‘বোমা মেশিন’ প্রাণবিধ্বংসীও – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

‘বোমা মেশিন’ প্রাণবিধ্বংসীও

প্রকাশিত: ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৬

‘বোমা মেশিন’ প্রাণবিধ্বংসীও

companigonjer Boma mtionউজ্জ্বল মেহেদী: সিলেটের ভোলাগঞ্জ ও জাফলং পাথর কোয়ারিতে চলা পরিবেশবিধ্বংসী অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ এখন প্রাণবিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। প্রায় এক বছরে অবৈধ এ যন্ত্র চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় ছয়জন পাথরশ্রমিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বোমা মেশিনের পাইপে ও গর্তে আটকা পড়ে নিহত হন দুজন। আর পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিন বসানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হামলায় কলেজছাত্রসহ হত্যার ঘটনা ঘটেছে তিনটি।

এই অবস্থায় পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত বোমা মেশিনবিরোধী ‘টাস্কফোর্স’ও বিচলিত। এ ব্যাপারে টাস্কফোর্স-সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভিযানে নামলেই হামলার আশঙ্কা থাকে। তাই কোনো অভিযানই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না।

পাথর কোয়ারি ঘুরে দেখা গেছে, বোমা মেশিন মূলত পাওয়ার পাম্প আর পাইপ দিয়ে তৈরি একটি যন্ত্র। চললে এটি বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ হয় বলে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোমা মেশিন’। এ যন্ত্র মাটির ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীর থেকে পাথর উত্তোলন করতে সক্ষম। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের জাফলং পাথর কোয়ারিতে এ যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলনে ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর পরিবর্তিত হয়ে ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল।

বাংলাদেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত একটি রিট করলে ‘বোমা মেশিন’ নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে এ-সংক্রান্ত অভিযান পরিচালনা করতে নির্দেশনা জারি হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হয়। গত সাত বছরে তিন শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে ৮০০টি বোমা মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন থামছে না।

বোমা মেশিনে প্রথম ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকায় রেলওয়ের একমাত্র রজ্জুপথ। পাথর পরিবহনে স্থল ও জলপথের বিকল্প পথ হিসেবে ভোলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের ছাতক পর্যন্ত রজ্জুপথ ১৯৬৪ সালে স্থাপন করা হয়। ধলাই নদের তীর ঘেঁষে ২০০৮ সাল থেকে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করার একপর্যায়ে রজ্জুপথের সংরক্ষিত বাংকার এলাকায় বোমা মেশিন চালিয়ে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। সংরক্ষিত এলাকার ৩৫৯ একর জায়গার মধ্যে ১৪১ একর ভূমিধসের মুখে পড়লে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ওই ভূমি রক্ষায় ১৪৪ ধারা জারি করে রেলের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করে।

একইভাবে জাফলংয়ের পিয়ানইন নদের তীরে বোমা মেশিন চলায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে জাফলং চা-বাগান। প্রায় ৩০০ একর চা-ভূমি বোমা মেশিনের কারণে ধসের মুখে পড়েছে বলে জাফলং চা-বাগান কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে টাস্কফোর্সকে অবহিত করেছে।

বোমা মেশিন চালানোর পর পাথর কোয়ারি এলাকায় যেসব গর্তের সৃষ্টি হয়, সেগুলো অরক্ষিত থাকে। এসব গর্তে চোরাবালিতে পড়ে পাথরশ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত বছরের আগস্ট থেকে মে পর্যন্ত নয় মাসে এ রকম পাঁচটি দুর্ঘটনায় ছয়জন পাথরশ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে।

গত ১০ মে জাফলংয়ে বোমা মেশিন চালাতে গিয়ে পাইপে আটকা পড়ে গোয়াইনঘাটের ভিত্রিখেল গ্রামের নওয়াজেশ খান (৩০) নামের একজন পাথরশ্রমিক ক্ষতবিক্ষত হয়ে মারা যান। এ ঘটনার চার দিনের মাথায় ১৪ মে জাফলংয়ে বোমা মেশিনের গর্তে পড়ে বালুচাপায় মারা যান সাঁতার গ্রামের মশিউর রহমান (৪৫) নামের আরও এক পাথরশ্রমিক।

গোয়াইনঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাসির উদ্দিন জানান, এসব মৃত্যু কার্যত হত্যাকাণ্ডের মতো। কিন্তু এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি বলে পুলিশও অপমৃত্যু মামলা করতে বাধ্য হয়।

গত বছরের ২৮ আগস্ট বিনাম হোসেন (১৬) নামের এক কিশোর, ৩১ অক্টোবর ওই এলাকার বাসিন্দা সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র শামীম আহমদ ওরফে ছোটন (২৪) ও গত ১৫ জুন ভোলাগঞ্জ কাস্টমস ঘাটে ফয়সল আহমদ (৩০) নামের একজন বোমা মেশিন পরিচালনার ব্যবস্থাপক খুন হন।

এসব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বায়েস আলম জানান, তিন খুনের পেছনে ছিল পাথর ব্যবসার অবৈধ প্রভাব। বিনাম ও ছোটনের খুনি চিহ্নিত হওয়ায় মামলা আদালতে বিচারাধীন। ফয়সল হত্যাকাণ্ডে তাঁর বাবা তোতা মিয়া আটজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ ঘটনার দিনই এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

সূত্র: প্রথম আলো

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল