রোহিঙ্গা দুর্গতদের সার্বিক পরিস্থিতি ও আমাদের কর্মপরিকল্পনা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

রোহিঙ্গা দুর্গতদের সার্বিক পরিস্থিতি ও আমাদের কর্মপরিকল্পনা

প্রকাশিত: ৫:৫২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৮, ২০১৭

রোহিঙ্গা দুর্গতদের সার্বিক পরিস্থিতি ও আমাদের কর্মপরিকল্পনা

শায়খুল হাদীস আল্লামা মামুনুল হক (দাঃবাঃ) আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভাগ্যপরিবর্তনের সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ ৷ জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের প্রহসনমূলক বৈঠকের পর মায়ানমার জান্তাবাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ৷ হাজার হাজার মানুষের স্রোত প্রতিদিন বেয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে ৷ আরাকানের মুসলিমরা মায়ানমারজান্তার জুলুমে ভিটে-মাটি, সহায়-সম্পদ এমনকি আপন ও প্রিয়জনদেরকে হারিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন ৷ নাগরিক অধিকার তো দূরের কথা ন্যূনতম জীবনের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তাটুকু হারিয়ে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৷ বাংলাদেশে তাদের জীবনযাত্রা যত কঠিন ও মানবেতরই হোক না কেন, তবুও এতটুকু নিশ্চয়তা অন্তত আছে যে, হঠাৎ কোনো দস্যু বা জান্তা বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের স্টীমরোলার চলে না ৷ এই বিবেচনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মায়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশে এসে অনেক ভালোই আছে ৷ তবে তাদের জীবনের ভবিষ্যত কী? …
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বাংলাদেশে তিনটি পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ভাবনা আছে –
১ম পক্ষ হল বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ৷ প্রাথমিকভাবে শরণার্থী হিসাবে রোহিঙ্গাদেরকে দেশে আশ্রয় দিয়েছে সরকার ৷ সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে তাদের মাঝে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য ৷ রোহিঙ্গাদেরকে নিয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর সামাজিক, অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা থাকলেও ধর্মভিত্তিক কোনো এজেণ্ডা সরকারের হাতে নেই ৷
২য় পক্ষ হল, আন্তর্জাতিক ইসলামবিদ্বেষী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় এজেন্ট ৷ ইসলাম বিরোধী চিহ্নিত এনজিওগুলো এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ৷ উপরোক্ত এনজিওগুলো যে এ জাতীয় দুর্যোগ-দুর্বিপ
াকের সুযোগে মানুষের ঈমান হরণের চেষ্টা চালায় সেটা তো সবারই জানা ৷
রোহিঙ্গা বিষয়ক ৩য় পক্ষটি হচ্ছে আলেম ওলামা ও ইসলামী মহল ৷ যারা রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্যের পাশাপাশি তাদের দ্বীনী চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন ৷
এখানে আদর্শিকভাবে উক্ত তিনটি পক্ষ সক্রীয় থাকলেও চতুর্থ আরেকটি পক্ষ এখানে খুবই তৎপর আছে, যারা প্রতারণা ও ধান্দাবাজীতে লিপ্ত ৷ তাদের তো টুপাইস কামানো ছাড়া অন্য কোনো এজেণ্ডা নেই ৷
এখানে স্পষ্টতই ইসলামবিরোধী ও ইসলামপন্থীদের উদ্দেশ্যগত বিরোধ রয়েছে এবং দিনে দিনে সেটা আরো প্রকট আকার ধারণ করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই ৷ ইসলামবিরোধী এনজিওগুলো মানবিক সাহায্যকে হাতিয়ার বানিয়ে রোহিঙ্গাদের সন্তানদেরকে ইসলামবিমুখ করার প্রয়াস চালাবে ৷ ওলামায়ে কেরামের উদ্যোগকে ব্যহত করার চেষ্টা করবে ৷ ইসলামবিরোধী মিডিয়া এ ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ৷ তাদের মিডিয়াকে ব্যবহার করে তারা প্রশাসন, সরকার ও সেনাবাহিনীকেও মিসগাইড করবে, যার আলামত ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ৷ তাই আলেমসমাজকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে ৷
আজ ৪ অক্টোবর কালেরকণ্ঠ পত্রিকায় শাহপরীর দ্বীপের দুটি মাদরাসাকে নিয়ে করা রিপোর্টটি পড়লে যে কোনো সংবাদ বিশ্লেষকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, কতটা অসামন্জস্যপূর্ণ ও বানোয়াট রিপোর্ট তারা তৈরি করতে পারে ৷ রোহিঙ্গারা দিনের পর দিন পায়ে হেটে নাফ নদীর তীরে এসে যখন শুধু অর্থের অভাবে নদী পার হতে পারে না, তাদের কাছ থেকে অমানবিক উপায়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় নৌকার মাঝি আর স্থানীয় দালালগোষ্ঠী, সেই পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করে মৃত্যুপুরি থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে আনার জন্য যদি অর্থের সাহায্য করা হয়, এত বড় মানবিক কাজ যদি কালেরকণ্ঠের কাছে অপরাধ হয় তবে মানবতা মুখ লুকাবে কোথায়? আর শরণার্থীদেরকে আশ্রয় দিয়ে, সেবা দিয়ে, খাবার খাইয়ে সরকারের নির্দেশ মোতাবেক ক্যাম্পের পথে রওয়ানা করিয়ে দেওয়াটাও যদি বাহরুল উলুমের মুহতামিম মাওলানা হোসাইন আহমাদ সাহেবের অসৎ উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে সৎ উদ্দেশ্যের কোনো দৃষ্টান্ত কি পৃথিবীতে পাওয়া যাবে?
রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে আমি লক্ষ্য করেছি, তারা ইসলামী শিক্ষার প্রতি যথেষ্ঠ আগ্রহী ৷ তাদের মধ্যে অনেক হাফেজ আলেম বিদ্যমান ৷ এ সকল হাফেজ আলেমদের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরূরী কাজ ৷ আমি রোহিঙ্গা ওলামাদের সাথে মতবিনিময়কালে বলেছি, মায়ানমার সরকার তাদের জান-মাল কেড়ে নিয়েছে, এতে ততটা ক্ষতি হয়নি, যদি বাংলাদেশে এসে ঈমানচোরাদের খপ্পরে পড়ে তাদের সন্তানদের ঈমান হারিয়ে যায় তাহলে যতটা ক্ষতি হবে ৷ সুতরাং কাজও করতে হবে, সাবধানতাও অবলম্বন করতে হবে ৷ সরকার এবং সেনাবাহিনীর সর্বশেষ সিদ্ধান্ত তারা না জানালেও নিজ নিজ দায়িত্বে জেনে নিতে হবে এবং সে আলোকে নিজেদের কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে ৷ প্রশাসন ও সরকারী দলের লোকজনকে সাথে নিয়ে কাজ করাটা মনে হয় ভালো হবে ৷
মনে রাখতে হবে রোহিঙ্গারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে মানুষের দান-সাহায্য নিয়ে জীবন চালাচ্ছে ৷ এটা তাদের চূড়ান্ত পরিচয় নয় ৷ তাদেরকে মাথা উঁচু করে দাড়াতে সহযোগিতা করতে হবে ৷ ঈমান আমলের পরিবেশ ঠিক রেখে বিশ্বপরিস্থিতি ও যুগ-জামানা বিষয়ে উপযোগী শিক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে ৷ যদি শিক্ষাটা সুন্দর ও সার্বিক হয়, তবে সেটাই হবে তাদের মুক্তির আলোকবর্তিকা শিক্ষার হাতিয়ার না পেলে এরা ভিক্ষুকে পরিণত হবে ৷ আল্লাহ হেফাজত করুন ৷ রোহিঙ্গাদের অবস্থা অনেকটা ১৮৫৭ পরবর্তি ভারতবর্ষের মত ৷ যখন আযাদী আন্দোলনের বীরযোদ্ধারা যুদ্ধের হাতিয়ার রেখে শিক্ষার হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলেন ৷ ১৮৫৭ এর শামেলীর যোদ্ধারাই ১৮৬৬ সালে গড়েছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দ ৷ ঠিক তেমনি অবচেতনের শিকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের হৃদয়ে সর্বপ্রথম চেতনার মশাল জ্বালতে হবে ৷ অপরিণামদর্শী কোনো রকম উস্কানীমূলক তৎপরতায় সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না৷