“সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্বনেতা জিয়া” – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

“সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্বনেতা জিয়া”

প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০১৭

“সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্বনেতা জিয়া”

“সফল রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্বনেতা জিয়া” 

১৯-জানুয়ারী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তম এর জন্মদিন| ১৯৩৬ সাল থেকে সময়-শ্রোতের পরিক্রমায় ২০১৭ সালের এই দিন ৮১’তম জন্মদিবসে পরিণত হয়েছে| প্রতিবছরের ন্যায় বিএনপি এবং অঙ্গ-সংগঠন যার যার মত করে সারা দেশব্যাপী নানান কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দিবস টি উদযাপন করেছে| শহীদ জিয়া বেঁচে থাকলে হয়ত দেখতে পারতেন এদেশের কোটি কোটি জনতার হৃদয়ে তাঁর স্ব-মহিমাময় অবস্থান, তাঁর রাজনৈতিক আর্দশের পতাকাবাহী কোটি কোটি জিয়া সৈনিক আজ সারা বাংলাদেশে কিন্তু তাঁর গড়ে যাওয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ আজ একদলীয় বাকশালী হায়নার কবলে পিষ্ট | ভাবতে অবাক লাগে বৈকি, শহীদ হওয়ার তিন দশকের অধিক কাল পরেও শহীদ জিয়া ও তাঁর আদর্শ দেশপ্রেম এবং গণতন্ত্র সুরক্ষার ক্ষেত্রে কী আশ্চর্য বলশালী ও উদ্দীপক ভূমিকা পালন করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরবোজ্জ্বল চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম, তাকে সংরক্ষণ ও শক্তিমান করে তোলার জন্য সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত্তি রচনা—প্রয়োজন ছিল দেশ গঠনের কাজে জনগণের সার্বিক সম্পৃক্ততাবোধের সঞ্চার—প্রয়োজন ছিল নতজানু না হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও সীমান্তে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে সৌভ্রাতৃত্বের হস্ত প্রসারণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তা শুধু যে অনুধাবন ও সংজ্ঞায়িত করেছিলেন তা নয়, সে লক্ষ্যগুলো প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের মানসে তাঁর ছিল আমৃত্যু প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। তাই তো তিনি আজও সকৃতজ্ঞ দেশবাসীর সশ্রদ্ধ স্মরণে। বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ ও জাতির কাছে এমন ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁর প্রিয় গান ছিল, ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ/জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ’। এ গানটি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করত। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে যেন সমগ্র জাতিও এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সেবায় এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে তাঁর পছন্দের এই গভীর দেশপ্রেমের গানটি মনে পড়ে। ইচ্ছা করে জাতির বর্তমান পরম অস্বস্তিকর মুহূর্তে সবাই এককণ্ঠ হয়ে এ গানটিই গাই। বিশ্বের সফল ও বরেণ্য রাষ্ট্রনায়ক অনেকেই রয়েছেন। কিন্তু স্বল্প সময়ের মধ্যে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশ; যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় দোদুল্যমান, তাতে স্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তাকে স্থাপন করে, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুদৃঢ় করে, উন্নয়নের রাজপথে তাকে চলমান করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ছাড়া বিশ্বের ইতিহাসে খুব বেশি কারও আছে বলে আমার জানা নেই। বিস্ময়ের কথা, রাজনীতিতে সে সময় অনভিজ্ঞ এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তা কী অদম্য সাহস, অপরাজেয় মনোবল ও অসীম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে ১৯৭১ সালের অগ্নিজরা মার্চে প্রথম দিয়েছিলেন দিকনির্দেশনামূলক স্বাধীনতার ঘোষণা। তাঁর সে দিনকার ঘোষণার মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্ব শুরু হয়েছিল| মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার জিয়া আবার সফল মুক্তিসংগ্রাম উত্তরকালে মধ্য-সত্তরের চরম বিয়োগান্ত পটভূমে এক অস্থির সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কান্ডারি হয়ে জাতিকে এক বিপর্যয়ের মুখ থেকে রক্ষা করে তাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রথম দিকে ১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার কৃতিত্ব ও সম্ভাবনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করতে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেন। জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave freedom fighter who was the first to declare the independence of Bangladesh.’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা প্রথম দিয়ে তিনি যেভাবে সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর নাম চির সংরক্ষিত থাকবে।’ রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাতের পর ১৯৮১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট আয়োজিত এক সভায় তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কমনওয়েলথের তদানীন্তন মহাসচিব স্যার সিদ্ধার্থ রামফাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়া বাংলাদেশে শুধু একদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠা করেননি; এ উন্নয়নকর্মী দেশকে সার্বিক উন্নয়নের রাজপথে পরিচালিত করেছিলেন।’ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে ‘সার্ক’-এর মাধ্যমে ঐক্যের বন্ধনে গ্রথিত করা ছিল তাঁর এক স্বপ্ন। রাষ্ট্রপতি জিয়ার অকালমৃত্যুতে তাঁর দেশ একজন দক্ষ, সৎ সংগঠক ও সফল রাষ্ট্রনায়ককেই শুধু হারাল না, দক্ষিণ এশিয়া হারাল এক দূরদর্শী স্বাপ্নিক অগ্রপথিককে, উন্নয়নশীল দেশ-গোষ্ঠী হারাল এক সৃষ্টিধর্মী নেতা, কমনওয়েলথ হারাল সৌভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতায় বিশ্বাসী এক মহান ব্যক্তিত্বকে। মার্লবরো হাউসে অনুষ্ঠিত এ সভায় সেক্রেটারি জেনারেল সিদ্ধার্থ রামফালের জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রদত্ত শোকবাণী কী শ্রদ্ধা, কী সম্ভ্রম, কী দুঃখবোধ নিয়ে সমবেত কমনওয়েলথ প্রতিনিধিরা শুনেছিলেন। শোকাহত সে মুহূর্তে সবার উপলব্ধিতে ছিল প্রয়াত জিয়ার প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধাঞ্জলি| মালির সাবেক প্রেসিডেন্ট কোনারে বলেন, বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। উন্নয়নকামী দেশগুলোর অগ্রগতির জন্য তাঁর ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। আল-কুদসের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে করেছিলেন আন্তরিক প্রচেষ্টা। তাঁর তিরোধানে ওআইসি ও এলডিসি দেশগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা হারিয়েছে এক অন্যতম যোগ্য নেতা। প্রেসিডেন্ট কোনারে আরও বললেন, ‘জিয়াউর রহমান স্মরণে আমরা রাজধানীর একটি প্রধান সড়কের নাম করেছি। শহরের প্রশস্ততম রাজপথ কিং ফাহাদ সরণির অব্যবহিত পরেই অ্যাভিনিউ জিয়াউর রহমান। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায়ও রয়েছে জিয়ার নামে আরেকটি স্মরণি| নিজ কর্মগুণে যে কোন বাংলাদেশির অন্তর গর্বে ভরে দিলেন জান্নাতবাসী জিয়া। গিনির সিকু তুরে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভুটানের রাজা ওয়াং চু, আরও বহু নেতার কাছে শহীদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে রয়েছে নানান শ্রদ্ধাঞ্জলির উক্তি। আফ্রো এশিয়া লাতিন আমেরিকার মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, জিয়ার মত স্বজনপ্রীতিমুক্তও দূর্নিতীমুক্ত কঠোর রাস্ট্রনায়ক এর আগে আমি আর কখনও দেখিনি| এসব উক্তি রাষ্ট্রাচারের প্রয়োজন-তাড়িত ছিল না, ছিল অন্তর থেকে উৎসারিত আবেগঘন অভিব্যক্তি। এটা অনস্বীকার্য, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিগৃহীত ও দুর্বল দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যবন্ধন সৃষ্টি করে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে ঐকমত্যের সন্ধান, দুরাচারমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সৎ ও সাধু জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা নিয়ে জাতিকে উজ্জীবিত করা—এসব ছিল জিয়ার লক্ষণীয় প্রচেষ্টা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি বিভ্রান্ত জাতিকে যেন তিনি এক জিয়নকাঠির মায়াবি ছোঁয়ায় আত্মবিশ্বাসী, প্রাণবন্ত ও সক্রিয় করে তুলেছিলেন। আজ যখন দেশে সত্য ও ন্যায় সর্বক্ষণ পরাভূত হচ্ছে প্রলোভন ও পরাক্রমের প্রতিকারহীন অপরাধে, আজ যখন আইনের শাসন হয়ে পড়েছে এক বিস্মৃত প্রায় জীবনধারা, আজ যখন সরকারি কর্মকাণ্ড দুর্নীতির গভীরতম কন্দরে নিমজ্জিত, আজ যখন স্বৈরাচারী কায়দায় গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার সভা-সমাবেশ হচ্ছে নিষিদ্ধ, আজ যখন বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভাবে থমকে আছে—তখন শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়কে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে তাঁর উদ্দীপনাময় নেতৃত্ব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, তাঁর সফল ও সবল রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশ গড়ার তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল না নতজানু ও দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশ্বমঞ্চে তখন আমরা দাঁড়িয়েছিলাম মাথা উঁচু করে। সার্বভৌমত্ব ছিল সুরক্ষিত। আজ যখন আমরা জাতীয় জীবনে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার মুখোমুখি, যখন অর্থনীতি, শিক্ষাঙ্গন ও আইনশৃঙ্খলা বিপর্যস্ত, যখন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা নির্বাসিত, তখন অবশ্যই জিয়াউর রহমান ও তাঁর নেতৃত্বের কথা মনে পড়ে। বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের জন্য সমঝোতামূলক পরিবেশে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নির্ধারিত হোক, এটা আমাদের আশা। রাষ্ট্রপতি জিয়ার সার্থক উত্তরসূরি বর্তমান বিএনপি চেয়ারপার্সন মজলুমের আশ্রয়স্হল সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জননেতা তারেক রহমান প্রয়াত নেতা জিয়াউর রহমানের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংকটাবস্থায় বিরোধী দল ও জাতিকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে উত্তরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই আজ আমাদের ঐকান্তিক কামনা ও বিশ্বাস। সেই সাথে প্রয়োজন জিয়ার দেখানো পথে তাঁর আর্দশের চর্চার মাধ্যমে বিএনপি পরিবারের নেতাকর্মীদের একতা,সততা,দেশপ্রেম-দলপ্রেম|আর তবেই মিলবে মুক্তির পথ ইনশাআল্লাহ |

লেখকঃ- সাবেক ছাত্রনেতা দিদার ইবনে তাহের লস্কর