যেভাবে চলে নারী চা শ্রমিকের সংগ্রামী জীবন – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

যেভাবে চলে নারী চা শ্রমিকের সংগ্রামী জীবন

প্রকাশিত: ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৯

যেভাবে চলে নারী চা শ্রমিকের সংগ্রামী জীবন

মাধবপুর প্রতিনিধি
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় ৫টি চা বাগানে প্রতিদিন সকাল হলেই চোখে পড়ে শত শত নারী দল বেঁধে চা বাগানে যাচ্ছে। কঠোর পরিশ্রমে এসব নারীরা সকাল সন্ধ্যা কাজ করেন। কিন্তু তারা বেশির ভাগই অপুষ্টিতে ভোগছে। তাদের সামাজিক রীতিনীতি ধর্ম, কৃষ্টি, কালচার, জীবনাচরণ, বর্ণ ধর্ম, কথা বলার ঢং, কাজের নিখুুঁত বুনন আমাদের ঐতিহ্য ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলেছে। কিন্তু এ সব নারী শ্রমিক কতটুকু মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে?
পোকা মাকড়ের মতো ছোট্ট কুঁেড়ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে ঠাসাঠাসি করে কোনো রকমে জীবন চালায়। বড় কথা হচ্ছে নারী চা শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করে থাকে। তাদের মধ্যে রয়েছে সাওতাল, মুন্ডা, ভূমিজ, কল, তন্তবায়, বাকতি সহ বিভিন্ন উপগোষ্ঠির লোকজন। চা বাগানের নারী শ্রমিকরা কেউ অলস সময় কাটায় না। যাদের বাগানে কাজ রয়েছে ঘুম থেকে বাড়ি ঘরের কাজ শেষে পায়ে হেঁটে দল বেঁেধ বাগানে যায়। অবিরাম দুটি পাতা একটি কুঁড়ি উত্তোলন করে এ কচি পাতা মাথায় করে কারখানা অথবা ট্রাক্টরে পৌঁছায়। দুপুরের খাবার সেরে নেয় বাগানের ভিতর। ৫/৭ জন নারী শ্রমিক দল বেধে বসে খাবার প্রস্তুত করে। এ খাবারে কি পরিমাণ খাদ্যপ্রাণ অথবা পুষ্টিগুণ রয়েছে এ সম্পর্কে তাদের আদৌ কোনো ধারণা নেই। ক্ষুধা মেটাতে হবে এই প্রয়োজনে খাবার। খাবার তালিকা থাকে মুড়ি, চানাচুর, কাচামরিচ, কাচা চা পাতা, পেয়াজ, আলু, চটকিয়ে ভর্তা বানিয়ে রুটি দিয়ে এ খাবার খায়। সঙ্গে থাকে বোতল ভর্তি গরম লাল চা।
কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসব নারী শ্রমিকরা। ক্লান্ত শরীর মলিন মুখ ক্ষুধার্ত হাড্ডিসার দেহখানা নিয়ে ঘরে ফেরার পর আবার শুরু হয় পারিবারিক কাজ। রাতের খাবার শেষে চট-ছালা বিছিয়ে মশারী বিহীন অন্ধকার ঘরে ঠাসাঠাসি ঘরে ছেলে সন্তান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। নারী চা শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস হলেও অনেক সময় দেখা যায় নব জাতক শিশুকে নিয়ে নারী শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়। অবুঝ শিশুকে গাছের নিচে রেখে নারী শ্রমিকরা কাজ করে। অভাব অনটন নারী শ্রমিকদের এখন নিত্য দিনের সঙ্গী।
মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া, সুরমা, জগদীশপুর, বৈকুণ্ঠপুর, নোয়াপাড়া চা বাগানের নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথাবলে জানা গেছে তারা সকাল সন্ধ্যা রোদ বৃষ্টিতে চা বাগানের ভিতরে কাজ করেন। কিন্তু স্বল্প মজুরীতে তাদের জীবন জীবিকা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চা বাগানের পক্ষ থেকে যেটুকু স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয়। এ কারণে অনেক নারী শ্রমিক নানা রোগে আক্রান্ত। অর্থাভাবে তাদের চিকিৎসা হয় না। শুধু বাগানেরই কাজ নয় আবার ঘরে এসে গৃহস্থালির কাজ রান্না বান্না সহ অন্যান্য কাজও তাদের করতে হয়। তাদের অভিযোগ চা বাগানের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা হয় সরকারিভাবেও তাদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। মাধবপুর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুলায়মান মুজুমদার বলেন, ইউনিসেফের অর্থায়নে ২০১১ সন থেকে চা বাগানে বিনা মূল্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এখন রাজস্ব খাত থেকে পর্যায়ক্রমে সকল চা শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া চা শ্রমিক সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য উপবৃত্তি সহ শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হচ্ছে।
মাধবপুর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জান্নাত সুলতানা বলেন, ২৩টি চা বাগানে সুবিধা বঞ্চিত নারীদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ চলছে। তাদেরকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে করে তাদের মান আগের চেয়ে অনেক উন্নয়নের দিকে।