রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ২২ দফা নির্দেশনা – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ২২ দফা নির্দেশনা

প্রকাশিত: ৪:৩৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৭

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ২২ দফা নির্দেশনা

রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২২ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছে দেড় ডজন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি বিভাগ। এ নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ লাখ ৫৪ হাজার রেহিঙ্গার মধ্যে খাবার ও ত্রাণ বিতরণ চলছে। কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকায় প্রায় ৬ হাজার বিঘা জমিতে ৮৪ হাজার পরিবারের বাসস্থানের জন্য ১৪ হাজার শেড নির্মাণ কার্যক্রম চলছে জোরেশোরে। নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ লাইন সংযোগের কাজও চলছে দিনরাতে। চিকিৎসা চলছে ২০টি মেডিকেল ক্যাম্পসহ স্থানীয় হাসপাতালে।

এদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে দুই দিনের সফরে আজ বুধবার ঢাকা আসছেন তুরস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী রিসপ আকডাগ। তিনি বিশেষ বিমানে আসছেন। ঢাকা সফরকালে সাক্ষাৎ করার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও দুর্যোগমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর-বিক্রমের সঙ্গে। কক্সবাজারে সরেজমিনে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করবেন উপপ্রধানমন্ত্রী।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য ১৪টি ত্রাণসমাগ্রী সংরক্ষণে গুদাম নির্মাণের সরঞ্জামাদি নিয়ে ডব্লিউএফপির (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা) একটি বিশেষ বিমান আগামী শনিবার বাংলাদেশে আসছে।

পররাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ২২ দফা নির্দেশনা পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ দেড় ডজন মন্ত্রণালয় ও বেশ কয়েকটি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ডব্লিউএফপি, বিজিবিসহ স্থানীয় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে ১০ দিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য ১৪ হাজার শেড নির্মাণ করতে হবে। ডব্লিউএফপির অর্থায়নে ১৪টি ত্রাণসমাগ্রী সংরক্ষণে গুদাম নির্মাণ করতে হবে। বিদেশি সাহায্য সশস্ত্র বাহিনী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করবে। দেশীয় সব ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। আর এনজিওদের ত্রাণ সহায়তা প্রদানে এনজিও ব্যুরোর অনুমতি লাগবে।

নির্দেশনার মধ্যে আরো রয়েছে, চার লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে চার মাসের জন্য খাদ্যব্যবস্থা করবে ডব্লিউএফপি। রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে না যাওয়া পর্যন্ত খাবার বিতরণ করবেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ত্রাণ বিতরণে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে ডব্লিউএফপিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ-সংস্থা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ইউএনএইচসিআর নির্মাণ করবে ৮ হাজার লেট্রিন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ৫শ’ অস্থায়ী লেট্রিন তৈরি করবে। পানি সমস্যা যাতে না হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সব ব্যবস্থা করবে। বিদ্যুৎ বিভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের গাইডলাইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট দফতর জন্মনিবন্ধন করবে। আর নির্বাচন কমিশন স্মার্ডকার্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করবে। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নতুন রেজিস্ট্রেশন করবে পাসপোর্ট অধিদফতর। চিকিৎসার জন্য কলেরার ভ্যাকসিন, ওরসেলাইনসহ সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর। ২০টি মেডিকেল স্থাপন করে গর্ভবতী নারীসহ জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় সড়ক নির্মাণ ও মেরামত করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। রোহিঙ্গা এতিম ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা কাজ করবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচারে তথ্য মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার সহায়তা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামালের নেতৃত্বাধীন টিম। শাহ কালাম জানান, ৪ লাখের অধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর জন্য ১৪ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণকাজ দ্রুত চলছে। প্রতিটি আশ্রয় শিবিরে ছয়টি রোহিঙ্গা পরিবারের ঠাঁই নিতে পারবে। সেখানে সঠিক সেনিটেশন, পানি ও চিকিৎসা সুবিধার ব্যবস্থা থাকছে। এ জন্য জাতিসংঘসহ অনেকেই সহযোগিতা করছে। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুম হারাম করে দিনরাত কাজ করছে। বিশেষ করে ত্রাণ সুষ্ঠুভাবে বিতরণে প্রশাসনকে সহায়তা করছে সশস্ত্র বাহিনী।

প্রসঙ্গত ২৪ আগস্ট রাখাইনে বেশ কয়েকটি তল্লাশিচৌকিতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামলা চালায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যসহ নিহত হন ৭০ জনের বেশি মানুষ। ওই হামলার জের ধরে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে দায়ী করে তাদের ওপর নির্বাচারে নির্যাতন ও হত্যা শুরু করে। এরপর থেকেই রাখাইন ও আরাকান রাজ্য থেকে কক্সবাজারের টেকনাফসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। এ আসা অব্যাহত রয়েছে।