সম্প্রীতির অটুট বন্ধন গড়ে তুলে : কমলগঞ্জে মুসলিম বাড়িতে ১০ বছর ধরে বসবাস হিন্দু পরিবারের

প্রকাশিত: ৫:১৬ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০

সম্প্রীতির অটুট বন্ধন গড়ে তুলে : কমলগঞ্জে মুসলিম বাড়িতে ১০ বছর ধরে বসবাস হিন্দু পরিবারের

সালাহ্উদ্দিন শুভ,কমলগঞ্জ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মুন্সীবাজার ইউনিয়নের লক্ষীপুর এলাকার বাসিন্দা ক্ষিতিশ দেবনাথ । পরিবার নিয়ে থাকতেন তার শ্বশুর বাড়ি। নিজের বসতভিটে হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে ক্ষিতিশ দেবনাথ স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কাজের সন্ধানে আসেন কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ভেড়াছড়া গ্রামে । আত্ম সম্মানের কারণে শ্বশুর বাড়ি আশ্রয় না নিয়ে ভেড়াছড়া গ্রামে কাজ ও আশ্রয় চাইলে তাকে সাহায্য করতে আসেননি তখন এগিয়ে আসেন এই ভেড়াছড়া গ্রামের নজরুল ইসলাম । তখন নজরুল ইসলাম ধর্ম ভুলে গিয়ে মানুষ হিসেবে স্ত্রী সন্তানসহ ক্ষিতিশ দেবনাথকে তার টিন শেডের বাড়িতে আশ্রয় দেন।
নজরুল ইসলাম ক্ষিতিশ দেবনাথের সাথে তখন বন্ধুত্ব গড়ে তুলে নিজের একই বসতঘরে বাস করার কথা বলেন। সম্ভব হলে ধীরে ধীরে আলাদা ঘর নির্মাণ করে এই বাড়িতে বসবাস করার কথা তিনি জানান। সেই থেকে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নজরুল ইসলাম সম্প্রীতির অটুট বন্ধ গড়ে তুলে ক্ষিতিশ দেবনাথকে নিয়ে একই বাড়িতে বসবাস করছেন। একই বাড়িতে নজরুল ইসলাম মুসলিম হিসেবে তার ধর্ম পালন করছেন, নামাজ থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রার্থনা করেন। আবার ক্ষিতিশ দেবনাথের পরিবারও আলাদাভাবে হিন্দু ধমীয় উপাসনাও আচার অনুষ্ঠান করছেন। তাতে কারো কোন সমস্যা হচ্ছে না বলেও জানা যায়।
সম্প্রতি ভেড়াছড়া গ্রামে নজরুর ইসলামের বাড়িতে গেলে ক্ষিতিশ দেবনাথের স্ত্রী অঞ্জলী দেবনাথ বলেন, তারা ১০ বছর ধরে এ বাড়িতে মুসলিম পরিবারের সাতে বসবাস করছেন। ধর্মীয় উপাসনাসহ সকল প্রকার আচার অনুষ্ঠান করলেও কোন সমস্যা হচ্ছে না। ক্ষিতিশ দেবনাথ পাহাড়ে ও গ্রামে দিন মজুরের কাজ করে যে আয় করে সংসার চালান। এ আয় দিয়ে সংসার পরিচালনার সাথে ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া করাচ্ছেন। স্বামী যে স্বল্প আয় করেন তা থেকে সঞ্চয় করার মত কিছু থাকে না বলে গত ১০ বছরেও নিজের মাথা গোছার ঠাই করার মত এক টুকরো জমি কিনতে পারেননি।
যতদিন না নিজের জমি কেনা হয় ততদিন পর্যন্ত এ বাড়িতে তারা বসবাস করবেন বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন এক বাড়িতে হিন্দু মুসলিম দুই পরিবার মিলে বসবাস করছেন। নেই কোন ঝগড়া-বিবাদ। দুই ধর্মের দুই পরিবারের মাঝে যে সম্প্রীতির সৃষ্টি হয়েছে সেটি আজীবন ধরে রাখতে তারা চান। একই সৃষ্টি কর্তার এক পরিবার আল্লাহর প্রার্থনা করছেন আর অন্য পরিবার ভগবানের প্রার্থনা করছেন। বাহির থেকে কেউ হঠাৎ সে বাড়িতে গেলে বুঝতেই পারেন না যে এক বাড়িতে দুই ধর্মের দই্ ুপরিবারের বসবাস রয়েছে। গ্রামবাসীও এ সম্প্রীতিকে মেনে নিয়েছে বলে গ্রাম থেকে কোন সমস্যা হয়নি গত ১০ বছরেও। গ্রামবাসী অসাম্প্রদায়িকতার মেল বন্ধন হিসেবে তা মেনে নিয়েছেন।
বাড়ির মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, একটি অসহায় পরিবার কাজ ও বসবাসের জায়গা খোঁজতে এসে বিপদে পড়েছিল। কোথাও কোন ঠাই পায়নি। তখন তার বিপদ দেখে মানবিকতার তাড়নায় অবশেষে হিন্দু পরিবারটিকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। মিলে মিশে বসবাস করায় কিভাবে যে ১০টি বছর চলে গেছে তা তিনি বুঝতেও পারেননি। আর এই ১০ বছরে দুই ধর্মের দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেন আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা আর ভেঙ্গে যাবার মত নয়। তাই তার বাবা শফিক আলী ও ক্ষিতিশ দেবনাথকে নিজের ছেলে ভেবে নিয়েছেন।
বৃদ্ধ শফিক আলী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, তার ছেলে যে কাজটি করেছে তা ভেবে তিনি গর্ব বোধ করেন। তার ছেলের পরিবারের ধর্ম-কর্ম করতে কোন সমস্যা হয় না। এমনি ক্ষিতিশের পরিবারের ধর্ম-কর্ম করতে কোন সমস্যা হয়নি ১০ বছরে। আগামীতেও হবে না। ছেলের এ কাজটি সমাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে বৃদ্ধ বাবা মনে করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল