মুহিত স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘নতুন কী লিখছ এখন?’ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মুহিত স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘নতুন কী লিখছ এখন?’

প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ণ, মে ১, ২০২২

মুহিত স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘নতুন কী লিখছ এখন?’

মুহিত স্যারের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, ‘নতুন কী লিখছ এখন?’
সুমনকুমার দাশ

তখন তিনি মন্ত্রী বা সাংসদ ছিলেন না। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া দলের লোকজনও তখন খুব বেশি তাঁর কাছে ঘেঁষতেন না! ফলে তাঁর বাসায় ভিড়ভাট্টাও তুলনামূলকভাবে কম থাকত। সে সময় তিনি সিলেটে এলে প্রায়ই দল বেঁধে আমরা তাঁর বাসায় আড্ডা বসাতাম। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সিলেটের সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে একনাগাড়ে তিনি কথা বলতেন। কী প্রখর জ্ঞান আর স্মৃতিশক্তি তাঁর! তিনি বলতেন, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। যেদিন রাত বেশি হয়ে যেত, সেদিন তাঁর বাসাতেই খাওয়াদাওয়া হতো।

পরে ২০০৯ সালে যখন সাংসদ আর মন্ত্রী হন, তখন তিনি সিলেটে এলেই দলীয় লোকজন আর সাধারণ মানুষের ভিড় তাঁর বাসা ঘিরে বাড়তে থাকে। সিলেট নগরের ধোপাদিঘিরপার এলাকার হাফিজ কমপ্লেক্সের যে বৈঠকখানায় নিরিবিলি বসে শিল্প-সাহিত্যের আলাপ আমরা করতাম, সেখানে প্রাসঙ্গিক কারণেই শুরু হয় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা। আমাদের আড্ডায়ও যতি পড়ে। পরে কালেভদ্রে তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। একটু-আধটু কুশল আর হাসি বিনিময় হতো। দেখা হলেই বলতেন, ‘সুমন, নতুন কী লিখছ এখন?’

যাঁর কথা বলছিলাম, তিনি সদ্য প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত। সাবেক অর্থমন্ত্রী, ভাষাসংগ্রামী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী কিংবা লেখক—এমন নানা পরিচয় তাঁর। কিন্তু আমার কাছে তিনি কেবল মুহিত স্যার, আমাদের প্রিয় মুহিত স্যার। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শোনার পরপরই কিছুটা সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়ি। তাঁকে ঘিরে পুরোনো সব স্মৃতি ভিড় জমাতে শুরু করে। মনে পড়ে, কবি-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভেন্দু ইমাম আর সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মুক্তাদীর আহমদ মুক্তা আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এর পর থেকেই মুহিত স্যার আমাকে ভালোবাসতেন। নানা সময়ে তাঁর অপত্য স্নেহের প্রমাণ পেয়েছি। সব আজ স্মৃতি।

দুই.
প্রয়াত বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমকে তিনি বন্ধু ভাবতেন। তাঁর গানের প্রচণ্ড রকমের অনুরাগী ছিলেন। ২০০৬ সালে বাউল-তনয় শাহ নূরজালালের উদ্যোগে যখন আমরা প্রথমবারের মতো শাহ আবদুল করিম লোক–উৎসবের আয়োজন করি, তখন মুহিত স্যারকে সে উৎসবের উদ্বোধক হিসেবে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম মুক্তা ভাই আর আমি। তিনি সানন্দে রাজি হন। যথারীতি ওই বছরের ২ মার্চ তিনি মুক্তা ভাইসহ কয়েকজন সফরসঙ্গী নিয়ে উৎসবে গিয়েছিলেন। সে উৎসবের উদ্বোধন ও আলোচনা পর্বের সঞ্চালক হিসেবে মুক্তা ভাই আর আমি ছিলাম। শাহ আবদুল করিম এবং বাউল ও লোকায়ত দর্শন নিয়ে অসাধারণ এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। লোকায়ত বাংলা সম্পর্কে তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে সেদিন আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।

তখন সড়কপথে শাহ আবদুল করিমের বাড়ি যাওয়াটা এত সুখকর ছিল না। এখনকার মতো পাকা রাস্তাও ছিল না। সে সময় মাটির কাঁচা রাস্তা ছিল। কিছুটা গাড়িতে, কিছুটা হেঁটে আর কিছুটা গরুর গাড়িতে সেবার মুহিত স্যার উৎসবস্থলে পৌঁছেছিলেন। শাহ আবদুল করিমের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া উচিত, কেবল এই ইচ্ছা থেকেই মুহিত স্যার ছুটে গিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার সেই প্রত্যন্ত গ্রাম উজানধলে। সেখানে উৎসবে যোগদানের পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ শাহ আবদুল করিমের বাড়িতে সময় কাটান। তখন করিম জীবিত ছিলেন। করিমের উপস্থিতিতে তাঁর শিষ্যরা মুহিত স্যারকে করিম রচিত বেশ কিছু গানও গেয়ে শুনিয়েছিলেন।

এরপর ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’। এ বইয়ের প্রথম লেখাটিই ছিল মুহিত স্যারের। বইটা হাতে পেয়ে তিনি নিজে থেকেই একটা প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তাব দেন। আমার সতত শুভাকাঙ্ক্ষী শুভেন্দু ইমাম আর মুক্তাদীর আহমদকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনাও করেন। নিজে থেকেই দেশবরেণ্য লেখক ও শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানকে প্রধান অতিথি হিসেবে নিয়ে আসার জন্য যোগাযোগ করেন। সে অনুযায়ী আনিসুজ্জামান স্যারের উপস্থিতিতে ওই বছরের ৩০ এপ্রিল সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। সে অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য আরেক লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালও উপস্থিত ছিলেন। এটাই ছিল আমার বইয়ের প্রথম কোনো প্রকাশনা অনুষ্ঠান।

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শাহ আবদুল করিম মারা যান। এরপরই ‘শাহ আবদুল করিম স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশের উদ্যোগ নিই। বরাবরের মতো লেখা আনতে ছুটে যাই মুহিত স্যারের কাছে। তিনি তখন অর্থমন্ত্রী। প্রচণ্ড ব্যস্ত। ঈদে সিলেটে এসেছেন। ব্যস্ত সময়সূচির ফাঁকে ঈদের পরদিন সকালে সময় বের করে আমাকে বাসায় যেতে বলেন। যথারীতি তাঁর বাসায় যাই। এরপর বলেন, ‘সুমন, আমি বলে যাব। তুমি লিখতে থাকো।’ তিনি বলেন, আমি লিখি। এভাবে একটা বড় লেখা দাঁড়িয়ে যায়। লেখাটা পড়ে তিনি নিজের হাতে শিরোনাম লিখে দেন, ‘আবদুল করিমের সঙ্গে আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। পরে সে লেখা স্মারকগ্রন্থে প্রকাশিত হয়।

মুহিত স্যারকে নিয়ে স্মৃতির শেষ নেই। আরেকটি ঘটনার কথা বলে লেখা শেষ করি। সেটা ২০১১ সালের। আমার লেখা ‘বাংলা মায়ের ছেলে: শাহ আবদুল করিম জীবনী’ বইটি সেবার প্রকাশিত হয়। বইটি আমি মুহিত স্যারকে উৎসর্গ করেছিলাম। তিনি সিলেটে আসার খবর পেয়ে বইটি দিতে তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন কবি-গবেষক শুভেন্দু ইমাম। বইটি তাঁর হাতে তুলে দিতেই তিনি উৎসর্গপত্র দেখে শব্দ করে হেসে ওঠেন। বলেন, ‘তুমি তো বই উৎসর্গ করলে। আমি তোমাকে কী দিই?’ প্রশ্ন রেখে শয়নকক্ষে চলে গেলেন। ফিরে এলেন চমৎকার একটি ডায়েরি আর কলম নিয়ে। সে দুটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘নতুন বইয়ের খসড়া এটাতে লিখো। আমার পক্ষ থেকে তোমাকে উপহার।’ আমি সযত্নে মুহিত স্যারের সেই উপহার রেখে দিয়েছি। সে ডায়েরিতে নতুন বইয়ের খসড়া আর লেখা হয় না! হয়তো এত দিনে কলমের কালিও শুকিয়ে গেছে।

লেখক: প্রথম আলো,নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল