মোসাহেবদের দৌরাত্ম্যে ত্যাগীরা দিশেহারা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

মোসাহেবদের দৌরাত্ম্যে ত্যাগীরা দিশেহারা

প্রকাশিত: ৮:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১

মোসাহেবদের দৌরাত্ম্যে ত্যাগীরা দিশেহারা

রুহুল আলম চৌধুরী উজ্জ্বল ::
সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনি কি সামগ্রিক ক্ষেত্রেই মোসাহেব দের দৌরাত্ম্যে ত্যাগীরা আজ দিশেহারা।এই মোসাহেবদের নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা সরওয়ার আহমদের বিশ্লেষণ ধর্মী একটি লেখা পড়ে এবং পরবর্তীতে তার সাথে আলাপ করে এ বিষয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই কলম চালানোটা সমীচীন ভাবলাম। প্রথমেই আসুন এই মোসাহেব শব্দটা স্বম্পর্কে সম্যক ধারণা নেয়া যাক।

মোসাহেব শব্দের সমার্থক হলো তোষামুদে পার্শ্বচর, হীন পার্শ্বচর, চাটুকার, খোশামুদে, ইত্যাদি। তবে আভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণে একটি বহুল চর্চিত এবং অতি জনপ্রিয় শব্দ সামনে আসে, আর সেটি হলো “চামচা”। ধ্বনাত্মক এই শব্দটি মুলত ফারসি ‘চম্‌চহ্‌’ শব্দ থেকে আমদানিকৃত । যদিও প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যে মোসাহেবি বা চামচামি এখন শুন্যের কোটায়, তথাপি আমাদের দেশে সেই অশোক ও চন্দ্রগুপ্তের যুগ পার করে, সুলতানি, মোগল, পাল, ভুইয়া, নবাবী যুগ বেয়ে বর্তমানে এটি মহামারী অবস্থায় পৌছেছে। খেয়াল করলেই দেখবেন পাড়ার পাতিনেতা থেকে শুরু করে রথী মহারথীদের ডানে বামে ভাড় কিংবা এই চামচাদের চেলামি। নেতার বউয়ের জন্মদিন খোদ নেতার মনে না থাকলেও চেলারা ঠিকই কেক নিয়ে হাজির। জন্মদিন বাদ দিলাম কোনো জাতীয় দিবসে নেতার নিজের বক্তব্য দিতে হয়না। তার পক্ষে ব্যানার, পোষ্টারে চামচাই নিজের ছবি নেতার ছবির সাথে জুড়ে দিয়ে জানিয়ে দেন অমুক ভাইয়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন, এমনকি শোক প্রকাশও। চটকদার এইসব তেলবাজিতে নেতা বসেন খেই হারিয়ে। তার জন্য রোদ বৃষ্টি ঝড় ঝুঁকি নেয়া কর্মীর কথা যান বেমালুম ভুলে। আর এই সুযোগে মোসাহেবরা আরোহন করে কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতার মসনদে। উদাহরণ দেয়ার জন্য হিসেব কষতে হয়না। আমাদের জীবদ্দশায় শুভারম্ভ বানান লিখতে না জানারা যানবাহনে পতাকা উড়িয়ে চলতে দেখলাম। আহারে যাদের থেকে শিখবো সেই মানুষ গড়ার কারিগরদের একটা অংশ মোসাহেবির বাইরে নন। কোমলমতি শিশুদের দাড় করিয়ে দেন প্রচন্ড রোদে। অতিথি কে স্বাগত জানানোর অভিনবত্ব নাকি এটা। এমন করার কারণ জানতে চাইলে বলেন স্যার আপনাকে ভালবাসে তাই তারা আগ্রহী হয়ে এমনটা করেছে। এবার আসা যাকগে লেখক কূলে, ইনারা চামচাদের চেয়ে কয়েক চামচ এগিয়ে। জীবনে রাজপথ না দেখা নেতার রাজপুত্র কে রাজপথ কাঁপানো নেতা বানিয়ে ছাড়েন। প্যাকের পর প্যাক সাবাড় করা মহারথীদের গলির গেদন মিয়ার দোকানে চা খাওয়ার ছবি ছাপিয়ে জনগণের নেতা বানিয়ে ছাড়েন। এবার আসা যাক আইন আদালতে, এখানে যেন একটি অংশ ভাড়ামী কে কলা বা শিল্পে রুপ দিয়েছেন। এনাদের রয়েছে নিজস্ব ভাড়া করা ভাড় বা চামচা। মক্কেল দেখা মাত্রই সাহেবের গুণকীর্তন শুরু। সহজ সরলরা এখানে যেন শাহী হালিমের সাথে মোরবববা হতে আসে।দিন শেষে সর্বস্ব হারানো মক্কেল বেচারা যখন আক্কেল খুইয়ে জানতে চায় সাহেব আমি কেস ত হেরে গেলাম। তখন বুক ফুলিয়ে চেলার উত্তর কলম কি আমার সাহেবের হতে ছিলো? চিন্তা নাই সাহেব কে দিয়ে আপিল করাবো। আর তা না হলে হাই কোর্ট সুপ্রিমকোর্ট আছে না? যাইহোক এভাবে ক্ষেত্র ধরে আর লিখতে চাইনা, কারণ ক্ষেত্র কষতে গেলে গল্প, উপন্যাস নয় বরং কয়েক খন্ডে বই প্রকাশ করা যাবে বৈকি। তারপরও সমাজ ব্যাবস্থার হালহকীকত দর্শনে অবাক হই এই দেখে যে, স্বার্থের প্রয়োজনে আপন ভাইয়ের পৃষ্ঠদেশ কামড়ে দেয়ারা কেবল মাত্র মোসাহেবি বিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে যখন নগর মহা নগরের অধিকর্তা হয় কিংবা চেলামির পসরা সাজিয়ে তদবির বানিজ্যের ঠিকাদার শিরোনাম হওয়ারা যখন খানেখানাদের পা চেটে কেবলমাত্র চামচামির যোগ্যতায় মসনদের অংশীদার বনে যায়। তখন আফসোস নামক অজুহাতের আশ্রয় নেয়া ছাড়া কি আর করার থাকে সাধু সাবধানী দের। লেখক গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ আহমদ এব্যাপারে অনেক আগেই সাবধান করে লিখেছেন ”

” প্রশংসা আসবে জনগণ থেকে, চামচাদের থেকে নয়। ভালোবাসবে জনগণ, চাটুকারেরা করবে পদলেহন। কেউ উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হলে অভিনন্দন তাঁর প্রাপ্য। দেয়াল, ইলেকট্রিকের খাম্বা, সড়কদ্বীপ, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে যে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও ভালোবাসার প্রকাশ, তা প্রকৃতপক্ষে চামচামিরই বহিঃপ্রকাশ “। কিন্তু আমরা শিখলাম কই? বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবীদের মেধাবী, ধৈর্য, শ্রম, আনদোলনে মাঠে রক্ত ও ঘাম ঝরানো গনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্ব মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরী কিংবা বাহাদুর ব্যাপারীরা আজও উজানে নৌকা বায়। আর চেলারা হাওয়াই জাহাজে নয়তো প্রমোদতরীতে। দিন বদলের নামে নেতৃত্বকে কালো চশমা পরিয়ে চরিত্র বদলের এ খেলা আর কত দিন? নাকি অনাদিকাল অনন্ত যাত্রা অব্যাহত থাকবে ভাড়দের । স্বাধীন বাংলাদেশে এই চামচাদের কারণেই বঙ্গবন্ধু সরকারে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমেদের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি করতে চামচারা নেপথ্য ভুমিকা পালন করে। অথচ ৭৫ পরবর্তী দুঃসময়ে এই সব চামচা ও সুবিধাবাদীদের অবস্থান সকলের জানা। জিয়ার শাসন আমলে উচ্চবিলাসী কিছু সামরিক ও বেসামরিক চামচারা এতই প্রতিপত্তিশালী ছিল যে যার পরিনাম জিয়া হত্যা। পরিশেষে এরা আশ্রয় নেয় সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদের ঘাড়ে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই মোসাহেবেদের রাম রাজত্বের যবনিকা কোথায়?এই প্রশ্ন থেকেই যায়।