সমাজকে রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে শিলং তীরের মূলহোতা ফরিদদের রুখতে হবে – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সমাজকে রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে শিলং তীরের মূলহোতা ফরিদদের রুখতে হবে

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮

সমাজকে রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে শিলং তীরের মূলহোতা ফরিদদের রুখতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার
দক্ষিণ সুরমার টেকনিক্যাল রোডের শিলং তীর খেলা নামক জুয়া মারাত্মক আকার ধারন করেছে। খেলাটি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। কেউ বলে তীর খেলা, কেউ বলে শিলং তীর আবার কেউ ডিজিটাল নাম্বার বলে। যে যেই নামে ডাকুক না কেন খেলাটি কিন্তু একই। খেলাটির উৎপত্তি ভারত থেকে। আমাদের দেশের অনেক লোভী কিশোর, ছাত্র, যুবক, বৃদ্ধ এই খেলায় জড়িত। খেলাটি প্রথমত দেশের সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। মফস্বল এলাকাগুলোও বাদ নেই। এমন কি টেকনিক্যাল রোডের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মুদির দোকান, লন্ড্রি, কলোনীসহ সর্বত্র ছড়ি পড়েছে সর্বনাশা শিলং তীর জুয়া। এ সকল জুয়াড়ি মাজারকেও ছাড় দিচ্ছেন না জুয়া খেলা থেকে। প্রকাশ্যে অথবা বাসা-বাড়িসহ যেকোন স্থানে বসে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমু ও এফবি ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে সংগ্রহ করছেন খেলা। দক্ষিণ সুরমার টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সামনে একটি দোকানের তিনটি অংশে চলছে প্রকাশ্যে তীর খেলা। প্রথম অংশে লন্ড্রি, দ্বিতীয় অংশে বসে গল্প গুজব আর তৃতীয় অংশে তীর নামক জুয়া। লন্ড্রি মালিক হচ্ছে ফরিদ মিয়া। তিনি এক সময় লন্ড্রি দোকানে সকালে আসতেন। আর সেই লন্ড্রি দোকানে সারাদিন কাপড় নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এখন আর লন্ড্রিতে গেলে উনাকে পাওয়া যাবে না সবসময়। সমাজকে দেখানোর জন্য একটি ছেলেকে দিয়ে লন্ড্রির ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তিনি শুধু সন্ধ্যার পর এসে ভিতরের রুমে বসে তীর জুয়ার সহযোগিদের নিয়ে হিসেব করেন। ফরিদ বসবাস করেন নগরীর কাজিরবাজার গরু হাট এলাকায়। তার স্ত্রী শিলং তীরে তার চেয়ে বেশি পারদর্শী। বাসায় বসে স্ত্রী মোবাইলের মাধ্যমে তীর খেলা সংগ্রহ করেন। ফরিদ ও তার স্ত্রী মাঠ পর্যায়ে লোকদের কাছে শিলং তীর পৌছাঁনোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে খেলা পরিচালনা করে আসছে। এই এজেন্টরাই লোকদের কাছে টিকিট বিক্রি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত টিকিটটি অনলাইনের মাধ্যমে তীর বোর্ডের কাছে পৌছায়। খেলাটি লোকদের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য দৈনিক দুবার ড্র টানা হয়। সপ্তাহে ৬ দিন খেলাটি চলে শুধু রবিবার বন্ধ থাকে। খেলার আরও নিয়মাবলীর মধ্যে রয়েছে ড্র টানার আধঘন্টা আগে টিকিট জমা দিতে হবে। খেলাতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি নাম্বারে বাজি ধরা যাবে। এছাড়াও একজন জুয়াড়ি একাধিক নাম্বারে বাজি ধরতে পারবে। এই খেলার মাধ্যমে ফরিদ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। যুবসমাজ ধ্বংসকারী এই খেলার মাধ্যমে ফরিদ সমগ্র টেকনিক্যাল রোডে আধিপত্য বিস্তার করছে। আমাদের সমাজের মানুষ বর্তমান সময়ে ভাল-মন্দ, হালাল-হারাম চিন্তা না করে টাকার পিছনে দৌড়ায়। ঠিক এই শিলং তীরকেও অনেকে আয়ের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। এই জুয়ার মাধ্যমে ফরিদ প্রতিনিয়ত সমাজের বিভিন্নস্তরের মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। বারবার আইনশৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান চালিয়ে ভাসমান তীর খেলার সাথে জড়িতদের আটক করলেও ফরিদের মত গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অপরাধ কর্মকান্ড। পুলিশের অভিযানে অনেক সময় নিরপরাধ লোকজন গ্রেফতার হলেও প্রকৃত অপরাধি ফরিদের মত যুবসমাজ ধ্বংসকারী তীর ব্যবসায়ীরা পাড় পেয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ সুরমার টেকনিক্যাল রোড, জিঞ্জির শাহ মাজার, মিন্টুর চায়ের দোকান, সাধুরবাজার এলাকার নদীরপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে শিলং তীর খেলা পরিচালনা করছে ফরিদ। সন্ধ্যার পর ব্যবসায়ীদের মত বিকাশে অথবা লোক পাঠিয়ে সংগ্রহ করেন টাকা। তীর খেলার নিয়মানুযায়ী যদি একজন জুয়াড়ি ১০ টাকার বাজি জেতেন তিনি পাবেন ৭০০ টাকা, যদি ১০০ টাকার বাজি জেতেন তিনি পাবেন ৭০০০ টাকা, যদি ১০ লাখ টাকার বাজি জেতেন পাবেন ৭০ কোটি টাকা। কম টাকায় পরিশ্রম ছাড়াই আয়ের অঙ্কটা অনেক বেশী। এবার ক্ষতির হিসাবটায় আসি। একটি উদাহরন দিচ্ছি মন দিয়ে পড়বেন : খেলার নিয়ম অনুযায়ী ০০ থেকে ৯৯ অর্থাৎ ১০০টি নাম্বারে জুয়াড়িরা খেলবে। ০০ থেকে ৯৯ সবকটি নাম্বার জুয়াড়িদের দেওয়া হবে। এর মধ্যে একটি নাম্বার ড্রতে বাছাই করা হবে। এই বাছাইকৃত ড্রতে যার নাম্বার আসবে তিনি হবেন বিজয়ী তিনিই শুধু পাবেন ৭০০ টাকা। এই ১০০ টি নাম্বার যদি এক এক জনকে একটি করে দেওয়া হয় ১০ টাকা দামে তবে ১০০*১০ = ১০০০ টাকা। ১০০০ টাকার মধ্যে বিজয়ীকে ৭০০ টাকা দেয়ার পর তীর বোর্ডের লাভ ৩০০ টাকা। বড় অঙ্কের একটি হিসাব করি। ১০ লাখ করে এক এক জনকে যদি ১০০ নাম্বার দেয়া হয় তবে ১০ লাখ * ১০০ = ১০০ কোটি টাকা। এবার ১০০ নাম্বারের মধ্যে একজন বিজয়ীকে যদি ৭০ কোটি টাকা দেওয়া হয় তবে তীর বোর্ডের লাভ ৩০ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের হয়ত কেউ খেলবে না তারপরও উদাহরণ দিলাম। এবার চিন্তা করুন লাভ মূলত কার। যারা খেলছেন তাদের নাকি তীর বোর্ডের। একজন জুয়াড়ি বহুবার খেলে হয়ত ৫ হাজার, ১০ হাজার টাকা পেলেন। কিন্তু তিনি কখন চিন্তা করেছেন কি কত টাকা খেলার পর এই সামান্য টাকা পেলেন ? আবার এই টাকা দিয়ে যে আবার খেলছেন আর কখন পাবেন এর নিশ্চয়তা আছে কি ? তীর নামক এই জুয়া খেলাটি কখনই একজন লোককে লাভের দ্ধারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারবে না এটা নিশ্চিত বলা যেতে পারে। এই খেলাটি যিনি খেলছেন তিনিই যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তেমনি দেশও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আমাদের দেশের আইনত এটি বৈধ নয়। এর ফলে বাড়ছে কিশোর অপরাধ। পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে অনেক ছাত্রের। বাড়ছে যুবকের বেকারত্ব। নেমে আসবে পরিবারে অভাবের দূর্ভোগ। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এছাড়া বিভিন্ন সময় হানাহানি একে কেন্দ্র করে মারামারিও হয়ে থাকে। আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এই জুয়াটি বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। পুলিশের ক্রমাগত অভিযানে গ্রেফতারের পরও থামছে না তীর শিলং জুয়া খেলা। যদি ফরিদের মত প্রভাবশালী তীর ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় না আনা হয় তা হলে কোনভাবে তা থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন স্থানীয়রা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে এই খেলার পেছনে স্থানীয় বিত্তবান কিছু ব্যক্তিবর্গের হাত ফরিদের মত ব্যাক্তিদের মাথার উপর রয়েছে। এর মধ্যে মুখোশদারি কিছু রাজনৈতিক নেতাও জড়িত। তাছাড়া কিছু অসৎ লোকের জন্য আইনের ক্রুটিও রয়েছে। এদের প্রতিহত করতে স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। গভীরভাবে চিন্তা করুন শিলং তীর খেলাটি আমাদের যুবসমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তাদের রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধভাবে ফরিদদের রুখতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল