শুরুতেই অন্তর্ভুক্ত না করতে কর্মসূচি – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

শুরুতেই অন্তর্ভুক্ত না করতে কর্মসূচি

প্রকাশিত: ১১:৩১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

শুরুতেই অন্তর্ভুক্ত না করতে কর্মসূচি

নুরুল ইসলাম
বাড়ছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)’র আয়তন। এই আয়তন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে নানা কর্মসূচি। সিসিকের অন্তর্ভুক্তি না করতে আলোচনা ও স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ইতিমধ্যে পালিত হয়েছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ২৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। ওয়ার্ড রয়েছে ২৭টি। লোকসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। ২০০২ সালে পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর এই কাঠামোর সিলেট মহানগরকে আরও বড় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও গঠন করা হবে।
গত শনিবার সিলেটে বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোচনা হয়েছে। সিলেট-১ (মহানগর-সদর) আসনের সাংসদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, বর্ধিত এলাকার সাংসদ (সিলেট-৩) মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী, সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানসহ শহরতলীর জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনকে পৃথক দুটি প্রস্তাব তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ প্রস্তাব তৈরি হলে চূড়ান্ত পর্যায়ে আলোচনার পর মহানগর বর্ধিত করার কাজ শুরু করা হবে বলে সভায় জানানো হয়।
সিটি করপোরেশন সম্প্রসারিত হলে দক্ষিণ দিকে সিলেট-৩ সংসদীয় আসনের একটি অংশ, উত্তর-পশ্চিম দিকে সিলেট সদর উপজেলার একাংশ মহানগরে অন্তর্ভুক্ত হবে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম। সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, সিলেট শহরতলির ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পরিধি বাড়ানো হলে নগরবাসীকে আরও বেশি নাগরিক সুবিধা ও অধিকতর রাজস্ব আদায় হবে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সভায় তিনি বলেছেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিধি বাড়লে সেবার মানও বাড়বে। আরও বেশি মানুষকে নাগরিক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে অধিকতর রাজস্ব আদায়ও হবে।
সভার শুরুতে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন মহানগর বড় করার প্রাসঙ্গিকতা উত্থাপিত হয়। মহানগর বড় করার প্রস্তাবের সঙ্গে একাত্ম হন সভায় উপস্থিত বরইকান্দি, মোল্লারগাঁও, কুচাই, টুলিটিকর, খাদিমপাড়া ও টুকেরবাজার ইউপি চেয়ারম্যানরা। তাঁরা জানান, ২০০২ সালে সিলেটকে পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার সময় ইউনিয়ন পরিষদ এলাকাকে ভেঙে কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে করে নাগরিক ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এবার মহানগর বড় করার ক্ষেত্রে যেন কোনো ইউনিয়ন এলাকাকে ভাঙা না হয়। অন্তর্ভুক্ত করতে হলে পুরো ইউনিয়নকে মহানগর করার পক্ষে মত দেন তাঁরা।
সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন। মহানগর বড় করার পর নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সিলেট শহর বড় হলে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের সব কটি বড় শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। খুলনা ও রাজশাহীতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থাকলেও আমাদের সিলেটে নেই। শহর বড় হলে এ দাবি আরও জোরালো হবে। তখন আমরা বলতে পারব, সিলেট অনেক বেশি মানুষের শহর, তাই সিলেটেও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১৮৭৮ সালে পৌণে দুই বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল পৌরসভা। ২০০২ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হলে পরিধি বাড়ে। তখন ২৬ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার করা হয় সিটি কর্পোরেশনের আয়তন। সিটি করপোরেশন গঠনের প্রায় দেড় যুগ পর এবার ১৬০ দশমিক ৬২ বর্গকিলোমিটার আয়তনে মহানগর করার প্রাক-প্রাথমিক প্রস্তাব রয়েছে। এটি হলে ২৭টি ওয়ার্ডের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হবে।
সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) এলাকা হওয়ার পর থেকে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ বিষয়ে বিগত বাজেট বক্তৃতায় আমার সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর বড় করার আলোচনাটি সভার মধ্যে স্থান পেয়েছে।
এদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত না করতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ২নং বরইকান্দি ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডবাসীর উদ্যোগে পীরোজপুরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শনিবার ওয়াডের্র মেম্বার মো. জাবেদ আহমদের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২নং বরইকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হাবিব হোসেন। এসময় বক্তারা বলেন, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বরইকান্দি ইউনিয়নের ২৫, ২৬ ও ২৭ নং ওয়ার্ড এলাকা ইতোপূর্বে জনসাধারণের মতের বিরুদ্ধে জোর করে সিটির আওতাভূক্ত করা হয়েছে। সে বছর নির্বাচনে উক্ত ৩ ওয়ার্ডবাসী একটি ভোটও দিতে যায়নি। বরইকান্দি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা অধিগ্রহণ করে এ ইউনিয়নটিকে ধ্বংসের দিকে নেওয়া হয়েছে। এখন আবার সিটি মেয়র সাহেব পাঁয়তারা শুরু করেছেন বরইকান্দির আরো কিছু মৌজা নিয়ে নিতে। তা কখনও ইউনিয়নবাসী মেনে নেবে না। ঐতিহ্যের এ ইউনিয়নবাসী প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবে।
গত সোমবার সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত না করতে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও মেয়রের কাছে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ২নং বরইকান্দি ইউনিয়নবাসী স্মারকলিপি প্রদান করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আসলাম উদ্দিন স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন। পরে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে আরেকটি স্মারকলিপি প্রদান করেন ইউনিয়নবাসী।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছেÑ বরইকান্দি ইউনিয়ন সিলেটের ইতিহ্যবাহী একটি ইউনিয়ন। ইতোমধ্যে এ ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় জোর করে নেওয়া হয়েছে। আবার ও পুরো ইউনিয়নকে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। যা ইউনিয়নবাসী মেনে নিতে রাজি নয়। ইউনিয়নবাসী বরইকান্দি ইউনিয়নেই থাকতে চান।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন- বরইকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হাবিব হোসেন, ২নং ওয়ার্ড মেম্বার ও উপজেলা ইউপি সদস্য ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সদস্য সচিব এহসানুল হক ছানু, ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার শরীফ আহমদ, ৪নং ওয়ার্ড মেম্বার এনাম উদ্দিন, ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার ও প্যানেল চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম মাসুম, ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার লয়লু মিয়া, ৯নং ওয়ার্ড মেম্বার কামাল আহমদ, সংরক্ষিত ওয়ার্ড মেম্বার হুছনে আরা বেগম ও রাজিয়া বেগম, বিশিষ্ট মুরব্বী ও সমাজসেবী মো. নিজাম উদ্দিন, আতাউর রহমান আফরোজ, ফকির পাড়া জামে মসজিদের সাবেক মোতাওয়াল্লি মো. ফরিদ মিয়া, হাবিব উল্লাহ, চান্দাই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল মনসুর, রবীন্দ্র কুমার দেব আশিষ, মাহমদ আলী নিজাম, আনওয়ার উদ্দিন আনা, মোহাম্মদ আলী, মুন্না মিয়া, মো. গৌস আলী, গৌরা দাশ, আব্দুস শহীদ, সামসু মিয়া, কালা মিয়া, আজমল আলী, লুৎফুর রহমান, ফয়জুর রহমান প্রমুখ।
স্মারকলিপি প্রদানকালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসলাম উদ্দিন ও সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী পৃথকভাবে বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সরকারের সিদ্ধান্ত আসবে এবং সীমানা নির্ধারণের অনেক কাজ এখনও বাকি রয়েছে। প্রাথমিক আলাপ আলোচনা গত ১৬ নভেম্বর শুরু হয়েছে। এদিকে ১৭ নভেম্বর রাতে বরইকান্দি ৭নং রোডে সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত না হতে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।