মাটির দেয়ালে তার দিয়ে আটকানো জাতির পিতার সেই ছবিখানা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মাটির দেয়ালে তার দিয়ে আটকানো জাতির পিতার সেই ছবিখানা

প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৭, ২০২০

মাটির দেয়ালে তার দিয়ে আটকানো জাতির পিতার সেই ছবিখানা

 

জন্মের পর বাবাকে হারিয়েছি। বড় হয়েছি ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা জাতির পিতার একখানা স্থিরচিত্র দেখে। ছোটবেলায় যখন স্কুলে যেতাম, রাস্তাঘাটে অনেক মুরব্বীদের সাথে দেখা হতো। ওনারা বাবার নাম জিজ্ঞেস করতেন। পরিচয় জেনে বলতেন, আচ্ছা তুমি চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে! তোমার বাবা অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে অকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

আমি ওনাদের চোখ-মুখে অদৃশ্য এক মায়া অনুভব করতাম। বাড়িতে এসে মাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, তোমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক ছিলেন। তিনিই সর্বকনিষ্ঠ নেতা ছিলেন যিনি স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে নিজের রাজনৈতিক প্রতিভা ও দৃঢ়তার জোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সানিধ্য ও দোয়া পেয়েছিলেন।

ঘরের দেয়ালে তার দিয়ে আটকানো ছবিখানার রহস্য ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করি।

 

সময় চলতে থাকে। আমিও একসময় স্কুল-কলেজের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমাই। আয়ত্বে নিয়ে আসি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা সহ বেশকিছু ইতিহাস ও বিশ্লেষণধর্মী বই। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি, এমন সময়ে হঠাৎ একদিন চোখে পড়ে একটি দৈনিক পত্রিকার ভিডিও কনফারেন্সে ৭০’র প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগের লড়াকু সৈনিক ও গণপরিষদ সদস্য এডভোকেট লুৎফুর রহমান, ২০১২ সালে বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা জেবুন্নেসা হক, সিলেট আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন মুখপাত্র দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেবের পুত্র ও হবিগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ মিলাদ ভাই সহ বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ আমার মরহুম পিতাকে স্বরণ করছেন। ১৯৭০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি ট্রেনযোগে বঙ্গবন্ধু সিলেট আসলে ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে আমার বাবা শেখ তজমুল আলী বঙ্গবন্ধুর পাশে দাড়িয়ে তাকে মানপত্র পাঠ করে শুনান। সেসময় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বাবার হাত উপরে তুলে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই মুহূর্তক্ষণকে স্মরণ করে তারা বাবার রাজনৈতিক জীবনের বেশকিছু ইতিবাচক বিষয়ে আলোকপাত করেন। তারপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাবাকে নিয়ে লেখালেখি হয়। সেগুলো দেখে আমারও বাবার সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়ে যায়। হাতে পাই বাবার নিজ হাতে লিখা ডায়েরী, পুরাতন কাগজপত্র, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লিখা চিঠিপত্র, আশি দশকের বেশ কয়েকটি ছবি সহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রাদি। সাক্ষাৎ করি সিলেট বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে ছিটিয়ে থাকা পুরাতন সব মানুষদের সাথে, যারা জীবনের পুরোটাই মানুষের তরে ব্যয় করেছেন এবং নিঃস্বার্থভাবে এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বেরিয়ে আসে নতুন সব তথ্য উপাত্ত। বুঝার চেষ্টা করি বাবার মৃত্যুর ২১ বৎসর পরও ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ছবিটির রহস্য।

স্কুল জীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা শেখ তজমুল আলী (আমার বাবা) ছাত্রলীগ থেকে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করে নেতৃত্বদানকারী সর্বকনিষ্ঠদের একজন। মুক্তিযুদ্ধে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের হয়ে অগ্রসারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর সাথে ঘনিষ্ঠতা থাকায় মুক্তযুদ্ধকালীন সময়ে বহুবার আমাদের মাটির ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং অতঃপর সেই ১৫ই আগষ্ট। ভয়াল কালরাত্রি। সামরিক সরকারের সকল ভয়-ভীতির উর্ধ্বে গিয়ে থানা আওয়ামী লীগের প্রথম প্রতিবাদ সভা আহবান করেন আমার বাবা। ডা. মিনহাজ উদ্দিন, এড. অমলেন্দু, আব্দুর রশিদ ফিজিক্যাল স্যার, নাসির উদ্দিন রতন, শামসুদ্দিন কুমি সহ অনেকেই ১৪৪’র শান্ত আইন ভেঙে মৃত্যুমুখে ডাক বাংলোয় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে মোস্তাক সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

জনসম্মুখে মিলাদ মাহফিল পড়ান তিনি৷ অংশ নেন সকল বীর যোদ্ধারা।

তবুও কেন জানিনা শূন্যতার পরিসমাপ্তি ঘটেনি।

এখনও দেয়ালে ঝুলে থাকা সেই স্থিরচিত্রটির দিকে তাকিয়ে আছি। সেই বীরত্বপূর্ণ ক্ষণকে স্মরণে রেখে স্বাধীন বাংলায় রচিত প্রথম ষড়যন্ত্রে বলিদানকারী জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল শহীদ এবং স্বাধীনতার পক্ষে জীবন উৎসর্গকারী প্রত্যেক নেতাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে অনুভব করি।

জানি না কোনোদিন ছবিখানার মমার্থ বুঝতে পারবো কিনা।

 

 

লেখক : শেখ এফ এইচ ফারহান, কলামিস্ট।