লন্ডনে তারেকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রার্থীদের মাঠে নামার ইঙ্গিত – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

লন্ডনে তারেকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রার্থীদের মাঠে নামার ইঙ্গিত

প্রকাশিত: ২:৩৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১০, ২০১৭

লন্ডনে তারেকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রার্থীদের মাঠে নামার ইঙ্গিত

আগামীতেও খুলনা, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল, সিলেট ও রংপুর সিটি নির্বাচনে চমক দেখাবে বিএনপি! সে জন্য নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও যোগ্য নেতা বাছাই করতে নির্দেশ দেয়া হয় ৬ সিটির আওতাধীন বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের। দলটির একাধিক সূত্র এ তথ্য মানবকণ্ঠকে জানান।

এদিকে আগামী ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য রংপুর সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ৬ সিটি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক পদযাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে দলটি। সম্প্রতি রংপুর সিটির তফসিল ঘোষণা হলেও দলটি গত কয়েকমাস থেকে রংপুর সিটির দলীয় মেয়র প্রার্থী ঠিক করে রেখেছে। যদিও তফসিল ঘোষণার আগেই দলের চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া হয়নি। অপরদিকে রংপুর সিটির মাধ্যমে বিএনপির নির্বাচনীযজ্ঞ পুরোদমে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ। তিনি বলেন, সব নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রয়েছে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের আরো অনেক সময় বাকি থাকলেও সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে মাঠ গোছানোর তাগিদ দেন বিএনপির হাইকমান্ড। সিটি নির্বাচনের পরেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী একাদশ নির্বাচন।

এদিকে জানা গেছে, আগামী বছরের শেষে এবং আগামী বছরের শুরুতে ৭ সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ চলছে নির্বাচন কমিশনে। ২০১৮ সালের শেষ বা ২০১৯ সালের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ইসির নির্বাচনী রোডম্যাপে ইতোমধ্যে রংপুর সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এর পর চার সিটি তথা বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট এবং শেষে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন করার পরিকল্পনা রাখা হচ্ছে। এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা তারা বলেন, সেই লক্ষ্যে বিগত দিনের মতো আগামী সিটি নির্বাচনে চমক দেখাবে বিএনপি। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার আগেই দলের শীর্ষ নেতাদের সিটি নির্বাচনের জন্য যোগ্য প্রার্থী ঠিক করতে নির্দেশনা দিয়ে যান। এর পরিপেক্ষিতে ৬ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজেদের দুর্গ রক্ষাকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের আগে ৬ সিটিতে জয়লাভ করে দেশের জনগণের সামনে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে চায় দলটি। এমনকি এ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনের কৌশল চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এমন আভাস দিয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫ জুন একযোগে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ৬ জুলাই হয় গাজীপুর সিটির নির্বাচন। এর আগে ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর রংপুর সিটিতে নির্বাচন হয়।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই রংপুর সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। অন্য সিটির নির্বাচন প্রায় কয়েক মাস বাকি থাকলেও সংশ্লিষ্ট সিটিতে জয় এনে দিতে পারবেন এমন মেয়র প্রার্থীদের তালিকার খসড়া করেছেন নীতিনির্ধারকরা। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার কিছুদিন আগে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে এ বিষয়ে একান্ত বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বিভিন্ন জনমত জরিপের ভিত্তিতে কোন সিটিতে কাকে মনোনয়ন দিলে ভালো হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এমনকি সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যে কোনো মূল্যে ছয়টি সিটি কর্পোরেশনেই জয়লাভ করতে চায় বিএনপি। এ ব্যাপারে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচি অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে সেই নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছভাবে। তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনের বিষয়ে দলের হাইকমান্ড আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটারদের সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময়, পোস্টারে প্রার্থিতার ইচ্ছা প্রকাশ এবং নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে উঁচু গলায় কথা বলা শুরু করেছেন সম্ভাব্য বিএনপির প্রর্থীরা। চূড়ান্ত মনোনয়নের আশায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নজর কাড়তেও চলছে প্রতিযোগিতা। এমনকি মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তাদের সাধ্যমতো ‘হটলিংক’ এর চেষ্টা চালিয়েছেন লন্ডনেও। এমনকি সম্ভাব্য একটি তালিকা খালেদা জিয়া সঙ্গে করে লন্ডনে নিয়ে যান। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত মূল্যায়ন করে লন্ডন সফরে তারেকের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন খালেদা জিয়া। দেশে ফিরে প্রার্থীদের মাঠে নামার ইঙ্গিতও দিয়েছেন খালেদা জিয়া এমন তথ্য জানিয়েছেন একটি সূত্র।

দলটির বেশ কয়েক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর আগে যেসব প্রার্থী মেয়র নির্বাচন করেছেন তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৪ জন এবারো মনোনয়ন পাবেন। বাকিগুলোতে নানা বিবেচনায় প্রার্থী বদল হতে পারে। তবে বিগত সময়ে দলের মনোনয়নে যারা মেয়র হয়েছেন, কিন্তু দলের পক্ষে কাজ করেননি তারা কোনোভাবেই এবার প্রার্থী হতে পারবেন না।

যারা কাজ করতে গিয়ে জেল-জুলুমের শিকার, দায়িত্ব চলাকালে একাধিকবার বহিষ্কার হয়েও দলের প্রতি অনুগত থেকেছেন তারাই এবার প্রার্থী হবেন। দলটির একাধিক সূত্র জানায়, সিলেটে আরিফুল হক, গাজীপুরে এম এ মান্নান, বরিশালে আহসান হাবীব কামাল, রাজশাহীতে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, খুলনায় মনিরুজ্জামান মনির প্রার্থী ছিলেন। তারা জয়ীও হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল দুবার, মনিরুজ্জামান মনির একবার, আরিফুল হক চৌধুরী দুবার, অধ্যাপক এম এ মান্নান তিনবার সাময়িক বরখাস্ত হন। রংপুরে এবার প্রার্থী হতে চান রংপুর বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু।

দলটির সিনিয়র নেতারা জানান, বিগত আন্দোলনে ঢাকা ও গাজীপুরের নেতাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা না থাকায় হাইকমান্ড নাখোশ। তবে বাকি ২ সিটিতে বর্তমান মেয়ররাই মনোনয়ন পেতে পারেন। বারবার বরখাস্ত হওয়ায়, স্থানীয় জনগণের সহানুভূতি থাকায় এবং আন্দোলনে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখায় আপাতত তারা ডেঞ্জার জোনের বাইরে। শুধু তাই নয়, প্রার্থিতার বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা হচ্ছে বরিশালের বিষয়ে। সূত্র আরো জানায়, ছয় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা, প্রতিপক্ষের শক্তি ও কৌশল, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ভূমিকা বা দক্ষতা এবং নতুন নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সে অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কৌশল ঠিক করা হবে। শুধু তাই নয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ নির্বাচনগুলোকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করতে চায় বিএনপি। দল মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হলে সরকারের জনপ্রিয়তায় ছেদ পড়েছে বলে প্রচার করবে। আবার হেরে গেলে কারচুপির অভিযোগ তুলে সংসদ নির্বাচনে সহায়ক সরকারসহ নানা দাবি আদায়ে মিলবে মোক্ষম সুযোগ।

অন্যদিকে সিটি নির্বাচনগুলোতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা অংশ নিতে পারেন। এমন তথ্য জানিয়েছেন বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি বলেন, রংপুর সিটিতে দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা অংশ নেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত না হলেও শীর্ষ নেতারা এ ব্যাপারে ম্যাডামকে অবহিত করবেন।

৬ সিটি নির্বাচনে বিএনপির অস্থান জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি বরাবরই নির্বাচনমুখী দল। আমরা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে। এ বিষয়ে দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলীয় ফোরামে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিটি নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সরকারের সঙ্গে আঁতাত করেননি এমন প্রার্থীরাই মনোনয়ন পাবেন বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।