যে কথা হয়নি বলা- ২ – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

যে কথা হয়নি বলা- ২

প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২০

যে কথা হয়নি বলা- ২

উজ্জ্বল চৌধুরী:
প্রথম পর্বের লেখা পড়ে ছোট ভাই ফারহান, সাইফ খান ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভাতিজা আহবাব চৌধুরী জনির অনুরোধ যেন কালক্ষেপণ না করে দ্বিতীয় পর্বের লিখনী প্রকাশ করি। তাই অব্যক্ত কথাগুলোকে ব্যক্ত করার যৌক্তিক প্রচেষ্টায় আবারও কলম হাতে নিলাম। গত পর্বের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রোমাঞ্চিত স্মৃতি পড়ে বাল্যবন্ধু তাপসী অন্য ঘটনাগুলো স্বরণ করিয়ে দেয়ায় ধন্যবাদটা পরিশোধ করলাম এই লিখায়। যাই হোক, বিদ্যালয় বেলার আরো কিছু ঘটনা উল্লেখ করার স্বার্থকতা রাখে।

আমাদের সময় পোলিও টিকা খাওয়ানোর জন্য প্রায়ই স্বাস্থ্যকর্মীরা স্কুলে আসতো। আমরা তাদের ভয়ে তটস্থ থাকতাম। সহপাঠী মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শামিম ছিলো ভয়ের মাত্রা বৃদ্ধির মূল কারিগর। সে নাকি তাদের ব্যাগের মধ্যে ইয়া বড় একটা সুঁই দেখেছে! তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী এলাকার বিখ্যাত শিকারি আবু মিয়ার ছেলে, আমাদের আরেক সহপাঠী; বেশ ও বয়সে যে কিনা আমাদের থেকে কয়েক ছটাক বড় “রিফ”, পুরো নাম রিপন মিয়া ।

রিফ মিয়ার সাক্ষ্য হলো, তাদের কাছে থাকা সুঁই নাকি গরুর সুঁইয়ের চাইতেও সামান্য বড়। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্বস্ত সাক্ষীর বক্তব্য শুনে আমাদের অবস্থা অনেকটা সে সময়ের ব্রায়ান লারার সামনে খালেদ মাহমুদ সুজনের বোলিং করার মতো। এমনই যখন অবস্থা তখন বন্ধু জাহিদুল বললো, বই সহ মুরাদ ইতিমধ্যে বটগাছের নিচে অপেক্ষায় আছে, সুযোগ বুঝে আমরাও যেন পালিয়ে আসি। কেউ একজন এসে বললো, যারা পড়ালেখায় ভালো তাদেরকে ছোট আকারে সুঁইবিদ্ধ করার জন্য নাকি মঈন স্যার অনুরোধ করেছেন। এ কথা শোনা মাত্রই জাহিদুল হাওয়া হয়ে গেল। আমিও তার পিছন পিছন ছুটলাম। সুন্দরী মিস ডি এম হাইস্কুল অর্থাৎ আমাদের পরবর্তীতে হাইস্কুলের সহপাঠী শামিমা রহমানের খালা আমাদের নব্য যোগদান করা শিক্ষিকা পারভীন আপা পিছন থেকে নাম ধরে ডাকছিলেন আর চিৎকার দিয়ে বলছিলেন, সুঁই না রে! ক্যাপসুল খাওয়াতে আসছে।

কে শুনে, কার কথা; রবার্তো কার্লোসের ফ্রি কিককে হার মানানো গতিতে বন্ধু জাহিদুলকে পিছনে ফেলে বটগাছের নিচে অবস্থানরত মুরাদকে জড়িয়ে ধরে বাংলা সিনেমায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট বেলার খেলার সাথীকে ফিরে পাবার পরের আলিঙ্গন করতে করতে বললাম, চল! স্কুল চলাকালীন সময়টা কোনোভাবে ব্যয় করার পরিকল্পনা করি। মুচকি হাসি দিয়ে ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে বললো, দোস্ত- আগে তুমি শান্ত হও!

উল্লেখ্য, মুরাদের আব্বা মহী চাচা বেকারিতে চাকরি করার সুবাদে বন্ধু মুরাদের স্কুল ব্যাগ হয়ে মুখরোচক বিস্কুটগুলি আমাদের পাকস্থলীতে আশ্রয় নিতো। যার কৃতজ্ঞতা মুরাদকে জানানো হয়নি আজও। পরবর্তীতে স্কুল ছুটি হলে বাকি ছাত্রদের মতো স্বাভাবিক গতিতে বাড়ি গিয়ে দেখি, স্কুলে সুঁই দিতে আসা সেই দলের কর্তাব্যক্তির সাথে বড় ভাই চা খাচ্ছেন। এ দৃশ্য দেখে রয়াই বাবুর্চির ডেগচিতে যাবার পূর্বে গ্রামসেরা খসাই আঁকিব মিয়ার সামনে হালাল হতে যাওয়া গরুর মতো নিরুপায় হয়ে আম্মার পায়ে ধরে বললাম, আমি সুঁই নিবো না। আম্মা বললেন, ইনি তোমাকে ইঞ্জেকশন পুশ করতে আসেনি। উনার নাম হলো, আখলাকুল আম্বিয়া চৌধুরী; তিনি তোমার ভাইছাব। আমি জানতে চাইলাম, তিনি এখন আসলেন কেন?

আম্মা বললেন, কিছুক্ষণ পর ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ। খেলা দেখতেই তিনি এসেছেন। এ কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে কাছে যেতেই তিনি আমাকে পরম আদরে পাশে বসালেন; বললেন, আমার কাছে একটা জিনিস আছে , সেটা খেলে তুমি শচীন টেন্ডুলকারের মত ছক্কা হাকাতে পারবে। এ কথা শুনে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন। আমি বললাম, খাবো। তিনি ক্যাপসুল খাইয়ে দিয়ে বুক পকেট থেকে একটা ২ টাকার নোট ধরিয়ে দিলেন। টাকা হাতে নিয়ে এক দৌড়ে মাতাব চাচার দোকান থেকে সুইটি বিস্কুট আর চক্কর দানা কিনে আসার পথে কোন এক সহপাঠীর থেকে জানলাম, স্কুল পালানোর দায়ে হেড স্যার আমার নাম স্কুল পলাতক বাকি পাপীদের সাথে লাল কালিতে লিখে রেখেছেন!

চলবে…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •