লাগামহীন বাড়িভাড়ায় দিশেহারা ভাড়াটিয়া – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

লাগামহীন বাড়িভাড়ায় দিশেহারা ভাড়াটিয়া

প্রকাশিত: ১০:১১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

লাগামহীন বাড়িভাড়ায় দিশেহারা ভাড়াটিয়া

কাজলী দাস
নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাসাভাড়া। গত পাঁচ বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র নগর গবেষণা কেন্দ্রের জরিপ অনুসারে, সিলেট নগরীতে ৫ বছরে ভাড়া বেড়েছে প্রায় একশ’ শতাংশ এবং গত ১৫ বছরে বেড়েছে দুশ’ শতাংশ। কিন্তু সে হারে বাড়েনি মানুষের আয়। মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে; কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। এভাবে চলতে থাকলে নগরীতে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। অথচ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই। বাসাভাড়া নির্ধারণের জন্য আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ নেই।
ঘরে-বাইরে স্বস্তি নেই নগরবাসীর। একদিকে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য উভয়ের দাম বাড়তে থাকায় দিশেহারা মানুষ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবছর একাধিকবার গ্যাস-পানি, বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে নগরবাসীর। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা অবস্থায় পানি সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে মশার উপদ্রব। নগরবাসীর ৪০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। মাস গেলে যাদের ঘাড়ে নতুন করে বর্ধিত ভাড়া যোগ হওয়ার আশঙ্কা। সে সঙ্গে সম্প্রতি মাস শেষে আসছে বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল। সেই সঙ্গে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে নগরবাসী। গত ক’দিন ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া গেছে। এসব নাগরিক দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই বলে তারা অভিযোগ করেন।
নগরীর জিন্দাবাজার, দাঁড়িয়াপাড়া, চৌহাট্টা, লামাবাজার, মিরাবাজার, সোবহানীঘাট, তোপখানা, তাতিপাড়া, আম্বরখানা এলাকায় মেয়েদের স্কুল ও কর্মস্থলের সুবিধার্থে পরিবারগুলোর পছন্দের এলাকা হলেও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে বাসা নিতে পারছেন না অনেকেই। বাধ্য হয়েই তারা উপশহর কিংবা টিলাগড়ের দিকে বাসা নিতে হচ্ছে। সেজন্য তাদেরকে সহ্য করতে হচ্ছে প্রতিদিনকার রিকশা ভাড়া আর যানজটের যন্ত্রণা। পাগলা ঘোড়ার মত বাসা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ভাড়াটিয়া পরিবারগুলো পেরেশানীর মধ্যে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দু’বছর আগে নগরীর সোবহানীঘাট এলাকায় দু’রুমের একটি বাসার ভাড়া ছিল ১৫০০ টাকা; বর্তমানে তা ৩ হাজার টাকা হয়েছে। কাঁচাবাড়ির ভাড়া ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার টাকা। বস্তির এক রুম ২০০০ টাকা ছিল, এখন তা হয়েছে ৫০০০ টাকা।
মিরবক্সটুলা এলাকার ভাড়াটে গৃহিনী রুশনা বেগম জানান, যে হারে বাসাভাড়া বাড়ছে মধ্যবিত্ত মানুষ শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। দু’বছর আগে যে বাসা ৩ হাজার টাকা ছিল এখন ওই বাসায় ৫ হাজার টাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে পরিবারের সদস্য সংখ্যার চাপ নিয়েও এখানে বাস করছি। সেই সঙ্গে তো আছেই-পানি, বিদ্যুতের সমস্যা।
উপশহরে বসবাসকারী জামিল আহমদ জানান, পছন্দের বাসার জন্য বছরে বছরে বাসা বদল করছি। বর্তমানে ৫ হাজার টাকার বাসা ১২ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকছি। বাসার ভাড়া এতো ব্যবধান কেন জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা বলেন, নতুন বাসা। নিচের ফ্ল্যাটে একজন ইঞ্জিনিয়ার থাকছেন ১০ হাজার টাকায় অতএব দোতালায় আপনাকে ১২ হাজার গুণতে হবে। এইকভাবে জিনিস পত্রের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানোর কথা বললেন।
পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, বর্তমানে বাড়ি ভাড়ার জন্য এতোই দুশ্চিন্তায় আছি তা বলার বাইরে। সরকারের কাছে আকুল আবেদন সিলেটে গ্যাস সংযোগ যেনো পুনরায় খুলে দিন। তাতে কিছুটা হলেও বাড়ি ভাড়ায় শীতিলতা আসবে।
নগরীর লামাপাড়ার বাসিন্দা দিনমজুর সুমন মিয়া জানান, আমি দৈনিক আয় করি ৩০০ টাকা। একটি পাঁচতলা বাসার ছাদে থাকি। দু’রুমের বাসার ভাড়া ৬০০০ টাকা। তিনি বলেন, ভাড়া দিয়ে দৈনিক খেয়ে বাচা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার একটি মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। বাসা ভাড়া বৃদ্ধিতে আমার মেয়েটার পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছি।
নগরীর হাউজিং এস্টেট, দরগা মহল্লা, সুবিদবাজার এলাকায় বাসাভাড়া সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় তিন বেডের একটি বাসার ভাড়া ১০-২০ হাজার টাকা এবং দুই বেডের বাসাভাড়া ১০ হাজার টাকা। উন্নত কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসব আবাসিক এলাকার কাছাকাছি থাকায় বাসা ভাড়া বেশি। আবার ফার্ণিচারসহ সুসজ্জিত বাসাও ভাড়া পাওয়া যায়। এসব বাসা ভাড়া মাসিক ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
টিলাগড় এলাকার ভাড়াটে নাজমুন নাহার বলেন, বছরে চারবার ভাড়া বাড়িয়েছেন তার বাড়িওয়ালা। বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে প্রতি ফ্ল্যাটে ৫০০ টাকা করে বাড়ানোর পর হঠাৎ মার্চে ২০০ টাকা বাড়ালেন বিদ্যুতের কথা বলে। আলাদা বিল পরিশোধ করার পরও কেন বাড়া বাড়ানো হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানির মোটর চালাতে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে গেছে। এরপর আবার ১০০ টাকা ভাড়া বাড়ালেন পানির অজুহাতে। একইভাবে জুনে বাজেট ঘোষণার পর তিনি ট্যাক্স, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে বাড়া আরো ৩০০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন।
কুয়ারপার এলাকার ভাড়াটে আবুল কাশেম জানান, গত ৬ বছরে একই বাড়ির ভাড়া ৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৮ হাজার টাকায়। সঙ্গে সার্ভিস চার্জ প্রতি মাসে ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে ৯ হাজার টাকা। রসিদের মাধ্যমে বাড়া আদায় করলেও সিকিউরিটি ও সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন বাড়িওয়ালা।
গবেষণায় দেখা গেছে, নগরীর ৬০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ আয়ের দুই তৃতীয়াংশ বাড়িভাড়ার পেছনে ব্যয় করেন। এর প্রভাব পড়ছে পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর। ভালো বাড়িতে থাকতে গিয়ে সঠিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। বাড়িভাড়া বাড়ানোর কারণে প্রতিঘরে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ছে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়শেন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর নগর গবেষণা কেন্দ্রের জরিপে দেখা গেছে, নগরীর শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যয় করেন বাড়িভাড়া বাবদ। ১৯৯০ সালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ১৯৯১ সালে ২১ দশমিক ৬৫. ’৯২ সালে ১৩ দশমিক ৮৬, ’৯৭ সালে ১৫ দশমিক ৩.’৯৮ সালে ১৫.’৯৯ সালে ১৭ দশমিক ২.২০০০ সালে ১৬ দশমিক ৩, ২০০৫ সালে ২০ দশমিক ২৭ এবং ২০০৬ সালে ২৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল