মানুষ শঙ্কিত – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মানুষ শঙ্কিত

প্রকাশিত: ৮:০৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০১৬

মানুষ শঙ্কিত

11787_f6গুপ্ত হত্যা ও টার্গেট কিলিং বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে মানুষের মধ্যে ভয় আর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। মানুষের এই ভয় দূর করতে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক ঠেলাঠেলি হলে অপরাধীরাই সুবিধা পাবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আগে যেখানে ব্লগার, মুক্তমনা, শিক্ষকদের টার্গেট করে হত্যা করা হতো, এখন দেখা যাচ্ছে, যে কাজ ও চিন্তা আমাদের সমাজে স্বীকৃত নয়, তেমন মতবাদ ও চিন্তার মানুষকে নিয়ে যারা কাজ করছেন তারাও নৃশংস হত্যার শিকার হচ্ছেন। এখন মনে হচ্ছে ‘টার্গেট কিলিং’ মারাত্মকভাবে বিস্তার লাভ করছে। যারা খুন করছে তারা পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েই করছে। খুনিরা এতটাই প্রশিক্ষিত যে, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করে তাদের লক্ষ্য পূরণ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বা পুলিশ যতই বলুক না কেন-এ বিষয়ে তারা জিরো টলারেন্স, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘটনার মূলে তারা কিছুই করতে পারছে না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন ব্যর্থ তেমনি রাজনৈতিক ধাক্কাধাক্কিতেও অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে। ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি। তাদের যে মন্তব্য ও শারীরিক ভাষা তাতে তারা কিন্তু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও আইএস বিষয়ে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বিষয়ে সরকারের একেকজন একেকভাবে কথা বলছেন। দেশে জঙ্গিবাদ নেই এটা এক ধরনের কথা, আর আইএস নেই এটাও আরেক কথা। দেশে জঙ্গি আছে, সরকারের মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কিন্তু তা অস্বীকার করেননি। তিনি তো বলেছেন, ৮ হাজার প্রশিক্ষিত জঙ্গি যারা নাকি আল কায়েদার প্রশিক্ষিত তারা দেশের ভেতরে ঢুকে তৎপর রয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে এই আট হাজার কোথা থেকে এলো? তারা এখন কোথায়?
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ মানবজমিনকে বলেন, একটি সংঘবদ্ধ জঙ্গি চক্র ধর্মের নামে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। তারা অরক্ষিত টার্গেট করছে, যে কারণে খুন করে খুব সহজেই পালিয়ে যাচ্ছে। আর এতে করে মানুষের মধ্যে শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে। খুনিরা খুব সঙ্গোপনে কাজ করছে বলে তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি ধারাবাহিক হত্যাগুলো এদেশের জঙ্গিদেরই কাজ। এক্ষেত্রে আইএস বা অন্য নাম ব্যবহার করলে সুবিধা লাভের সুযোগ থাকে। তাই বিভিন্নভাবে আইএস বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নাম প্রচার করা হচ্ছে। জঙ্গিদের আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে উল্লেখ করে তাদের আর্থিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করার বিষয়ে মত দেন তিনি। জঙ্গিবাদ ও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনীতিকরণের কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে আবদুর রশিদ বলেন, যেহেতু একটি অনিরাপদ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেহেতু এ থেকে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু এ বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দাতা সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কিছু নেই উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, যারা উদ্বেগ দেখাচ্ছেন, তারা উদ্বেগ প্রকাশ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জঙ্গিবাদের এই সমস্যা এখন শুধু বাংলাদেশের নয়। এখন যারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা কিন্তু নিজেদের দেশকেও নিরাপদ রাখতে পারছে না। তাই আমাদের দেশের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখালে আমার মনে হয় না তারা খুব একটা লাভবান হবেন। ধারাবাহিক এই হত্যাকাণ্ডের সংকট উত্তরণে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, যারা খুন করছে তারা মানুষ। এরা এদেশেই বাস করছে। খুনিদের চিহ্নিত করা কঠিন কিছু নয়। জঙ্গিদের কিলিং মিশনগুলোকে চিহ্নিত করা হবে। অনতিবিলম্বে এসব খুনিকে আইনের আওতায় আনা উচিত। এ জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি আছে- তা আমি বলবো না। তারা চেষ্টা করছে।