মেঘালয়ের আকাশে মেঘ দেখলেই কাঁদে ডাউকি পাড়ের মানুষ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মেঘালয়ের আকাশে মেঘ দেখলেই কাঁদে ডাউকি পাড়ের মানুষ

প্রকাশিত: ১০:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২০

মেঘালয়ের আকাশে মেঘ দেখলেই কাঁদে ডাউকি পাড়ের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা একটি নদীর নাম হচ্ছে ডাউকি। উৎপত্তি হওয়ার পর থেকে সীমান্ত জনপদ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী খননের অভাবে ভরাট হয়ে একদিকে যেমন নৌ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে তীর সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে নদীর দুই কূল ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট।

তিন দশকে এই ডাউকি নদীর তীরবর্তী এলাকার ছয় থেকে সাত গ্রামের অন্তত আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি ডাউকির গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। পাহাড়ি ঢলের কারণে ভাঙনের এ ধারা অব্যাহত আছে ৩০ ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। যে কারণে স্থানীয় এলাকার লোকজন বলে থাকেন মেঘালয়ের মেঘ ডাউকি পাড়ের কান্না। অর্থাৎ মেঘালয়ের আকাশে মেঘ দেখলেই পাহাড়ি ঢলে বসতবাড়ি ভাঙনের আতঙ্কে ডাউকি নদীর তীরবর্তী বসতিদের কান্না শুরু হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের ভয়াল বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গোয়াইনঘাটের তৎকালীন সংগ্রাম বিডিআর ক্যাম্পসহ বেশ কিছু এলাকা ভাঙনে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। একই সঙ্গে স্রোতের তোড়ে পলি আর বালু মাটি এসে পিয়াইনের উৎস মুখ থেকে পাদুয়া হয়ে ঢালারপাড় পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হয়ে যায়। ফলে পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এক সময়ের ছোট খাল রূপ নেয় বিশাল নদীতে। যা বর্তমানে ডাউকি (জাফলং) নদী নামে পরিচিত।

খাল থেকে নদীতে রূপ নেয়া ডাউকি নদী দিয়ে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে গত ৩২ বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে আড়াই শতাধিক বসতবাড়ি। ভাঙনের কবল থেকে বাদ যায়নি মসজিদ, কবরস্থান, শশ্মান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও জাফলং চা-বাগানের ভূমি।

স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা ও গোয়াইনঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার খায়রুল ইসলাম বলেন, ডাউকি নদীর উৎপত্তি হওয়ার পর থেকে যথাযথভাবে নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নেয়ায় এবং খনন না করার কারণে প্রতি বছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতবাড়ি।

১৯৮৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামের প্রায় ২৭টি, ছৈলাখেল অষ্টমখন্ড গ্রামের ১৯টি, আসামপাড়া গ্রামের ৩৩টি, নয়াগাঙের পাড় গ্রামের ৪৯টি, বাউরবাগ গ্রামের ১৩টি, বাউরবাগ হাওর গ্রামের ৪২টি ও বাউরবাগ হাওর নদীর পূর্ব পাড়ের প্রায় ৬৯টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

একই সঙ্গে বিলীন হয়েছে তিনটি মসজিদ, তিনটি গোরস্থান, একটি শশ্মান, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ রাস্তাঘাট ও শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি। বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করেও শেষরক্ষা হয়নি অনেকের। ফের ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন তারা। সবকিছু হারিয়ে অবশেষে আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছেন অন্য এলাকায়।

বর্তমানেও নদী তীরবর্তী ১৫-২০টি বসতবাড়ি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই নদী ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পেতে যত দ্রুত সম্ভব ডাউকি নদীর তীর সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান লেবু বলেন, পিয়াইন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ডাউকি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তার ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে প্রায় আড়াই শতাধিক বাড়িঘর, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং চা-বাগানের ভূমি ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে করে রাস্তাঘাটসহ গ্রামীণ অবকাঠামো ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ডাউকি ও পিয়াইন নদী খনন এবং ডাউকি নদীর তীর রক্ষণাবেক্ষণ করে স্বাভাবিক নিয়মে যাতে উজান থেকে নেমে আসা পানি পিয়াইন ও ডাউকি নদী দিয়ে সমানভাবে প্রবাহিত হয়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দাবি জানাই।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (শাখা কর্মকর্তা) মো. জহিরুল ইসলাম সরকার বলেন, গোয়াইনঘাটের ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, নালা ও খাল খননের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনায় আছে। যার মধ্যে পিয়াইন নদী খননের পাশাপাশি ডাউকি নদীর তীর সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্পটি খুব ব্যয়বহুল হওয়ায় খানিকটা সময় লাগছে অনুমোদনের।

প্রকল্পটি খুব দ্রুত অনুমোদন হবে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রকল্পটির অনুমোদন হলে ডাউকি নদীর তীর সংরক্ষণের পাশাপাশি পিয়াইন নদীর খনন কাজও শুরু হবে। পিয়াইন নদী খনন করলে ডাউকি নদী দিয়ে পানি প্রবাহ অনেকটা কমে আসবে। ডাউকি নদী দিয়ে পানি প্রবাহ কমে আসলে এবং তীর সংরক্ষণে বাঁধ নির্মাণ করলে নদী ভাঙন অনেকটাই হ্রাস পাবে।

ডাউকি নদীর পরিচিতি :

মেঘালয় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা ডাউকি নদীর অবস্থান হচ্ছে সীমান্ত জনপদ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়। যার উৎপত্তি হয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ওমগট নদী থেকে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তা পাহাড় হতে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পথেই ওমগট নদী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। যার একটি শাখা পিয়াইন নাম ধারণ করে সীমান্তঘেঁষে পাদুয়া হয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরবর্তীতে ছাতকে সুরমা নদীর জলধারার সঙ্গে মিশেছে। অন্য শাখাটি ডাউকি নাম ধারণ করে পর্যটন কেন্দ্র জাফলং ও বল্লাঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল