সালতামামি-২০১৯: আইসিটি খাতে রফতানি এক বিলিয়ন ডলার – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সালতামামি-২০১৯: আইসিটি খাতে রফতানি এক বিলিয়ন ডলার

প্রকাশিত: ৮:২২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯

সালতামামি-২০১৯: আইসিটি খাতে রফতানি এক বিলিয়ন ডলার

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক:
দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত আলোচিত খাতগুলোর একটি। স্বাভাবিক কারণেই বছরের শেষ প্রান্তে এসে চলছে এই খাতের হিসাব নিকাশ। সফলতা আর ব্যর্থতা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। খাত সংশ্লিষ্টরা অবশ্য সফলতার পাল্লাই ভারি বলে দাবি করছেন।তারা বলছেন, এ বছরের অন্যতম বড় অর্জন আইসিটি পণ্যের বৈদেশিক রফতানি কমপক্ষে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা)। এছাড়া এ বছর দেশের আইসিটি খাতসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।

আইসিটি খাতের রফতানি এক বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘এ বছর আমাদের দেশ থেকে বহির্বিশ্বে কমপক্ষে এক বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের আইসিটি পণ্য ও সেবা রফতানি হয়েছে। একইসঙ্গে এ বছরের আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে, রফতানিকারকদের জন্য সরকারের ১০ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা।

ই-কমার্সে ভ্যাট এবং ক্রেডিট কার্ড জটিলতা
ব্যবসা বাণিজ্যের বিষয় হলেও ই-কমার্স পুরোপুরি নির্ভরশীল আইসিটি খাতের ওপর। তাই ই-কমার্সে কেনাকাটায় অতিরিক্ত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয় ই-কমার্স ব্যবসায়ী এবং গ্রাহকদের। তবে শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা এবং সেবার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ কিছুটা স্বস্তি দেয়।

অন্যদিকে ক্যাসিনো কাণ্ডের পর দেশ থেকে আন্তর্জাতিক কোন লেনদেনে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েন আইসিটি খাত সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত সেটিও উঠিয়ে নেওয়া হয়। অবশ্য অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো কার্যক্রমও নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে এ বছর। গ্রেফতার করা হয় অনলাইন জুয়ার মূল হোতা সেলিম প্রধানকে।

পাবজি, টিকটক ও ফেসবুক
সোশ্যাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল গেমিংয়েও ২০১৯ সাল ছিল আলোচনায় ভরা। স্মার্টফোনভিত্তিক বিতর্কিত গেম পাবজি এবং ভিডিও কনটেন্ট শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক নিয়ে সরকারের তৎপরতা ছিল। বন্ধ করে আবার আবার খুলে দেওয়া হয় পাবজি। আর বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়নি টিকটক।

অন্যদিকে এবার সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশে আসে ফেসবুকের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। তারা মতবিনিময় করেন দেশীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও। তবে বাংলাদেশে এখনই কোন কার্যালয় চালু করার পরিকল্পনা ফেসবুকের নেই বলে তারা জানিয়ে দেন। তবে বাংলাদেশের জন্য একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে বলে জানান তারা। চলতি সপ্তাহেই সেই প্রতিনিধি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ফেসবুকের সিঙ্গাপুর কার্যালয় থেকে।

এক্সপো এবং আয়োজন
আইসিটি খাত নিয়ে এ বছর বেশ কয়েকটি সফল এক্সপো এবং প্রতিযোগিতার আয়োজন হয় বাংলাদেশে। তার মধ্যে সর্ববৃহত আয়োজন ছিল ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০১৯। ছিল তিন দিনব্যাপী বেসিস সফটএক্সপো। ছিল বিপিও সামিট। অনুষ্ঠিত হয় বেসিস ন্যাশনাল আইসিটি অ্যাওয়ার্ড এবং নাসা স্পেস অ্যাপ চ্যালেঞ্জের বাংলাদেশ পর্বও।

রাইড শেয়ারিং নীতিমালা
এ বছরই রাইড শেয়ারিং নীতিমালার আলোকে নিবন্ধন নিতে শুরু করে রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো। সর্বপ্রথম পাঠাও নিজেদের নিবন্ধন নিশ্চিত করে। সরকার এবং রাইড শেয়ারিং খাত সংশ্লিষ্টদের আশা, এর মাধ্যমে সুশৃঙ্খল উপায়ে এই খাতটি পরিচালিত হবে।

স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড কোম্পানি অনুমোদন
দেশীয় উদ্যোক্তা এবং স্টার্টাপদের সহায়তা করতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেয় সরকার। এ লক্ষ্যে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড কোম্পানির। এছাড়া সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

র‌্যাম- মেইড ইন বাংলাদেশ
তথ্য প্রযুক্তি খাতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে প্রযুক্তি পণ্য দেশেই তৈরির দিকে আগ্রহ বাড়াতে কাজ করছে সরকার। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এরইমধ্যে দেশি বিদেশি কয়েকটি মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে চমকপ্রদ খবর ছিল, দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনের র‌্যাম তৈরি করা। শিগগিরই ওয়ালটনের কম্পিউটার এবং ল্যাপটপের সঙ্গে বাজারজাত হবে বাংলাদেশে তৈরি হওয়া র‌্যাম।

পদক ও সম্মাননা
২০১৯ সালে বেশকিছু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দারুণ সফলতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এগুলোর মধ্যে শুরুতেই বলতে হয় এশিয়া প্যাসিফিক আইসিটি অ্যাওয়ার্ড (অ্যাপিকটা)-২০১৯ এর কথা। ভিয়েতনামের হা লং এ ১৯তম আসরে সর্বাধিক ৮টি পদক অর্জন করে বাংলাদেশ। তিনটি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন এবং পাঁচটি ক্যাটাগরিতে মেরিট স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক অর্জন করে বাংলাদেশ। মাত্র দ্বিতীয়বারের অংশগ্রহণে একটি ক্যাটাগরিতে স্বর্ণ, দুইটি সিলভার, ছয়টি ব্রোঞ্জ এবং একটি টেকনিক্যাল পদে মোট ১০টি পদক পায় বাংলাদেশ।

তবে এতকিছুর মধ্যে ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হয়ে থাকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ‘অলিক’। নাসা স্পেস অ্যাপ চ্যালেঞ্জে চ্যাম্পিয়ান হয়ে এবং নাসার আমন্ত্রণ পেয়েও ভিসা জটিলতায় মার্কিন মুল্লুকে পা রাখা হয়নি টিম অলিক সদস্যদের। তবে সুখবর আছে আরও একদিকে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক ‘ডব্লিউএসআইএস পুরস্কার-২০১৯’ (দ্য সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি) এ একটি উইনার এবং ৮টি চ্যাম্পিয়নশিপ পুরস্কার জিতেছে বাংলাদেশ। এ খাতে বিশেষ অবদান রাখায় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এ পুরস্কার পায় বাংলাদেশ।

এছাড়া দেশে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র এবং আইসিটিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ অর্জন করেছে ‘উইটসা গ্লোবাল আইসিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৯’। অ্যাওয়ার্ড এর পাঁচটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে গৌরবজ্জ্বল সম্মাননা ‘চেয়ারম্যান অ্যাওয়ার্ডস’ পেয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।

গুগলের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হলেন বাংলাদেশের জাহিদ
জাতীয় বা দলগত অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তি অর্জনেও বেশ ভালো ছিল ২০১৯। এ বছর গুগলের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার (পরিচালক) হিসেবে পদোন্নতি পান বাংলাদেশের জাহিদ সবুর। সবুরের মতো তরুণদের অনুপ্রেরণাতেই হয়তো আইসিটি খাতে বাংলাদেশের কিশোররাও দেখিয়েছেন দারুণ কিছু কীর্তি। স্কুল শিক্ষার্থী ওয়াসিক ফারহান রূপকথার তৈরি স্মার্টফোনভিত্তিক গেম ‘ডিফেন্ডার অফ দ্য আর্থ’ গুগল প্লে স্টোরে সর্বাধিকবার ডাউনলোডের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে বেশ লম্বা সময়।

এসব কিছুর বাইরে দেশের প্রথম ইনকিউবেশন সেন্টার চালু, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে প্রতি মেগাবাইটে ১৮০ টাকা নির্ধারণ, জাতীয় পরিচয় পত্র যাচাইয়ের গেটওয়ে ‘পরিচয়’ চালু, ফ্রিল্যান্সারদের পরিচয় দিতে ‘ফ্রি আইডি’, বাংলাদেশ জাপান আইসিটি ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং প্রোগ্রামের আওতায় দেশীয় তরুণদের জাপানে প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান হওয়ার মতো সফলতা এ বছর আইসিটি খাতের শুভ সংবাদগুলোর মাঝে ছিল অন্যতম।

যা বলছেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী
২০১৯ সালকে দেশের আইসিটি খাতের জন্য ব্যাপক সাফল্যময় একটি বছর হিসেবে দাবি করেছেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বাংলানিউজকে পলক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে রূপকল্প সেটি বাস্তবায়ন শেষ করার সুযোগ দেশের জনগণ এবার আমাদের দিয়েছেন, আবারও সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার চারটি মূল স্তম্ভ আছে আমাদের- মানবসম্পদ উন্নয়ন, সবার জন্য ইন্টারনেট, ই-গভর্নেনস এবং আইসিটি পণ্য রফতানি। চারটি স্তম্ভেই আমরা কাজ করেছি এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি।

মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন সেন্টার চালু করেছি, আমাদের তরুণরা জাপান যাচ্ছে। ইন্টারনেটের জন্য এ বছর নতুন করে প্রায় দুই হাজার ইউনিয়নসহ সবমিলিয়ে তিন হাজারের বেশি ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার পৌঁছে গেছে। এছাড়া বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম সরকারি ডাটা সেন্টার এ বছর চালু করেছি আমরা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০০ পেটাবাইট ক্ষমতাসম্পন্ন আমাদের এই ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার উদ্বোধন করেন।

পলক আরও বলেন, হাইটেক পার্কগুলোতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আইসিটি খাতে সবমিলিয়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পেয়েছি আমরা। অন্যদিকে ই-গভর্নেন্সে ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১৬৪টি সরকারি সেবাকে আমরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে পেরেছি। আর দেশেই আইটি পণ্য প্রস্তুত এবং রপ্তানিতেও অনেকখানি এগিয়েছি আমরা। দেশেই এখন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এমনকি র‍্যাম তৈরি হচ্ছে। আগামীতে এগুলো রফতানিতে যাবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •