ভাষা আন্দোলন ও বদরুদ্দিন উমরের মিথ্যাচার – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

ভাষা আন্দোলন ও বদরুদ্দিন উমরের মিথ্যাচার

প্রকাশিত: ৯:৫০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১

ভাষা আন্দোলন ও বদরুদ্দিন উমরের মিথ্যাচার

সুজাত মনসুর

কয়েকদিন আগে একটা লেখায় যে ক’জন লেখকের লেখা পড়ি না বলে উল্লেখ করেছিলাম তাদের মধ্যে বদরুদ্দিন উমর অন্যতম। তিনি একজন তথাকথিত মার্কসবাদী প্রাবন্ধিক হিসেবেই পরিচিত। তবে আমিসহ অনেকের নিকটই তিনি বঙ্গবন্ধু বিরোধী একজন লেখক হিসেবেও চিহ্নিত । তার বেশিরভাগ লেখায়ই কোন কারণ ছাড়াই বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গ শুধু টেনেই নিয়ে আসেন না, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি বিদ্ধেষ ফুটিয়ে তুলেন। অনেক সময় তথ্য বিভ্রান্তি ঘটানোসহ মিথ্যাচার করতেও দ্বিধা করেন না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি এই যে বিদ্ধেষ তার কারণ হল পারিবারিক জিঘাংসা। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী যারা পড়েছেন তাদের নিশ্চয় মনে থাকার কথা, বঙ্গবন্ধু তাঁর কলকাতা জীবনের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, বদরুদ্দিন উমরের বাবা আবুল হাশিম সাহেবের নিকট তাঁরা রাজনীতির তত্বগত শিক্ষা নিতেন। সে হিসেবে বলা যেতে পারে আবুল হাশিম হলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষককে ছাড়িয়ে ছাত্র যখন একটা দেশের জাতির পিতা হয়ে যান, তখন স্বাভাবিকভাবেই বদরুদ্দিন উমরদের তা বদহজম হয়। আর সেই বদহজম থেকেই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি মিঃ উমরদের যত জিঘাংসা।

অতি সম্প্রতি আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিষয়ক বদরুদ্দিন উমরের একটা লেখা আমার হাতে এসেছে। লেখাটির শিরোনাম
“ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতকরণ ও তার নায়কেরা”। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২১শে ফেব্রæয়ারি কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়। সেই লেখাটিই পুনঃমদ্রন করেছে প্রবাসবার্তা২৪ নামক একটা অনলাইন পোর্টাল, ২২শে ফেব্রæয়ারি, ২০২১। লেখাটিতে মিঃ উমর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে নির্জলা মিথ্যাচারের মাধ্যমে বাংলা ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ভ‚মিকাকে একেবারে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ঢাকার বার লাইব্রেরীতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠনের জন্য ৩১শে জানুয়ারী ১৯৫২ তারিখে যে সভা হয় তাতে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী সভাপতিত্ব করা ছাড়া আর ভ‚মিকা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি মাওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে থাকতেন, ঢাকায় নয়। তিনি একুশে ফ্রেব্রæয়ারি কিংবা এর আগে আর কোন মিটিং-এ উপস্থিত না থাকলেও তাঁর দল আওয়ামী মুসলিম লীগের গুরুত্বপুর্ণ ভ‚মিকা ছিল। এমনকি ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রæয়ারি রাতে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র সভার সভাপতি আবুল হাশিমও কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। বদরুদ্দিন উমর সেই সভার সুবাদেই তার বাবার ভ‚মিকাকে অবিস্মরণীয় হিসেবে চিহ্নিত করতে চান এবং আর বঙ্গবন্ধুর ভ‚মিকাকে বেমালুম চেপে যেতে চান। কিন্তু তিনি একথা বলেন না যে, তার বাবার সভাপতিত্বে ২০শে ফেব্রæয়ারি যে সভা হয়েছিল তাতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল পরদিন অথাৎ ২১শে ফেব্রæয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার। সেদিন যদি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হত তাহলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখা হত আপোষকামিতার ইতিহাস বলে। আর সেই আপোষকামীদের নেতৃত্বে ছিলেন বদরুদ্দিন উমরের বাবা আবুল হাশিম। ভাষা আন্দোলনে তার বাবা ও অন্যান্যদের আপসকামি মনোভাব জনিত অপকর্মকে আড়াল করার জন্য বদরুদ্দিন উমর ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কোন ভ‚মিকা ছিল না বলে মিথ্যাচার করে। মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অথচ ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত এমন কোন দলিল দস্তাবেজ নেই, যেখানে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নীতি-নির্ধারনী ও নেতৃস্থানীয় ভ‚মিকার উল্লেখ নেই। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ধর্মঘট পালন করতে গিয়ে যে ক’জন গ্রেফতার হন, তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্যতম। ১১ই মার্চের ধর্মঘটকে সফল করার জন্য ২রা মার্চ কমরুদ্দিন আহমেদ-এর সভাপতিত্বে ফজলুল হক হলে এক সভায় গণ আজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস-এর সমন্বয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সেই সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহম্মদ তোয়াহা, আবুল কাশেম, রনেশ দাশগুপ্ত ও অজিত গুহ প্রমুখ। ১১ মার্চ পিকেটিং করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু সহ যারা গ্রেফতার হযেছিলেন তারা ১৫ই মার্চ কারাগার থেকে মুক্তিপান এবং পরদিন ১৬ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রাম পরিষদের সভায়ও সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিব। সেই সভার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণী তাজউদ্দিন আহমেদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন। ডায়েরীতে বর্ণিত ঘটনাবালীর ভুল ব্যাখ্যা করে বদরুদ্দিন উমর তার বই ‘পুর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু নাকি জোরপুর্বক সেই সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন। তাজউদ্দিন আহমেদ-এর মত একজন ব্যক্তির ডায়েরির অপব্যাখ্যা যে করতে পারে তাকে আর যাই হোক একজন সৎ ও নীতিবান লেখক হিসেবে মেনে নিতে পারি না।

বদরুদ্দিন উমর তার বইয়ে আরো লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ সকালে সেক্রেটারিয়েট গেটে পিকেটিং করে যাঁরা পুলিশ কর্তৃত বন্দী হয়ে জেলে প্রেরিত হয়েছিলেন , তাদের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন অন্যতম।’ তিনি এটাও লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম ১৫ই মার্চে যে চুক্তিপত্র প্রণয়ন করেন তা অনুমোদনের জন্য জেল-এ নিয়ে যেতে হয় এবং অন্যান্যদের মধ্যে শেখ মুজিবের অনুমোদন বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়।”

১৯শে মার্চ, ৪৮ জিন্নাহ ঢাকায় আসেন এবং প্রথমে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বললেন, “উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।” এই ঘোষনার সাথে সাথেই মাঠের এক কোন থেকে কয়েকজন ছাত্র চিৎকার করে নানা বলে প্রতিবাদ করেন। যাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুল মতিন অন্যতম। রেসকোর্সে প্রতিবাদের মুখোমুখি হয়েও জিন্নাহ কার্জন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পুনরায় জিন্নাহ ঘোষনা করেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” একইভাবে ছাত্রদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ হয়। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দিন উমর তার বই ‘পুর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’র ১১০-১১১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “—এবার শুধু মুজিব নয় এবং আব্দুল মতিনও নয়, হলের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত শুধু গর গর গর ধ্বনিতে জিন্নাহ সাহেবের কন্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এসেছিল।”

ছাত্রদের প্রতিবাদের স্বরূপ দেখে জিন্নাহ কিছুৃটা ভড়কে যান। বুদ্ধিমান জিন্নাহ জীবিত থাকাকালীন আর রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তেমন উচ্চবাচ্চ্য করেননি। জিন্নাহর পর লিয়াকত আলী। লিয়াকত আলী আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হয়েই ঘোষণা করেন, “একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” দিন্িটি ছিল ২৬শে জানুয়ারি ১৯৫২ সাল। আবারও প্রতিবাদ প্রতিরোধের প্রস্তুতি। বঙ্গবন্ধু জেলে বন্দী ও চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। একদিন সন্ধ্যায় দেখা করতে এলেন অলি আহাদ ও মুহম্মদ তোয়াহা। উদ্দেশ্য নাজিম উদ্দিনের ঘোষনার প্রেক্ষিতে করণীয় নির্ধারণ। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন,
“আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেক ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারন জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদের খরব দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল।——-সেখানেই ঠিক হল ২১শে ফেব্রæয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গান করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে।”-(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৭)। উল্লেখ্য, ছাত্রলীগ নেতা কাজী গোলাম মাহবুবকেই কনভেনর করা হয়েছিল।

সেই সভায় বঙ্গবন্ধু তাঁদের উদ্দেশ্যে একথাও বলেছিলেন যে, “খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারন আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এস।” তিনি তাদেরকে এও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ১৬ই ফেব্রæয়ারি থেকে অনশন শুরু করবেন মহিউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে।

শুধু বঙ্গবন্ধুর নিজের কথাই নয়, ভাষা আন্দোলনের সময় যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের প্রায় সবার লেখায় ও কথায় ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা এবং নেতৃত্ব দানের বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে কেবল জানেনা আমাদের একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির বদরুদ্দিন উমর। তিনি নিজেই তো তার বইতে ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের সাথে বঙ্গবন্ধুর সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন। আবার তিনিই অস্বীকার করছেন। শুধু করছেনই না তিনি বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করেছেন। যেভাবে তাজউদ্দিন আহমেদ-এর ডায়েরির একটা পাতার ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। বঙ্গবন্ধু কোথাও উল্লেখ করেননি, হাসপাতালের পায়খানার জানালা দিয়ে চিরকুট ছুড়ে ছুড়ে আন্দোলন সংগঠিত করেছেন। বদরুদ্দিন উমর একথা বলতেও চেয়েছেন, তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের নাকি তেমন কোন সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল না। নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টিই নাকি মূলতঃ আন্দোলনকে সফল করেছে। মস্তিস্কে বিকৃতি না ঘটলে এরকম ডাহা মিথ্যাচার করা সম্ভব নয়। বদরুদ্দিন উমরা আসলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জিঘাংসা থেকেই আবোল তাবোল বকে থাকেন। তাদের মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। (আগামী সপ্তাহে শেষ পর্ব)