সিলেটের পরিবহন শ্রমিকরা বেপোরয়া – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেটের পরিবহন শ্রমিকরা বেপোরয়া

প্রকাশিত: ১০:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০১৮

সিলেটের পরিবহন শ্রমিকরা বেপোরয়া

সুলতান সুমন:: সারাদেশের তুলনায় সিলেটের পরিবহন শ্রমিকরা বেপোরয়া। সামান্য কোন ঘটনা ঘটলেই লাঠি হাতে রাস্তায় নামে এসকল শ্রমিক। কথায় কথায় বিভিন্ন সড়কের মধ্যখানে ট্রাক বা বাস দিয়ে দেয়াল তৈরি করে শুরু করে ধর্মঘট বা অবরোধ। আর এসকল কিছুর কলকাটি নাড়েন সিলেটের পরিবহন সেক্টরে একক আধিপত্য বিস্তারকারী এক নেতা। তিনিই হলেন এ সেক্টরের নাটের গুরো। গত শুক্রবার থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত সিলেটে কোন ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ পরিবহন শ্রমিকদের শুরু হয় নৈরাজ্য। আর এই নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য বৃহস্পতিবার রাতে ও শনিবার দুপুরে সিলেট নগরীর বাবনা পয়েন্টের জিঞ্জির শাহ মাজার সংলগ্ন একটি ভবনের দ্বিতলায় শ্রমিক নেতাদের নিয়ে বসে পরিকল্পনা করেন সিলেটের পরিবহন সেক্টরের নাটের গুরো ও রাজনৈতিক লেবাছে থাকা কিছু নেতা কর্মী। সিলেটে অঘোষিত ধর্মঘটের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সিলেটের পরিবহন নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা দাবি করেন, যে এটা কোন ধর্মঘট বা অবরোধ নয়। তারা তাদের গাড়ি ও যাত্রীদের নিরাপত্তা চান। কিন্তু ঐ তিন দিনের পরিবহন শ্রমিকদের সিলেটজুড়ে নৈরাজ্য দেখে মনে হয় তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারগুলোই উদ্ধার করতে ডাক দেয়া হয় অঘোষিত শ্রমিক ধর্মঘট। যার ফলে সিলেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে লাঠি হাতে শ্রমিকদের গাড়ি আটকানো, চালকদের মারধর করা ও রোগী বহনকারী যানগুলোও জোরে বলে আটকে রাখা হয়। এ সকল বিষয় নিয়ে সিলেটের জনসাধারণরে মাঝে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ আর হতাশা। ফলে সিলেটের সচেতন নাগরিকবৃন্দ জানান, পরিবহন শ্রমিকদের তান্ডব দেখে মনে হয় সমস্থ সিলেট তাদের কাছে জিম্মি। তাই এসকল জিম্মি দশা থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর শ্রমিকদের নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর ও কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া সড়ক দূর্ঘটনা রোধে সরকার গৃহিত সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে।
সূত্র জানায়, সিলেট সহ সারাদেশে বহুদিন ধরে পরিবহন খাতে নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি প্রকাশ্যে চলে আসছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা যাত্রীসেবার বদলে হয়রানি করে থাকে। অর্থাৎ যাত্রী হিসেবে আমাদের দুর্ভোগের কথা মনে থাকে সব সময়। প্রতিটি মুহূর্ত আনন্দ হরণের ভীতিবোধ তাড়িত করে। সে জন্য সড়কপথে আনন্দ ভ্রমণের কথা মনে আসে না মানুষের। বরং নিরাপত্তাহীনতার কথা বেশি করে স্মরণ হয়। একাকী যাত্রার ভীতি, তা শুধু দুর্ঘটনা নয়, সেটা আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি থাকে বিচিত্র আতঙ্কে। দুর্ঘটনা, তা রেল কিংবা বাসের সংঘর্ষ নয়, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে অপরাধীদের বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গে। রেলপথে ভ্রমণে ছিনতাই, অপহরণ অথবা ট্রেন থেকে ছুড়ে ফেলার ঘটনা অহরহ ঘটছে। নৈশকোচে ডাকাতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাছাড়া সিলেটের বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে নিত্যনৈমেত্তিক ঘটে থাকে অহরহ দূর্ঘটনা। কোথাও এমনও হয় মাইক্রো অথবা সিএনজি অটোরিক্সায় থাকা কোন যাত্রীই বেচে নেই। আবার যারা বেচে থাকে তাদেরকে পগুত্ব বরণ করে সড়ক দূর্ঘটনার অভিশাপ মাথায় নিয়ে বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন। আর এসকল ব্যপারে ক্ষোভে থাকা জনসাধারণ সড়ক অবরোধ বা গাড়ী ভাংচুর করলেই পরিবহন শ্রমিকরা চালায় পাল্টা হামলা বা দীর্ঘ ধর্মঘট। এতে করে পরিবহন সেক্টরে চরম অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা নিত্যদিন দুর্ভোগের শিকারে পরিণত হয়েছি। এসব লাঘবে যোগাযোগ ও রেলমন্ত্রীর নানা তৎপরতা আর নানা ব্যবস্থা গ্রহণের পরও দুর্ভোগ কমেনি। বরং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সিলেটের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে একেকটি দুর্ঘটনার বীভৎস চিত্র দেখে গা শিউরে ওঠে। পথে বের হলে নিরাপদে বাড়ি ফেরা যাবে কি না এর ভরসা নেই। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে হাইওয়ে সড়কগুলোয়। উপরন্তু বিচারহীন, প্রতিকারহীন ঘটনা ঘটতে থাকলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। এ জন্য দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে যায়। কিংবা অনেক চালকের নিজের প্রাণও বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত আইনটি দুর্বল হওয়ায় অভিযুক্তরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, সিলেটের বিভিন্ন সড়কে গাড়ী চালকদের নেই বৈধ লাইসেন্স। সিলেট থেকে তামাবিল মহাসড়কের যে সকল লেগুনা বা বাস গাড়ি চলাচল করে এসকল গাড়ির চালকদের বয়সও নেই তেমন। তাছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। আর লেগুনা চালাতে দেখা যায় শিশুদেরকেও। ফলে ঐ সড়কে প্রতিনিয়তই ঘটে নানা দূর্ঘটনা। প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাতে হয় নানা শ্রেণী পেশার ও নানা বয়সের মানুষকে। অপরদিকে, ঢাকা টু সিলেট বা সিলেট টু ঢাকা মহাসড়কে ঢাকাগামী বা সিলেট গামী মহাসড়কে যাতায়াতরত প্রতিটি দূরপাল্লার বাস বা ট্রাক দ্রুত সময়ে তার নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছানুর জন্য নামে রেইসিং প্রতিযোগিতায় ফলে প্রতিটি সময়ে ঐ সড়কে ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। আর প্রতিটি দূর্ঘটনায় দুই থেকে চার জন বা এর অধিক সংখ্যক লোক প্রাণ হারাণ। এ সকল হতাহতের কয়েকটি ঘটনায় আইন আদালত হলেও সহজেই আইনের ফাঁক পোকর দিয়ে পার পেয়ে যায় গাড়ির চালক ঘাতক।
এ ব্যাপারে গাড়ীর মালিক ও নানা শ্রেণী পেশার একাধিক লোকজন জানান, সড়কের উন্নয়ন, চালকের প্রশিক্ষণ ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি তিনটি কাজকে প্রাধান্য দিলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। সচেতন হতে হবে যানবাহনের চালক, মালিক ও পথচারীদেরও। মহাসড়কে পুলিশি টহল বাড়াতে হবে। দুর্ঘটনা রোধে আরো ভূমিকা রাখতে হলে লোকবল ও আনুষঙ্গিক সুবিধা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বাকিদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত ব্যক্তিদের চিকিৎসা জটিল। এ জন্য দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সচেতন নাগরিকবৃন্দ আরো জানান, পরিবহন শ্রমিকনেতাদের মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশের জন্য চালকই দায়ী। তাঁদের আচরণ পাল্টাতে হবে। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে নজরদারি বাড়াতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাইলে সরকারকে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল