ব্রীজটা ভেংগে গেলেও ঠিকানাটা হৃদয়ের প্রযত্নে থেকে যাবে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ব্রীজটা ভেংগে গেলেও ঠিকানাটা হৃদয়ের প্রযত্নে থেকে যাবে

প্রকাশিত: ১২:২০ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২০

ব্রীজটা ভেংগে গেলেও ঠিকানাটা হৃদয়ের প্রযত্নে থেকে যাবে

শাহরিয়া বিপ্লব :
বড় হতে শুরু করেছি যখন থেকে, ঠিক তখন থেকেই মনের গভীরে সযতনে রক্ষিত কিছু নাম। মায়ের গল্প কথায়, বড়দের স্মৃতি গাঁথায় যে নামগুলো আমাদের পরিবারের সাথে মিশে গিয়েছিলো, তাঁদের একজনকে আজ সমাহিত করে এলাম।
উনাকে সমাহিত করতে গিয়ে বার বার আব্বাকেই খুঁজছিলাম।
আব্বার কাছ থেকেই জামালগঞ্জের সি ও সাহেব। সার্কেল অফিসার। আজকের নির্বাহী কর্মকর্তার মতো স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি।
মুক্তিসংগ্রাম আসন্ন। দেশ কম্পিত হচ্ছে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে। সিও সাবের সততা আর দেশপ্রেমের কারনেই আব্বার সাথে গড়ে উঠেছিলো আত্মার সখ্যতা।
দেশপ্রেম আর সততার বিপরীতে থাকে ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও কুট শয়তানি। স্বাভাবিক ভাবে সিও সাহেবের বিরুদ্ধেও তাই ছিলো। আব্বা পাশে দাঁড়ালেন আপন ভাইয়ের মতো।
ইতিমধ্যে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। উনার বড় ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধে গেলেন। সিও সাহেব আওয়ামীলীগ নেতাদের বিশেষ করে আব্বা আর জমিরউদ্দিন মাস্টার সাহেবের সাথে সম্পর্ক রাখছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করছেন। সঙ্গত কারনেই স্থানীয় কুচক্রী মহল ও রাজাকারদের টার্গেটে পরিনত হলেন। কিন্তু নিজেকে বিক্রি করে দেননি পাকিস্তানের হাতে।
স্ত্রী পুত্র কন্যাদেরকে আমাদের বাড়ীতে রেখে নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে সিও সাহেব । সেই থেকেই
এই পরিবারের সাথে গড়ে উঠেছে আমাদের আত্মিক বন্ধন। মায়ের মূখে এখনো সিও সাবের পরিবারের কথা শুনি আর আবেগে আপ্লুত হই। উনার স্ত্রীর হাতে বানানো সোয়েটার, মাফলার লুকিয়ে রেখেছেন আমার মা। এই পরিবারের স্মৃতি হিসাবে।
যুদ্ধের পরে সিও সাবের সাথে আমাদের পারিবারিক বন্ধনে নতুন উপাদান যোগ হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে আব্বা বলে গিয়েছিলেন উনার সন্তানদের সাথে সম্পর্কটা ধরে রেখো।
এই আনোয়ার সাবকে ফেনার বাঁক এবং ঢাকা শহরের একটি ব্রীজ হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন।
আব্বা তাঁর মৃত্যুর আগে সিও সাবকে দেখতে এসেছিলেন। আমি তখন দেখেছিলাম তাঁদের সখ্যতা।
আব্বা মারা যাবার পরে সিও সাবের বাসা ২২২/সি হয়েছিলো আমার ঠিকানা। প্রযত্নে আনোয়ারুল ইসলাম লিখে চাকুরির কতো আবেদন করেছি। আনোয়ার সাহেব আমার প্রতিটি চিঠি যত্ন করে রাখতেন। কোনও দিন বিরক্ত হন নি।
আমার দুঃস্বহ কষ্টের দিনগুলিতে এই বাসায় এসে আব্বাকে খুঁজতাম। সিও সাবের ছোট ছেলে আনিস আংকেল আমাকে বার বার আপনজনের মতো দরদী হাত বাড়িয়েছেন। আমাদের গ্রামের প্রতিরক্ষা দেয়ালসহ সি এন আর এস এর মানবিক যতো কাজ সি ও সাহেবের স্মৃতিকে আরো সমুজ্জ্বল করেছে।
আজ সকাল বেলা আনোয়ার সাহেব হঠাৎ করে চলে গেলেন। দেরীতে খবর পেয়েছি। এর মধ্যে আম্মা বার বার তাগিদ দিচ্ছিলেন। তাড়াতাড়ি যাও। উনি তোমার আত্মীয়ের চেয়েও বড় আত্মীয়।
সারাদিন লাশের পাশেই ছিলাম। তালতলা কবরস্থানে মাটি দিচ্ছিলাম। উনার ছোট ছেলে সাব্বির শোকে পাথর হয়েছে যেনো। নিজেকে ওর জায়গায় রাখতে গিয়ে ভিতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছিলো। আহা। এই বয়সে আমি পারিনি। ও নিজের হাতে তার বাবাকে কবরে শুয়ে দিয়েছে। আমরা সবাই চলে এসেছি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷
ও একা আবার ফিরে গেছে। বাবার কবরে হয়তো সে শুয়ে পড়েছিলো। হয়তো ডুকরে কঁদেছে।। হয়তো আরেকবার বাবার বুকে মাথা ঠেকাবার চেস্টা করেছে।
সাব্বিরকে, তানভীরকে শান্তনা দিতে আমি পারবো না। ওদের দিকে তাকাতেও পারিনি।
আমি আমাকেও পারছিলাম না। বার বার আব্বার কথা মনে হচ্ছিলো। আব্বার সেই ব্রীজটা বুঝি ভেংগে গেছে। আমার ২২২/সি, খিলগাঁও ঠিকানার প্রযত্নে যার নাম লিখতাম সেই আনোয়ারুল ইসলাম আজ থেকে মরহুম হয়ে গেছেন।
একজন দেশমাতৃকার অসীম সাহসী সন্তান। বীর মুক্তিযোদ্ধা। সততা আর ন্যায়ের পরীক্ষায় বার বার উত্তীর্ণ আদর্শিক মানুষ।
চরম কষ্টে থেকেও যিনি নীতির সাথে আপোষ করেন নি। জীবনে কোনও দিন অন্যায় লাভের আশা করেন নি।
সেই নীতিবান মানুষটিকে আল্লাহ তুমি পরপারে সুখী করে দাও।
উনার সন্তানদেরকে শোক সইবার ক্ষমতা দাও।
আল্লাহ তুমি মহান।
তুমি দয়াবান।।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল