ব্লু হোয়েলে অাতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই- এফ এইচ ফারহান – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ব্লু হোয়েলে অাতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই- এফ এইচ ফারহান

প্রকাশিত: ৪:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৭

ব্লু হোয়েলে অাতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই- এফ এইচ ফারহান
তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় প্রতিদিনই অামাদেরকে নিত্যনতুন অনেক বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। বিশেষত, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অামাদের পদচারণা একরকম নেশার মতোই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, প্রায় প্রত্যেকের হাতেই বিভিন্ন মানের অাধুনিক স্মার্টফোনস, ট্যাবলেটস, আইপ্যাডস, কম্পিউটারস বা ল্যাপটপস ইত্যাদি ডিভাইসগুলো দেখা যায়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ভালো দিক রয়েছে, তবে খারাপ দিকের পরিমাণও কম নয়। বৈশ্বিক অগ্রগতিতে তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি যতটা ভূমিকা রাখছে, অবনতিতেও ঠিক ততোতাই কার্যকর।
তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থারই একটি ফসল হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন গেমস, যেগুলোর প্রতি অামাদের তরুণ এবং শিশুরাই সবচেয়ে বেশী অাসক্ত হয়। অামাদের অতিরিক্ত সচেতন অভিবাবকরা শিশুদের স্বাধীনতা দেয়ার নামে যেভাবে অল্প বয়সী শিশুদের হাতে অাধুনিক স্মার্টফোনস, ট্যাবস,ভিডিও গেমস সরঞ্জাম সহ অন্যান্য উন্নত এবং ব্যয়বহুল জিনিসগুলো তুলে দিচ্ছেন- সেগুলো কি তাদের জন্য সুফল বয়ে অানবে, নাকি সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে?
বর্তমান বিশ্বের একটি অালোচিত বিষয় হচ্ছে স্যোশাল মিডিয়াভিত্তিক একটি ডিপওয়ে গেম ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’। বিষয়টি অামাদের ক্ষেত্রে অনেকটা তত্ত্বনির্ভর হলেও সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। যদিও এই বিষয়টি সম্পর্কে অামার জ্ঞান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, তবুও অল্প কিছু লিখছি। বিভিন্ন রকম উন্নত সফটওয়্যার ও মেকানিজমের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সঙ্গে শিশু-কিশোরদের জীবনযাপনের বৈশিষ্ট্যগত মিল থাকায় তারা ইন্টারনেট এবং অনলাইনভিত্তিক গেমসের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। ফলে অনলাইনের মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণের ফলেই আজকের এই ব্লু হোয়েল গেম একটি সুইসাইডাল গেমরূপে তরুণসমাজের সামনে একটি হুমকি বলা যায়। সম্ভবত, রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানে পারদর্শী এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এই গেমটি উদ্ভাবন ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন সোর্স থেকে যতটুকু জানলাম ব্লু হোয়েল গেমটি মূলত একটি অাত্মনির্যাতনমূলক গেম ( প্রকৃতভাবে একে গেম কিংবা অ্যাপও বলা যায় না) , যার কোনো পজিটিভ দিক নেই। গোপন গ্রুপের মধ্যে অপারেটকৃত এই গেমটির ক্ষেত্রে ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপের মতো জনপ্রিয় স্যোশাল প্লাটফর্মকে কাজে লাগায় এডমিনরা। রাশিয়ায় ব্লু হোয়েল গেমের কিউরেটর সন্দেহে গ্রেপ্তারকৃত ফিলিপ স্বীকার করে যে, এই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে তারা সমাজ সংস্কারকের কাজ করছে। ব্লু হোয়েলের নির্মাতা একটি অান্তর্জাতিক অপরাধ করে অালোচনায় অাসতে চেয়েছেন অথবা ওনার অন্য কোনো উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। ব্লু হোয়েল গেমটি একদিকে যেমন একটি ক্রাইমকে সকলের সামনে উন্মোচন করেছে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য অনেকগুলো সতর্কবার্তাও নিয়ে এসেছে। পজিটিভলি ভিত্তিহীন এই ডিপওয়ে গেমটির শিকার মূলত সেসব তরুণরাই হয়, যারা মানসিকভাবে অবসাদে ভোগে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ধর্মীয় মূল্যবোধহীনতা এবং অভিবাবকদের অসতর্কতার বিষয়টিকে। মানসিকভাবে দূর্বল এই তরুণদেরকে চিহ্নিত করে তাদের ব্রেনওয়াশ করে তাদেরকে অাত্মঘাতী বানানো এবং তার সহায়তায় জঙ্গিবাদকে জাগ্রত করাও কঠিন কিছু নয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র শিশু-কিশোরদের প্রাণহানির ব্যাপারে নয়, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায়ও বিষয়টি নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সব ধরণের অাত্মঘাতী হামলা বা ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সাইকোলজিক্যাল ব্রেইন ওয়াশ বা প্রেশারের বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাবতে হবে। কৌতূহলবশত যদি অামাদের তরুণরা অাত্মঘাতী হয়ে ওঠতে পারে তাহলে অামাদের চিন্তা করা উচিত যে, অামাদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক সচেতনতার কতটুকু ঘাটতি রয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম মাত্র কয়েকদিন অাগে ইন্টারনেটভিত্তিক ডেথ গেম ব্লু হোয়েলের শিকার হয়ে ঢাকায় ১৩ বছর বয়সী হলিক্রসের এক শিক্ষার্থী অাত্মহত্যা করেছে। বাস্তব অর্থে, জেনেশুনে ব্লু হোয়েলের শিকার তারাই হয় যারা নিজেদের জীবনের মূল্য বুঝে না। অর্থাৎ, স্বেচ্ছায় জীবনদানকারী এবং এক অর্থে মানসিকভাবে বিকৃতও বলা যায়। ইনস্টল করে নেশায় পরিণত হওয়ার পর জোরপূর্বক মানসিক চাপ দেয়া হয়, সেজন্য হয়তো মানসিকভাবে দূর্বল এবং অসচেতন তরুণরাই মৃত্যুপথ বেছে নেয়। সবমিলিয়ে ব্লু হোয়েলের সাথে সম্পৃক্ত সকলকেই অামি মানসিকভাবে বিপন্ন হিসেবে অাখ্যায়িত করতে চাই। ঘাতক এই ডিপওয়ে গেমের কারণে রাশিয়া, অামেরিকা সহ বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতে একটি আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সাম্প্রতিক সময়ে এমনও তো হতে পারে যে, ব্লু হোয়েলের নাটক সাজিয়ে ইতিমধ্যে দুই একটি হত্যাও ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের অাত্মহত্যার ক্ষেত্রে সবমিলিয়ে ব্লু হোয়েল সেখানেই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, যেখানে পারিবারিক অসচেতনতা কাজ করবে। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে সেটি অভিবাবকদের বুঝতে হবে। জ্ঞানকে শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক কিংবা অাধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ধর্মীয় মূল্যবোধ, জীবন সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান, সঠিক সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারেও ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
ব্লু হোয়েলের ব্যাপারে অাতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রথমত, আপনাকেই সচেতন হতে হবে। কেন আপনি সুস্থ হয়েও অন্ধের ন্যায় অন্যের ভুল নির্দেশনায় কাজ করবেন? ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা অাপনার নিজের মধ্যেই জন্ম দিতে হবে। অনলাইনে যে কাজটিই করেন না কেন অতি সাবধানতার সহিত ভেবেচিন্তে করবেন। অপরিচিত কোনো লিংকে প্রবেশ করার প্রয়োজন কি? ব্লু হোয়েল সহ অন্যান্য সম্ভাব্য ক্ষতিকর বিষয়গুলোর ব্যাপারে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মোবাইল অথবা কম্পিউটারে অধিক সময়ে একাকী বসে থাকতে দেখলে সে কী করছে, তার খোঁজ-খবর নেয়া উচিত। সন্তানকে কখনোই একাকিত্ব অনুভব করতে দেয়া যাবে না। অাপনিই হবেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। শুধুমাত্র অনলাইন গেমস নয়, সন্তানের শারীরিক বিষয়, মানসিক চাহিদা, ইন্টারনেটের সকল প্রকার অবৈধ বিষয়ের ব্যাপারে অাপনাকে সন্তানের সাথে খোলামেলা অালাপ করতে হবে। সকল প্রকার কম্পিউটার এবং মোবাইল গেমসের ( যেখানে শিশুর শারীরিক অথবা মানসিক অথবা উভয় দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) খারাপ দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। শাসনের পাশাপাশি সন্তানের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে সিগারেট খেতে অথবা কোনো মেয়ে/ছেলের সাথে প্রেম করতে চাইলেও প্রথমে অাপনার সাথে বিষয়গুলো শেয়ার করে। অার সবচেয়ে বড় বিষয়,সন্তানদের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মানসিকতা সৃষ্টি করা। যাতে তারা আত্মহত্যা করা বা নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করা অনেক বড় পাপ- এটা বুঝতে পারে। ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের হাতে বিশেষ প্রয়োজনে ইন্টারনেট কানেশবিহীন মোবাইল দিলে ভালো হয়। বিশেষ কোনো প্রয়োজন না থাকলে মোবাইলই দেয়ার প্রয়োজন নেই। সন্তান অথবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কিনা- সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা উচিত। কেউ যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় তাহলে তাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট করতে হবে। কৌতূহলি মন নিয়েও যাতে কেউ এই টাইপের নিষিদ্ধ অনলাইন একটিভিটিসের সাথে সম্পৃক্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অাপনার বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর ক্ষেত্রে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার ব্যবহার করতে এবং নিয়মিত চেক করতে পারেন।কেননা কৌতূহল থেকেই নেশার সৃষ্টি হয়। আর নেশাই হয়তো ডেকে আনতে পারে অকাল মৃত্যু। অাপনি সতর্ক থাকলে অনেক খারাপ জিনিসের হাত থেকেই নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। অাপনি সুযোগ না দিলে একটা খারাপ জিনিস জোর করে অাপনার ঘরে বাসা তৈরি করবে না। ভীত হতে বলছি না, সতর্ক থাকুন। শুধুমাত্র অভিবাবকদের সচেতনতাই ব্লু হোয়েল জাতীয় সমস্যা থেকে অামাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে ৯০% কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতে সম্ভবত এরই মধ্যে যেসব সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ব্লু হোয়েল ‘র লিংক আছে, তা মুছে দেওয়া হয়েছে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের অবশ্যই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, ইন্টারনেটের গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই সরকারের পজিটিভ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। শুধু এই ব্লু হোয়েলের ক্ষেত্রেই নয়, বরং শিশু-কিশোরদের জন্য শারীরিক অথবা মানসিক দিক দিয়ে ক্ষতিকর সকল অ্যাপস, গেমস এবং সাইট নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও চিন্তা ভাবনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
-মো. ফয়েজুল হাসান ফারহান
লেখক ও সংগঠক