সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা

প্রকাশিত: ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২২

সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা

সরকারের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা

মো. আব্দুল ওদুদ

পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিরাট স্বপ্ন। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর তিনি এ স্বপ্ন দেখেন এবং সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। মেয়াদকালের শেষ দিকে ৪ জুলাই ২০০১ইং তিনি পদ্মা নদীর মাওয়া প্রান্তে এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৯ সালে দেশের শাসনভার গ্রহণের পর পদ্মাসেতুর জন্য জমি অধিগ্রহণ, ডিজাইন প্রণয়ন, পুনর্বাসন এলাকার উন্নয়নসহ আনুষাঙ্গিক কাজ ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করে। প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও প্যানেল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজাইন প্রণয়ন, প্রিকোয়ালিফিকেশন টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরী ও টেন্ডার আহ্বান, টেন্ডার মূল্যায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক কাজ সমাপ্তির পর্যায়ে সরকার বিরোধী বিশেষ মহলের ষড়যন্ত্রে পদ্মা সেতুর কাজ স্থগিত হয়ে যায়। বিশ্ব ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগিরা পদ্মা সেতুর প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংক সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব সহ অনেকের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের ঋণ প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে ২০১৪ সালে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ২০১৭ সালে কানাডার সুপ্রিরিয়র কোর্ট দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ভিত্তিহীন, গুজব, শোনা কথা ইত্যাদি বলে মামলার আসামীদের অব্যাহতি দেন। দেশী বিদেশী মিডিয়ার অপপ্রচার, সুশীল সমাজ ও দেশের এক শ্রেণির মানুষের সন্দেহ ও সমালোচনা সরকার ও অভিযুক্তদেরকে বিব্রত করে তোলে। অবশেষে সরকার কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশ তার আর্থিক সামর্থ্য প্রমাণ করতে পেরেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত, সারা বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা ও সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কৃষির আধুনিকায়ন, নতুন উদ্ভাবন, সারের ব্যবহার এবং প্রতি বৎসর কোটি কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকি দেওয়ার ফলে শস্য উৎপাদন, শাক, সবজি, মাছ ও গবাদি পশু উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পন্ন হয়। ধান, সবজি, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে ৫ম স্থানের মধ্যে অবস্থান করে। শিল্পে উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ব্যবস্থা নিশ্চয়তা ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতার আসায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশেষ গুরুত্ব দেন। সেজন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের শুরু থেকে ১৫ বছরের কর মওকুফ করা হয়েছে। কারখানা, শিল্প স্থাপনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, নির্মাণ সামগ্রী ও কাচামাল আমদানিতে শুল্ক কর মওকুফ করা হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দেশ স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছে। এখন সারাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। শিল্প ও অন্যান্য কাজে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত গ্যাস আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। কর অব্যাহতিসহ গ্যাস সরবরাহে আওয়ামী লীগ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে অনেক রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকাময়মনসিংহ, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদুর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার বা তদুর্ধ্ব লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এছাড়া সমগ্র দেশের গ্রাম এলাকায় পাকা সড়ক নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, উপজেলা কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, সাইক্লোন শেল্টার ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পৌর সভা ও হাট বাজার উন্নয়নের ফলে নাগরিকরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ কার্যক্রম সফলতার সহিত দ্রুততার সাথে অগ্রসর হচ্ছে। এ প্রকল্পে মডেল মসজিদগুলোর জন্য প্রত্যেক জেলা পর্যায়ে চারতলা বিশিষ্ট এবং প্রত্যেক উপজেলায় তিন তলা বিশিষ্ট শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মিত হবে। এতে নারীদের জন্য নামাজের আলাদা কক্ষ থাকবে। দেশের ৬৪ জেলার ৪০৬টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ৩৩টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ চলছে। সর্বমোট ৪৭০টি উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হবে এবং ১৬৪টি স্মৃতিসৌধ ও ২৩টি জাদুঘর দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে।
জাপানের সহায়তায় মেঘনা-গোমতি নদীর ওপর আগের সেতুর তুলনায় প্রশস্থ আরও একটি নতুন সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন গঠানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদীর উপর অসংখ্যা সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে ইটনা-মিঠামইন-অস্টগ্রাম ৪০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। হাওরের পানি চলাচলে যাতে বাধা না ঘটে সেজন্য এ সড়কে অসংখ্য ব্রিজ কালভার্ট স্থাপিত হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকারের আগ্রহ সাহস সদিচ্ছা প্রশংসনীয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের বৈদেশিক নীতির ফলে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ একটি উদীয়মান মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। ভারত, চীনসহ প্রতিবেশী উন্নত অনুন্নত সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ সুসম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সাথেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে। মিয়ানমার থেকে অত্যাচারিত হয়ে বিতাড়িত বাস্তচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এবং আওয়ামী লীগ সরকার সারা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আমাদের দেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সভায় বিশ্ব পরিবেশ রক্ষার জন্য মানবতার পক্ষে অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্পদের প্রতি সভায় সমান অধিকারের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসব বক্তব্য সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়। এতে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা ও অকল্পনীয় সফলতা সারা বিশ্বে জাগরণ সৃষ্টি করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল লক্ষ্য হল ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করা। সে লক্ষ্যে সব ধরণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে। অসৎ কিছু লোকের খারাপ কাজের জন্য দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। অবৈধ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচুর পরিমাণ টাকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। অতিলোভী ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে বৈধ ও অবৈধভাবে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছেন না। দেশে ঋণ খেলাপির সংখ্যা প্রায় ১৭ লক্ষ ৪০ হাজার। সরকার ঋণ আদায়ে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের কারণে দেশে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সরকার খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজনে নতুন আইন করে বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি আমাদের দেশের অগ্রগতিতে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সবদিক বিবেচনায় রেখে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের দিক থেকে সম্পূর্ণ সফল।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কলামিস্ট।

সুত্র : দৈনিক সিলেটের ডাক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল