সিনহা হত্যায় প্রদীপ-লিয়াকতের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশিত: ৫:১৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২২

সিনহা হত্যায় প্রদীপ-লিয়াকতের মৃত্যুদণ্ড

ডেস্ক রিপোর্ট ::
কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

সোমবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে ৩০০ পৃষ্ঠার রায় পাঠ কালে তাদের দুজনের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাঈল।

এ সময় এজলাসে ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামি আসামি উপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ ও বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী ফাঁসির আদেশ দেন আদালত।

রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

আদালত বলেছেন, হত্যা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, লাথি মারা, সহযোগিতায় হত্যা, মৃত্যু নিশ্চিত, আলামত নষ্ট, খুন ও মাদক মামলা করে অপরাধ করেছেন প্রদীপ। পাশাপাশি লিয়াকত গুলি করে হত্যা, নাটক সাজানো, হত্যার পরিকল্পনা করা, শাস্তিমমূলক অপরাধ করেছেন।

এ ছাড়া এ মামলার ৬ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৭ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।

দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে এজলাসে এসে আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর মামলা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেন বিচারক। এরপর শুরু করেন অপরাধের পর্যবেক্ষণ বয়ান। সাক্ষ্য প্রমাণে কার কী অপরাধ দাঁড়িয়েছে সেসব তুলে ধরার পর হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অপরাধ অনুসারে সাজা ঘোষণাকালে প্রধান দুই অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এমনটি জানিয়েছে বিচার সংশ্লিষ্ট সূত্র।

রায় ঘোষণার জন্য ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ ১৫ আসামির সকাই আদালতে হাজির ছিলেন। কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে সোমবার দুপুর ২টার দিকে তাদের আদালতে আনা হয়।

২০২০ সালের ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপ, পরিদর্শক লিয়াকতসহ মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য, প্রদীপের দেহরক্ষীসহ আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর ২০২০ সালের ২৪ জুন চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেব আত্মসমর্পণ করলে এ মামলার ১৫ আসামিই আইনের আওতায় আসেন।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের বাহারছড়া চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে খুন হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান।
এ ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে। ওসি (বরখাস্ত) প্রদীপ কুমার দাশকে করা হয় দুই নম্বর আসামি। তিন নম্বর আসামি করা হয় বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিতকে। আদালত মামলাটির তদন্তভার দেন কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-কে। এরপর বেরিয়ে আসে মূল ঘটনা।

৭ আগস্ট মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তদন্তে নেমে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় তিন বাসিন্দা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও ওসি প্রদীপের দেহরক্ষীসহ মোট সাতজনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। এরপর ২৪ আগস্ট মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি কনস্টেবল সাগর দেবের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার ১৫ আসামির সবাই আইনের আওতায় আসেন।

চার মাসের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ৮৩ জন সাক্ষীসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‍্যাব-১৫ এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সিনহা হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে অতিরিক্ত ডিআইজি এবং লে. কর্নেল মর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তাকে সদস্য করে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এক মাসের মাথায় তদন্ত কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে পুলিশের হঠকারী (অবিমৃশ্যকারী), প্রস্তুতিহীন ও অপেশাদারি আচরণ বলে উল্লেখ করে। এ ছাড়া যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মনে অসংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে। আত্মরক্ষার আইনি সুবিধার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এসব বন্ধে কমিটি ১৩ দফা সুপারিশ করে।

তাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের ৩৩ মাসের সময়কালে ১০৬টি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হন।

মামলার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিনহা তার দলের সঙ্গী সিফাতকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ে ভ্রমণবিষয়ক তথ্যচিত্র ‘টাইম ল্যাপস’ ভিডিও করতে গিয়েছিলেন। এ সময় মেজর সিনহা ও তার সঙ্গীরা টেকনাফের নিরীহ মানুষের ওপর ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ‘অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনি’ জেনে যান। প্রদীপের অত্যাচারের শিকার কিছু মানুষের সাক্ষাৎকারও তারা নিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রদীপের সঙ্গেও সিনহা ও তার সঙ্গীদের কথা হয়। এরপর বিপদ আঁচ করতে পেরে প্রদীপের পরিকল্পনায় শামলাপুর চেকপোস্টে সিনহাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।

আলোচিত এ মামলায় এখন কারাগারে আছেন ১৫ আসামি। তারা হলেন বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের বরখাস্ত পরিদর্শক লিয়াকত আলী; টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তার দেহরক্ষী রুবেল শর্মা; বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের বরখাস্ত এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত; বরখাস্ত কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সাগর দেব; বরখাস্ত এএসআই লিটন মিয়া; বরখাস্ত এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান; বরখাস্ত কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ; টেকনাফ থানায় পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল