সার্বভৌম ফিলিস্তিন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা – এড. আনসার খান – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সার্বভৌম ফিলিস্তিন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা – এড. আনসার খান

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২১

সার্বভৌম ফিলিস্তিন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা – এড. আনসার খান

এড. আনসার খান :: শতাব্দী প্রাচীন রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট গোটা বিশ্বের জন্য বিপদজনক হয়ে আছে-এটি বলার অপেক্ষা রাখে না।তবে সবচেয়ে ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনি মুসলিম  জনগোষ্ঠী। ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী তাদের স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে চলেছেন পঞ্চাশের দশক থেকেই।সার্বভৌম রাষ্ট্র এখনো অধরাই।তবে রক্তাক্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট,মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ আরব ও মুসলমান রাষ্ট্রের ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্হাপন করা,ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠা এবং সর্বোপরি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি ও মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে স্বাধীনতার সংগ্রামে শিথিলতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে-ফিলিস্তিন কী আদতেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে,ফিলিস্তিন কী সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারবে? পূর্বাপর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন-ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব সামরিক শক্তি প্রয়োগে সমাধান করা সম্ভব হবার নয়।বিশেষজ্ঞদের অভিমত-ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পরাশক্তি।Barr-IIan বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর তুলনামূলক ব্যাখ্যা করে এগুলোর অসমতার বিষয়টি তুলে আনা হয়েছে। গবেষণায় দেখানো হয়েছে-ইসরায়েলের মাথাপিছু আয় মিসরের চেয়ে দশ গুণ বড়।ইরানের চেয়ে আট গুণ,লেবাননের তুলনায় ছয় গুণ এবং সৌদি আরবের চেয়ে দ্বিগুণ বড়।
  ইসরায়েল একটি শিল্প ও তথ্য যুগের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,কম্পিউটার সাহায্যকৃত নকশা,বিমান চলাচল এবং বায়োটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রগুলোতে শ্রেষ্ঠ।দেশটি তার মোট জিডিপির ৫-শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে-যা ওই অঞ্চলের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। সামরিক প্রতিরক্ষার দিক থেকেও ইসরায়েল তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে। ১৯৬৭-সালে মাত্র ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল সম্মিলিত আরব বাহিনীকে পরাজিত করে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিলো।
ওই অঞ্চলের শক্তিশালী ইসলামি রাষ্ট্র ইরানের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট অনেক বড় এবং বিমান শক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিমাণগত এবং গুণগত-উভয় ক্ষেত্রেই ইসরায়েল অগ্রগণ্য।অর্থাৎ ওই অঞ্চলে ইসরায়েল সামরিক প্রতিরক্ষায় শক্তিশালী এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলই একমাত্র দেশ যার পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে একশোরও বেশি।
 ইসরায়েল একটি শক্তিশালী,ধনী ও নিরাপদ জাতি-প্রায় পাঁচ মিলিয়ন ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার না দিয়ে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে  জোরজবরদস্তিমূলক ভাবে শাসন করে আসছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা শক্তিতে ইসরায়েলের নিকট অতি নগণ্য।ফিলিস্তিনের সমর্থক মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোও ইসরায়েলের চেয়ে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল।এছাড়াও অনেক আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের দিক থেকে মূখ ফিরিয়ে নিয়ে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্হাপন করেছে।অন্যান্য আরব ও মুসলমান রাষ্ট্রগুলো পূর্বতনদের অনুগামী হতে পারে।ইসরায়েলের শক্তিশালী বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি উক্ত দেশগুলোকে আকৃষ্ট করেছে।গত দুই দশকে দেশগুলোর সাথে বানিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক তাই বেড়েই চলেছে।ভারত,রাশিয়ার মতো দেশগুলো একসময় ইসরায়েল থেকে দূরে থাকলেও এখন ওই দেশগুলোও ইসরায়েলের কাছাকাছি এসেছে।
ইসরায়েলের তুলনায় ফিলিস্তিনিরা সকল ক্ষেত্রেই নগণ্য।তাসত্বেও এটি বলা সঙ্গত যে,ফিলিস্তিনিরা অদম্য সাহসী।১৯৪৭-সালের পর থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্রে সজ্জিত সশস্ত্রবাহিনীর সাথে লড়াই করে চলেছে এবং রক্ত ঝরাচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে,প্রতি একজন ইসরায়েলির বিপরীতে কুড়ি থেকে ত্রিশজন ফিলিস্তিনি- ইসরায়েলিদের দ্বারা মারা যাচ্ছে।কিন্তু ফিলিস্তিনিরা দমে যায়নি।
তবে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের তুলনায় একদম দূর্বল,অন্যদিকে রাজনৈতিক ভাবেও ফিলিস্তিনিরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে।আরাফাতের মতো একক কোনো নেতা নেই ফিলিস্তিনিদের। যেমন-গাজায় নেতৃত্ব দিচ্ছে উগ্রবাদী সংগঠন হামাস।ওই সংগঠন মিসর,সৌদি আরব ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলোর নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।পশ্চিম তীরে নেতৃত্ব দিচ্ছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ(পিএ)ও পিএলও এর নেতা মাহমুদ আব্বাস-যিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ফিলিস্তিনি শাসক।তাই ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তাদের নেতৃত্ব গভীরভাবে বিভক্ত।এই বিভক্ত নেতৃত্ব দ্বারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জনের সূযোগ কতটুকু আছে-সেটি মূখ্য প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।কারণ-ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে পড়ায় সর্বজনীন-“পিএল” তার প্রতিনিধিত্বের মর্যাদা হারিয়েছে।এটি বিশ্বস্ততা এবং প্রবলভাবে ফিলিস্তিনি জাতীয় অনূভুতির বিস্তৃত বর্ণালীকে উপস্থাপন,নিজস্ব অভ্যন্তরীণ থেকে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হিসেবে এবং বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতির কারণ হিসেবে পূণরায় এককভাবে উপস্থাপন করার মতো সাফল্য ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না,যেমনটি আরাফাত করেছিলেন।
বর্তমান পিএলও নেতৃত্বের সাফল্যের উপাদানগুলোর কোনোটিই স্পষ্ট নয়।জাতিসংঘের”পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র”এর মর্যাদার স্বীকৃতি পেলেও দেশের স্হল পরিস্থিতির কোনো বাস্তব উন্নতি হয়নি।বরং আরাফাতের উত্তরসূরী হিসেবে মাহমুদ আব্বাসের বৈধতা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো। জাতিসংঘ,যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের একটি স্হায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং এই লক্ষ অর্জনে বিভিন্ন সময়ে নানা ফরমুলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।কিন্তু শান্তি আলোচনার ধারণাকে আমলে নেয়নি ফিলিস্তিনিরা,বরং তাদের মধ্যে নিন্দা,গভীর অবিশ্বাস এবং উদাসীনতার জন্ম দিয়েছে।আব্বাস প্রশাসন ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা,সার্বভৌমত্ব,ইসরায়েলি আক্রমণ ও বসতি স্হাপন বা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বর্বরতা বন্ধ করতে পারেনি।
একসময় জাতিসংঘ যুদ্ধ নয়,আলোচনার মাধ্যমে  দ্বন্দ্বের অবসানের জন্য দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ফরমুলা দিয়েছিলো এবং কেউ কেউ এক-রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের ফরমুলাও দিয়েছেন।যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সমাধানের ফরমুলা দেওয়া হয়েছিলো।
বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন-দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান আর সম্ভব নয়।তবে অন্য অনেকে মনে করেন-দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান এখনও সর্বোত্তম সম্ভাব্য বিকল্প।
“এক-রাষ্ট্রীয় সমাধান”-এর লক্ষ হলো বিদ্যমান ইসরায়েলি ভূ-খণ্ড,ফিলিস্তিনি অধিভুক্ত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাকে একীভূত করে একক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা,যেখানে আরব,অনারব ও ইহুদিদের সমানাধিকার নিশ্চিত করা হবে।এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে তথায় আরব জনসংখ্যা ইহুদি জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হবে বিধায় ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অবসান ঘটবে।
প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর নোয়াম চমস্কি বলেন-” ইহুদি সংখ্যালঘুদের সাথে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে ইসরায়েলের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সম্মত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এক-রাষ্ট্রীয় রাজ্যের সম্ভাবনা কম।কারণ-ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব দুটি স্বতন্ত্র জাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব-যা ওই দুটি জাতিকে মৌলিক ভাবে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত করেছে এবং তারা কীভাবে শাসিত হতে চায় সে ব্যাপারেও তাদের নিজস্ব ভিন্ন ধারণা রয়েছে।বিশেষকরে-“ইহুদিরা জিউস রাষ্ট্র এবং মুসলমানরা মুসলিম রাষ্ট্র”- প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করে চলেছে।  কাজেই এমন ভিন্ন চিন্তাধারার দুটি জাতিকে একত্রিত করে এক-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ফল ভালো হতে পারে না বরং ভবিষ্যতে উভয় জাতিকে আরও বেশি সহিংস করে তুলবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিতে ফিলিস্তিনিদের বিশ্বাস নেই বললেই চলে।যে পরিমাণে ফাতাহ,পিএলও,পিএ দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের জন্য নিবেদিত হয়েছে,তাদের ব্যর্থতা-স্বাধীনতা থেকে শাসন পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যটির আকাঙ্খা বা কার্যকারিতার জন্য জনগণের সমর্থন হারিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবেশ-পরিস্হিতি,আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর,চীন,ভারত ও রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্টভাবে পরিবর্তিত হয়েছে-বরং ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে। হামাসের সাথে ফাতাহর চলমান দ্বন্দ্ব(হামাস একটি ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠন,গাজায় একটি ইসলামপন্হী শাসন পরিচালনা করছে এবং এটি বিশ্বাস করে যুদ্ধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।কিন্তু মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ সংগঠন ধর্ম নিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী এবং আলোচনার টেবিলে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট সমাধানের পক্ষপাতি),গাজা ও পশ্চিম তীরের অস্থিরতা,পিএ-এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা,একক ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ইত্যাদি সবকিছু মিলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম আরো দূর্বল হচ্ছে।ফলে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন জাতীয় আন্দোলন ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।এতে করে-ওই অঞ্চলটি অগ্নিতে জ্বলতে পারে।সংঘর্ষের সমস্ত মৌলিক উপাদানগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে একটি ব্যাপক বিস্তৃত আলোচনার সমাধানের ধারণাটি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরাশক্তি হওয়ার প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন-ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সামরিক শক্তি প্রয়োগে সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।তবে এটিও বলা অসঙ্গত হবে না যে-ইসরায়েল-ফিলিস্তিন এমন একটি যুদ্ধ-যেটি ইসরায়েল জিততে পারে না।শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণের বিজয় অনিবার্য-কারণ এটি যে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।