লকডাউন, বা কারফিউ কি খুব জরুরি? – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

লকডাউন, বা কারফিউ কি খুব জরুরি?

প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০২০

লকডাউন, বা কারফিউ কি খুব জরুরি?

টেস্ট বাড়ছে, সনাক্ত বাড়ছে। নিশ্চয়ই খারাপ খবর। সাবধানতা বাড়াতে হবে, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু সংক্রমণ রোধে লকডাউন বা কারফিউ জারী কি খুবই অপরিহার্য? কারফিউ বা লকডাউন করতে পারলে ভালো, কিন্তু ভাবতে হবে বাংলাদেশের বাস্তবতায়। এদেশের ৬০ ভাগ মানুষ প্রতিদিন উপার্জন করে খাবার জোগাড় করে। একদিন উপার্জন নেইতো পরিবারের সবার খাবার বন্ধ। অন্যের সহানুভূতি নিয়ে কয়দিন চলা যায়? সরকারী- বেসরকারী ত্রাণ কার্যক্রম কতভাগ মানুষের দোরগোড়ায় আমরা পৌঁছাতে পেরেছি, ভাবতে হবে।
দুনিয়ার সবদেশে দুর্যোগ মোকাবেলার কৌশল সমান হতে পারে না । কল্যাণ রাষ্ট্রসমূহ তার নাগরিকদের উপার্জন বন্ধ হলেও সমপরিমান প্রণোদনা প্রত্যেকের ব্যাংক একাউন্টে পৌঁছে দিচ্ছে। লকডাউনের কারণে তাদের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাগরিকদের জীবনযাত্রায় তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। তাদের সাথে আমরা তাল মেলালে চলবে না। আমাদের চলতে হবে ‘সাপও মরবে, লাঠিও ভাংবে না’ নীতিতে।
‘একজন মানুষও না খেয়ে মরবে না’, এমন বক্তব্য রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছুই নয়। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি- লক্ষ, লক্ষ মানুষ অনাহারে- অর্ধাহারে আছে। অভাব কি জিনিষ, তা শহরের আরাম কক্ষে বসে আন্দাজ করা কঠিন। গ্রামের রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, কৃষক, মজুর, মেহনতি মানুষের ঘরের বেড়ায় কান পাতুন, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের দিশেহারা চেহারাটি পড়তে চেষ্টা করুন। তারা ত্রাণের প্যাকেট চায় না, কাজ চায়। মেহনত করে উপার্জন করতে চায়। তিনবেলা পরিবার নিয়ে খেতে পারাই তাদের প্রশান্তি। এই প্রশান্তির পথ বন্ধ করবেন না। সংক্রমণ রোধ করার জন্য দুর্ভিক্ষ ডেকে আনবেন না। যেসব সুশীলরা লকডাউনের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেছেন, তাদেরকে বলবো- গতানুগতিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসুন, লাগসই উপায় উদ্ভাবন করুন। আপনাদের মত সবার ঘরে পর্যাপ্ত খাবারের সংস্থান আছে, এটা ভেবে ভুল করবেন না।
প্রশ্ন ওঠবে তাহলে উপায় কি? মানুষ কি ভাইরাসের কাছে আত্মাহুতি দেবে? সংক্রমণের ব্যাপকতায় মহামারি হবে? প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে শত শত মানুষ যোগ দেবে?
না, সেটি কখনই কাম্য নয়। আমরা মহামারিতে মৃত্যু চাই না, আবার ক্ষুদায় মৃত্যুও আমাদের কাম্য নয়। এজন্য আমাদের দরকার মধ্যম পন্থা। ‘সীমিত পরিসরে’ নামে একটি টার্মিনলজি ইদানিং খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ কেউ এটি নিয়ে ট্রল করেন। আমি মনে করি বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ নীতিটি অত্যন্ত কার্যকর এবং সময়োপযোগী। সবকিছুই চলবে। কিন্তু পরিমিতিবোধ নিয়ে। আমরা এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এখন অন্য সময়ের ন্যায় ব্যাপক মুনাফা, সঞ্চয়, বিলাস চর্চার সময় নয়। জীবনের চাকা সচল থাকলেই আমাদের সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। এজন্য দোকান- পাট খুলবে, অফিস- আদালত, ব্যাংক- বীমায় কাজ হবে, গণ পরিবহণ চলবে। কিন্তু সীমিত পরিসরে, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে। লকডাউন কিংবা কারফিউ বলবৎ করতে যে পরিমান রিসোর্স এবং ম্যনপাওয়ার নিযুক্ত করতে হবে তা জনসাধারণকে স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণের মোটিভেশানে কাজে লাগান। সাপও বাঁচবে, লাঠিও ভাংবে না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, মানুষের জীবন-জীবিকাও স্বাভাবিক থাকবে। বলতে পারেন, এদেশের মানুষকে স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করানো কঠিন। হ্যা, কঠিন- কিন্তু অসম্ভব নয়। শহরে কিংবা গ্রামে, একেবারে প্রান্তিক শ্রেণী পর্যন্ত এত বিশাল জনগোষ্ঠীকে মাস্ক পরিধান করতে দেখেছেন অতীতে? দেখেননি। কিন্তু এখন মানুষ মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছে, এটি সত্য। সরকারের সিদ্ধান্তে মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় থেকে মানুষ কি বিরত থাকেনি? থেকেছে। মানুষকে পর্যাপ্ত মোটিভেশান চালিয়ে যান, নিশ্চয়ই সুফল আসবে। কঠোর লকডাউন কিংবা কারফিউ জারী করে তা চালিয়ে যাওয়াও কিন্তু অতটা সহজ নয়। অভাবী মানুষ লকডাউন বা, কারফিউ এর ফাঁকগলে তার উপার্জনের পথ খুঁজবেই। তখন এ মানুষগুলোর ওপর নিষ্টুরতা চালাবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তখন একদিকে করোনার থাবা, অন্যদিকে অভাবী মানুষের ক্ষুদার যন্ত্রণা এবং আইন প্রয়োগের নিষ্ঠুরতায় যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
মনে রাখবেন, লকডাউন কিংবা কারফিউ জারীতে যে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংকট দেখা দেবে, তার যোগান দেয়া আমাদের রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।
লেখক -ইকবাল মাহমুদ , সাবেক সাধারণ সম্পাদক -সিলেট প্রেসক্লাব।