লন্ডনে আ.লীগ-বিএনপির সংলাপ : দায়িত্ব সরকারের, দোষারোপের সুযোগ নেই – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

লন্ডনে আ.লীগ-বিএনপির সংলাপ : দায়িত্ব সরকারের, দোষারোপের সুযোগ নেই

প্রকাশিত: ৭:২৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০১৬

লন্ডনে আ.লীগ-বিএনপির সংলাপ : দায়িত্ব সরকারের, দোষারোপের সুযোগ নেই

uk houss of comentএকাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি বলেছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব এড়ানোর ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথা শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশে মানবাধিকার, গণতন্ত্র কিংবা আইনের শাসনের কোনো সমস্যাই নেই। বিরোধীদের ওপর দোষ চাপিয়ে সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারে না, এটা অগ্রহণযোগ্য।

আজ মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের একটি সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিষয়ক এক সেমিনারে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতেই তাঁরা এমন মন্তব্য করেন। তবে বরাবরের মতো এবারও পারস্পরিক দোষারোপ আর সরকারের গুনগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সংলাপ।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির যুক্তরাজ্যের মুখপাত্র আবু বকর মোল্লা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন উল্লেখ করে সরকারি দলের এক বক্তার বক্তব্যকে খণ্ডন করে আবু বকর মোল্লা বক্তব্য দিতে গেলে সেমিনারে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়। সরকারি দলের ওই বক্তা বলেন যে, জামায়াতের কেউ উপস্থিত থাকবে জানলে তাঁরা এই সেমিনারে অংশ নিতেন না। এ নিয়ে তুমুল হট্টগোলের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষীর সহায়তায় আবু বকর মোল্লাকে সেমিনার থেকে বের করে দেওয়া হয়।

‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক দলগুলো ভূমিকা’ শীর্ষক ওই যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য আলেক্সান্ডার চার্লস কারলাইল ও বাংলাদেশ বিষয়ক সর্বদলীয় কমিটির চেয়ার ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের এমপি অ্যান মেইন। সেমিনারের শুরুতে যুক্তরাজ্যের ‘চেলথাম হাউস রুল’ এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অনুরোধ করা হয়, যাতে সেমিনারের বক্তাদের উদ্ধৃত করে কোনো সংবাদ প্রচার করা না হয়। সেই অনুরোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেমিনারে কোনো বক্তা কী বলেছেন, তা উল্লেখ থেকে বিরত থাকছে প্রথম আলো।

ক্ষমতার বাইরে থাকলে আ.লীগ-বিএনপি আইনের শাসনের রক্ষক বনে যান
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, ক্ষমতার বাইরে থাকলে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দলই মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় রক্ষক বনে যান। কিন্তু ক্ষমতায় গেলেই তাঁরা সেসব ভুলে প্রতিশ্রুতির বিপরীতে আচরণ করেন। এ সময় একজন এক এগারো পরবর্তী সময়ে লন্ডনে নির্বাসিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে নানা উক্তির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, খুন, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের। সুষ্ঠু তদন্ত ও যথাযথ বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিরোধীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিলেই সেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও উন্মুক্ত বিতর্কের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

একজন বলেন, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে সেমিনারের আয়োজন করা হলেও সরকারি দল মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর জবাব না উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরতে এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করেছে। সংকট নিরসনের সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনা না করলে কোনো সমাধান আসবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা সরকারের বিভিন্ন সাফল্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন যে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় সরকারের আমলেই বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, তাঁর প্রভাব এখনো টেনে চলছে বাংলাদেশ। বিএনপির পক্ষ থেকে এর জবাব দিয়ে বলা হয়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসর পর রমনা বটমূলে বোমা হামলা ও ফরিদপুরে বোমা পুতে রাখার ঘটনার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে প্রথম জঙ্গিবাদের সূচনা হয়।

বিএনপি নেতারা দেশে গুম, খুন গণগ্রেপ্তারের চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বক্তব্যই দেশে জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে। স্বাধীন মত প্রকাশ ও রাজনীতির সুযোগ সীমিত হয়ে আসার কারণেই দেশে সন্ত্রাসী হামলার প্রবণতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো অজুহাতেই সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। সন্ত্রাসবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে সম্মিলিতভাবে এই সমস্যা সমাধানের পক্ষে মত দেন তারা।

বিএনপি পক্ষ থেকে বলা হয়, গুলশানের ঘটনার পর জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় খালেদা জিয় জাতীয় ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। জবাবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করার কথা বারবার বলা হলেও বিএনপি তা করছে না। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলা হয়, জামায়াত যদি সন্ত্রাসী সংগঠন হয়, সরকার তাদের নিষিদ্ধ করে দিলেই তো সমস্যা চুকে যায়। কিন্তু সরকার তা করছে না।

বিএনপির নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচন আয়োজনের দাবির জবাবে সরকারের পক্ষের একজন বলেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্য সব বিষয়ে আলোচনা করা গেলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে কোনো সংলাপ হবে না।

বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ড সভার প্রয়াত সদস্য এরিক অ্যাভবেরির উদ্যোগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের নিয়ে ২০০৫ সাল থেকে সময়-সময় সেমিনার আয়োজন শুরু হয়। অ্যাভবেরির মৃত্যুর পর লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলীয় লর্ড কারলাইল সেই দায়িত্ব নিয়ে এবারের সেমিনারের আয়োজন করেন।

সেমিনারে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মশিউর রহমান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ও জাতীয় পার্টির মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ ও দীপঙ্কর তালুকদার। বিএনপির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবিহ উদ্দিন আহমদ ও বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক নিতাই রায় চৌধুরী। বিতর্কে বক্তব্য দেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিও।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য লন্ডনে এলেও আগের দিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি সেমিনারে অংশ নেননি।