মাননীয় আদালত! আমাকে ক্ষমা করবেন।—-বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মাননীয় আদালত! আমাকে ক্ষমা করবেন।—-বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশিত: ৩:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০১৬

মাননীয় আদালত! আমাকে ক্ষমা করবেন।—-বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক

razzak-pic১৫ অক্টোবর ২০১৬, শনিবার: আমাকে ক্ষমা করবেন। সম্প্রতিকালে কলেজ ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভয়ানক লহুমশংস ঘটনা। আমার ভিতরের আরেটি মানুষের রক্ত ক্ষুন্ন হচ্ছে। এটা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ কার অক্ষর মধ্যে পড়ে না। যেহেতু আমরা স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র কাদে নিয়ে ছিলাম, যেহেতু আমরা বন্দুক চালিয়েছি, শুধু মাত্র একটি মানচিত্রের জন্য, যে হাতে ছোয়েছি আমরা মায়ের মুখ, প্রেয়সীর বুকতিলক, যে হাতে ছোয়েছি আমরা সাম্যমন্ত্রের দিক্ষিত সাথীর হাত, সেই হাতে এখন চাপাতি, সেই হাতে বন্দুক, সেই হাতে গুম-খুন বেড়েই চলেছে। সে সব ঘটনা পুর জাতিকে ভীতি হেলে পড়েছে। খাদিজার ঘটনা এটা নতুন নয়। বর্তমানে দেশের সরকারের উপর, আরেকটি সরকার আছে কি না আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়। অনেক রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী প্রতিনিয়ত গুম নামের কারাগারে বন্দি হচ্ছেন। কে কোথায় আছেন ? দেশের জনগণ এমন কি সরকার জানেন না। আমরা সরকারের কাছে গুম হয়ে যাওয়া ব্যাক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবী করে, সমাজের প্রত্যোকটি স্থরের মানুষ। কিন্তু আমরা কি কখন সরকারের কাছে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খোজে দেওয়া দাবী করেছি ? গুমের সংখ্যা আমার হাতে নেই। তবে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানী থেকে ডা. রিয়াদ নামে জনৈক ব্যাক্তি গুম হয়েছেন, হাজার মানুষের সামনে থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কে নিয়ে গেল? জবাব দিহিতা নেই।
রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনকারীদের উপর সরাসরি গুলি, পায়ে গুড়ালিতে বন্দুক ধরে গুলি করা, গ্রামের মহিলাদের ধান ক্ষেতের ভিতর থেকে ধরে নিয়ে পুলিশের অমানবিক অত্যাচার, মন্ত্রীদের অশ্লীল বক্তব্য, কর্মীদের সন্ত্রাসী হওয়ার ইঙ্গিত। এমন কি একজন মন্ত্রীতার নিজে লাল পাঞ্জাবী দেখিয়ে কর্মীদের বলে ছিলেন তোমরা বিরোধী দলকে ধাওয়া কর। কিন্ত মন্ত্রী সে দিন ধাওয়া কি ভাবে করতে হবে তার কোন ধরন তিনি বলে দেন নি। ঠিক সেই পরের হরতালের দিনে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের সামনে বিশ্ব জিতের ঘটনা পুরো জাতির বিবেককে নাড়া দিয়ে ছিল। চারদিক ঘিরে ঘাতকরা দলবেঁধে চাপাতি দিয়ে কোপাতে কোপাতে বিশ্ব জিতের রক্তাক্ত দেহ মাটিতে দোলে পড়ে। রাজপথে পড়ে থাকল সেই রক্তাক্ত কৃষ্ণ চুড়ার মত তুকাতুকা লাল রক্ত পড়ে তাকল রাজপথে।
সেই ঘটনার সময় মাত্র ১০০ গজ দূরে দাড়িয়ে হা করে তাকিয়ে ছিল এই দেশের শান্তি শৃঙ্খলা বাহিনী, আইন ও সার্বভৌমত্ত রক্ষারকারী পুলিশ বাহিনী। কেউ এগিয়ে আসেনি, একটু চেষ্টা করলে সেদিন বিশ্ব জিৎ বেঁেচ যেত। আমি পুলিশ কে দূষারূপ করব কেন। পুলিশ যে হুকুমের গোলাম। মন্ত্রী মশাইর হুকুম তামিল না করলে চাকরী চলে যাবে তার। কিন্তু তারপরও চাকরীর উপরে সামান্য মানুষ্যত্য বোধ কাজ করলে বিশ্ব জিৎ সে দিন বেঁেচ যেত। এগিয়ে এসে ছিল একজন লোক যে লোক সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অবহেলিত ব্যাক্তি একজন রিকসা চালক। সকল লোভ লালসার বাহিরে থেকে নিজের জীবন বাজি রেখে কোর্ট স্বাক্ষী দিয়েছিল। আমরা কি সেই রিকসা চালকের মত হতে পারিনা ?
গত ৩ অক্টোবর খাদিজার ঘটনার সময় যারা পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও ধারণ করলেন তাদের কে আমি কি বলব ? সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছি তাদেরকে বলার। তাদের আশে পাশে মাটিতে পড়ে তাকা ইট-পাথর নিয়ে যদি এগিয়ে যেতেন তাহলে খাদিজা হয়তো কিছু টা হলেও রক্ষা পেত। আমি সেই বীর পুরুষদের কি বলে ধন্যবাদ দেব নাকি তাদের কে ট্রান্স জেন্ডার বলব। আরও কিছু নিশংস ঘটনা ঘটেছে যার কোন তদন্ত আজো হয়নি। তনু ও এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যায় পুলিশের খাতায় হত্যাকারী নাম উঠে আসছে। কি রহস্যজনক কারণে সেটা প্রকাশিত হচ্ছে না? তারা এদেশের নাগরিক নয়, তাদের কি কোন মৌলিক অধিকার নেই ? আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করছি মহিলাদের গর্ভে থাকা ৮ মাসের শিশুরা নিরাপদ নয়। নারাগঞ্জর তৌক্বী হত্যা কি হলো? আসল আসামী সরকারের অতি আপন জন। বিচার পাওয়াত দূরের কথা।
আমি সেই দিন খাদিজার বাড়িতে গিয়ে শান্তনা দেওয়ার মত কোন ভাষা আমার জানা ছিল না। শুধু দোয়া করেছি। খাদিজার ঘটনায় পরপর আমরা পুরো সিলেটবাসী এমন কি সারা বাংলাদেশের অনেক জায়গা মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন করেছি। আমরা কি কেউ দাবী করেছি খাদিজার ঘাতকের কি শাস্তি হওয়া দরকার ? আমরা কি শাস্তি চাই, আমরা কি ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই সেটা বলেছি। মানুষের মধ্যে গুলাবারুদের গন্দ, রক্তের হলি দেখার মমতারা আর নেই। বিবেক নেই মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বসবাস করছে। এমনকি পুলিশ ও নিরাপদ নয়। ভয় নেই ভীতি নেই, খুন-মারামারি করলেও ছাত্রলীগ কর্মীদের কিছুই হবে না। আওয়ামীলীগের কিছুই হয় না। এমন মন মানষিকতার কারণে সেই দিন জিন্দাবাজারে মটর সাইকেল পাকিং কে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী মামুন বক্সকে প্রাণ দিতে হলো।
প্রাণ গেল ছাত্রলীগের হাতে, কফিন কাদে ভয়ে নিল আওয়ামীলীগ। খাদিজাকে রক্তাক্ত করল ছাত্রলীগ প্রতিবাদ সভা করল আওয়ামীলীগ। হায়রে বাংলাদেশ, হায়রে সেলুকাস।
মাননীয় আদালত
খাদিজার মা-বাবা থেকে শুরু করে সারা দেশের মানুষ সাপ্তাহ ১০ দিন পর আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি জানি আপনি একজন সৎ এবং ন্যায় বিচারক। আমাদের আইন শৃঙ্খলার এই দূর্বল সৃষ্ট চাপিয়ে দেওয়া আইন এখন আমাদের দেশে বিদ্যমান। সেই প্রচলিত আইনের বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আপনার কাছে হয়তবা ৩০৭/৩২৬ এই দুটি ধারায় পুলিশ বিচারের জন্য আপনার কাছে পাঠিয়ে দেবে। আপনিও সে ধারার বাহিরে গিয়ে বিচাররের রায় প্রদান করার কোন সুযোগ নেই। হয়তবা ৭ বছর অথবা ১০ বছর সশ্রম অথবা অসশ্রম কারাদন্ড দিতে পারেন। দোষ আমাদেরই। আইন মানুষের জন্য, আইনের জন্য মানুষ নয়।
মাননীয় আদালত আপনাকে স্মরণ করিয়ে চিতে চাই একজন বিচারকের কলমের মধ্যে অনেক শক্তি। যেটা দৃষ্টান্তের রেখে গেছেন একজন বিচারক। দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলার নছিবা খাতুন উ” বিদ্যালয়ের পরপর ৩ জন শিক্ষার্থী ট্রাকের চাপায় মারা যান। তখন স্কুল পরিচালনা কমিটি ট্রাক সহ সকল ধরনের ভারী যান বাহন চলাচল বন্ধে ৬ ফুট একটি তুরণ নির্মান করতে চাইলে সরকার পক্ষ এবং বাস-ট্রাক মালিক সমিতি আন্দোলন করে পুরো সিলেট উত্তপ্ত করে দেয়। তৎকালিন জেলা জজ সাহেব উভয় পক্ষের চুড়্ন্তা শুনানী শেষে এই মর্মে রায় প্রদান করেন যে, ‘তুরণ নির্মাণ করার অনুমতি প্রদান করা হলো, শুধুমাত্র মানবিক কারণে’। সেই দিন সেই শুনানী শুনে সিলেটের সর্বস্থরের মানুষ অন্তরের অন্তরস্থল থেকে বিচারকের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
আজ থেকে ৫০ বছর পূর্বে গোলাপগঞ্জের একজন জজ সাহেব একটি খুনের মামলার রায় প্রদান করে। সাথে সাথে তিনি এই এজলাসে বসে চাকুরী থেকে ইস্তেফা প্রদান করেন। পরে তিনি অবসরে এসে একটি বই লিখে ছিলেন ‘আমার গত জীবন’। এই বইটিতে তিনি কি কারণে ইস্তেফা দিয়েছেন তা তুলে ধরেন। এই বই পড়ে অনেক মানুষ তাকে এক নজর দেখার জন্য তার বাড়িতে ভীড় করে ছিল। তাঁর বইয়ে তিনি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছিলেন আমি একজন নির্দোষ মানুষ কীভাবে ফাঁসির রায় দেব। কিন্তু সব স্বাক্ষ্য ও স্বাক্ষী তার বিরুদ্ধে থাকায় আমাকে যে তাকে ফাঁসির রায় দিতে হবে। আমি তাকে ফাঁসির রায় না দিয়ে খালাস করে দিয়েছি।
আপনার কাছে খাদিজার মামলার চার্জসীট চলে আসবে যে ভাবে ফুটবল খেলায় গোল পোষ্টে গোল দেওয়ার জন্য ইস্টাকার বলের অপেক্ষা করেন। বল পেলেই গোল। সেই ভাবে আপনার কাছে ৭/৯ বছরের সাজার রায় প্রদানের জন্য কাগজপত্র চলে আসবে। আপনিও রায় প্রদান করবেন প্রচলিত আইন অনুসারে।
মাননীয় আদালত সারা জাতি তাকিয়ে তাকবে আপনার দিকে। আপনার চাকুরী জীবনে হয়ত এটাই প্রথম এবং শেষ সুযোগ, পুরো জাতিকে এবং নারী সমাজকে এই ধরনের নৃশংস বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা করতে। মাননীয় আদালত আপনি যে ভাবে সৎ, আপরার ভিতরের মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে জাতিকে এই চাপাতির সংস্কৃতি হইতে মুক্তি দিতে পারেন।
আইনের ধারার উপরের ক্ষমতা আপনার কলমের মধ্যে আছে। জেলের ভিতরের আসামী সাজা না দিয়ে প্রকাশ্যে জনসম্মুুখে বিচারের ব্যবস্থা করার জন্য আপনার প্রতি বিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি। জনাব অপরাধীর শাস্তি জেলের চার দেওয়ালের ভিতর হয় জনসমুখে সাজা হয় না। তাই মানুষ ভয় পায় না।
মাননীয় আদালত এমন একটি রায় প্রদান করবেন জনসম্মুুখে। যে রায় শুনে এবং রায়ের কার্যকরিতা দেখে মানুষের দেহের লোম কেঁপে উঠে। শান্তি পাবে আমাদের মায়ের জাতি. বোনের জাতি, স্ত্রীর জাতি এবং মেয়ের জাতি। হবেনা আর চাপাতির ঝনঝনানী আওয়াজ। তা থেকে হয়তবা আপনার চাকুরী যেতে পারে। আইন ব্যবসা করে আপনি সারা জীবন চলতে পারবেন কিন্তু পুরো জাতি সারা জীবন আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। আমি এই দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আপনার নিকট যদি এই প্রার্থনা করতে পারি, আমারা মত কি সারা জাতি আপনার নিকট এই দাবী রাখে না? আসসালামু আলাইকুম।
কলাম লিখেছেন:
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক
০১৬৭০৫৯৯১৩৭