশিন ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি থেকে আনা হবে বলে কর্মরত শ্রমিকেরা জানিয়েছেন। পিয়াইন নদের উজানে দেখা গেছে, একটি ভেলায় করে শ্রমিকেরা বোমা মেশিন সেখানে নিয়ে যাচ্ছেন। এ দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণের সময় আলোকচিত্রী বাধার মুখে পড়েন।
পরে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে বোমা মেশিন পরিচালনার বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে হাদারপাড় বাজার এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা চারজন ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আগে আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া আবদুল মতিন ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন রয়েছেন। তাঁরা বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের জন্য সিন্ডিকেট গঠন করেছেন।
তবে মুঠোফোনে জানতে চাইলে আবদুল মতিন বলেন, ‘না না, আমি না!’ এ কথা বলে মুঠোফোন কেটে দেন। পরে আর মুঠোফোন ধরেননি। জয়নালের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
বিছনাকান্দিতে বোমা মেশিন বসালে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে—এ উদ্বেগ জানিয়ে স্থানীয় বাজারের অন্তত ১৭ জন ব্যবসায়ী বলেন, টাস্কফোর্সের জোরালো অভিযান চালানো উচিত।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বিছনাকান্দিতে বোমা মেশিন নেমেছে। এর মধ্যে তিন দিন আগে এক দফা অভিযানে দুটি বোমা বেশিন ধ্বংস করা হয়। ওই অভিযানের পর আরও ১০-১২টি বোমা মেশিন চালানোর প্রস্তুতি চলছে বলে শুনেছি। ঈদের জন্য এখন আর টাস্কফোর্স সমন্বয় সম্ভব নয়, তাই বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন। পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়ে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল