রাজাকার মহিবুরের মৃত্যুদণ্ড, মুজিবুর-রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদণ্ড – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

রাজাকার মহিবুরের মৃত্যুদণ্ড, মুজিবুর-রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদণ্ড

প্রকাশিত: ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ, জুন ১, ২০১৬

রাজাকার মহিবুরের মৃত্যুদণ্ড, মুজিবুর-রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদণ্ড
untitled-1_215558_215735একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হবিগঞ্জ বানিয়াচং উপজেলার দুই সহোদর এবং তাদের এক চাচাতো ভাইসহ তিন রাজাকারের সাজা ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার খাগাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মহিবুর রহমান বড় মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড এবং তার ছোট ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া ও তাদের চাচাতো ভাই আবদুর রাজ্জাককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বুধবার বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। এই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়াদী।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে রায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী ২৪০ পৃষ্ঠার রায়ের সার সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন। এরপর বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম রায়ের বাকি অংশ পড়েন এবং সবশেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হক সাজা ঘোষণা করেন।

রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা চার অভিযোগের সবগুলোই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে হত্যার দায়ে মুহিবুরকে মৃত্যুদণ্ড ও তার দুই ভাইকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন অভিযোগে আসামিদের প্রত্যেকের ৩৭ বছর করে সাজার আদেশ দিয়েছে আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মুহিবুর রহমানের দণ্ড কার্যকর করতে পারবে।

তিন আসামি বানিয়াচং উপজেলার মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া, মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া এবং আব্দুর রাজ্জাক রায়ের সময় কাঠগড়াতেই উপস্থিত ছিলেন।

এই রায়ে ‘সন্তুষ্ট নন’ জানিয়ে  আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ রানা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তারা আপিল করবেন। নিয়ম অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পাবেন ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত আসামিরা।

অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, তারা যে রাজাকার ছিল তা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। এই রায়ে আমরা আনন্দিত। তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় জাতি খুশি হয়েছে।

গত ১১ মে তিন আসামির উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ওইদিন রায়ের জন্য অপেক্ষমান রেখেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

তিন আসামির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা. নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ চার ধরনের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ শিমন, তাপস ক্রান্তি বল ও রেজিয়া সুলতানা চমন। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট গোলাম কিবরিয়া ও মাসুদ রানা।

গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর এই তিন আসামির বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগ আমলে নিয়ে চার্জ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে ১২ জন এবং আসামিপক্ষে ৬ জন সাক্ষ্য দেন।

২০০৯ সালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আকল মিয়ার স্ত্রী ভিংরাজ বিবি হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই তিনজনসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন। প্রসিকিউশনের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ দুই সহোদরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

ওইদিনই রাতেই বানিয়াচংয়ের নবীগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। পরে মামলাটি ঢাকায় স্থানান্তর করা হলে তদন্ত শেষে ওই বছরের ২৮ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা।এরপর ১৯ মে মহিবুর-মুজিবুরের চাচাতো ভাই রাজ্জাককে মৌলভীবাজারের আথানগিরি পাহাড় থেকে গ্রেফতার করা হয়।

যত অভিযোগ: এক. একাত্তরের ১১ নভেম্বর বানিয়াচং উপজেলায় অভিযান চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আকল আলী ও রজব আলীকে হত্যা করে লাশ গুম করে আসামিরা। দুই, আসামিরা পাকিস্তানি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মেজর জেনারেল এমএ রবের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ করে।

তিন, একই দিন খাগাউড়া এলাকার উত্তরপাড়ায় আসামিদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী মঞ্জব আলীর স্ত্রী ও আওলাদ ওরফে আল্লাত মিয়ার ছোট বোনকে ধর্ষণ করে। পরে আল্লাত মিয়ার বোন লজ্জায় বিষপানে আত্মহত্যা করেন।

চার, একাত্তর সালের ভাদ্র মাসের কোনো একদিন আনছার আলীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে পঙ্গু করার অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।