সিলেটের ভাসমান হকাররা বেপরোয়া – দৈনিক সিলেটের দিনকাল

সিলেটের ভাসমান হকাররা বেপরোয়া

প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০১৬

সিলেটের ভাসমান হকাররা বেপরোয়া

2-42 hokar fotpatবেপরোয়া হয়ে উঠেছে সিলেটের ভাসমান হকাররা। রাজনৈতিক লেবাসে তারা নগরীর রাজপথ, সরকারি মাঠ, অফিস আঙ্গিনা বছরের পর বছর দখলে রাখার পর এখন অবস্থান পাকাপোক্ত করতে শুরু করেছে। অফিসে চালাচ্ছে হামলা। দিচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি। আর এসব ঘটনায় রীতিমত উৎকণ্ঠা শুরু হয়েছে সিলেটে। এই হকারদের নেতৃত্ব দিচ্ছে শাসকদল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা। এ কারণে পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তারা হয়ে পড়েছেন অসহায়। এই সুযোগে মাঠ পর্যায়ের পুলিশও করছে দেদারসে চাঁদাবাজি। সিলেটের ফুটপাথ ও মাঠ দখলে থাকা হকারদের কাছ থেকে প্রতিমাসে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। সম্প্রতি নগরীর প্রধান ডাকঘরের সামনে এলাকা ৪ লাখ টাকায় ২০ জন হকারকে মৌখিক লিজ প্রদান করা হয়েছে। শহরের অন্যতম সমস্যা ভাসমান হকাররা। এই সমস্যা নিয়ে বিগত এক দশক ধরে রাজনৈতিক কেন্দ্র-বিন্দুতে তারা। সব কটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের অন্যতম নির্বাচনী ওয়াদা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেটের অবৈধ হকার উচ্ছেদ। হকারদের জন্য মার্কেট আছে। সিটি করপোরেশন শত শত কোটি টাকা খরচ করে এসব মার্কেট নির্মাণ করলেও হকাররা সেখানে যাচ্ছে না। ওয়ান ইলেভেনের সময় তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অ্যাকশন শুরু হয়েছিল। ওই সময় তাদের পুনর্বাসনের জন্য নির্মিত হকার মার্কেট নির্ধারণ করা হয়। শুরু করা হয়েছিল  বৈকালিক মার্কেট। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন জিরো টলারেন্স দেখানোর কারণে হকাররা বাধ্য হয়েছিল সরে যেতে। এরপর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও তার নির্বাচনী ওয়াদায় রেখেছিলেন হকারদের উচ্ছেদ করা। গেল সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীও হকার উচ্ছেদের ওয়াদা করেছিলেন। নির্বাচিত হয়ে আরিফুল হক চৌধুরী সে ওয়াদা রক্ষার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ায় সে উদ্যোগের আর বাস্তবায়ন হয়নি। আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও হকার উচ্ছেদে বার বার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। হকারদের উচ্ছেদ করতে তিনি প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সিলেটের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বার বারই অর্থমন্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন সিলেটের কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা হকার উচ্ছেদে বিরোধিতা করছেন। ফলে অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগও এখানে ভেস্তে যায়। এরপর হকার সমস্যা নিয়ে সিলেটের ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ বিভিন্ন মহল যতবারই অর্থমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন ততবারই অর্থমন্ত্রী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য তাদের জানিয়ে দেন। তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। এ কারণে সিলেটের জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন এ বিষয়টি নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেয় না। খোদ জেলা প্রশাসনের সামনে ও সিটি করপোরেশনের সামনে ও ভেতরে হকাররা অবস্থান করে ব্যবসা করলেও তাদের দিকে মুখ ফিরে তাকাচ্ছেন কর্মকর্তারা। সিলেটের কীনব্রিজের উত্তরপাড় সুরমা মার্কেটের সামনে থেকে জিন্দাবাজার, আবার কীনব্রিজ থেকে ধোপাদিঘীর পাড় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা হকারদের দখলে। সিলেটে প্রাণকেন্দ্রের রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করে হকারদের ব্যবসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী। তারা বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাননি। শেষে বাধ্য হয়ে জোর খাটাতে গিয়ে হকারদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু সংঘর্ষে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে মধুবন, হাসানমার্কেট, শুকরিয়া মার্কেট, প্লাজা, মিতালী ম্যানশন, লন্ডন ম্যানশন, সমবায় মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটের ব্যবসায়ী অসহায় হয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় গত দুইদিন ধরে দুটি অফিসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে হকারদের। সিলেটের রেজিস্ট্রার মাঠ অর্ধেকের বেশির ভাগই দখলে হকারদের। অনেক আগে থেকেই হকাররা একটি, দুটি করে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে ওই মাঠটি এখন দখলে নিয়েছে। মাঠটি সিলেটের ্‌ঐতিহাসিক। সিলেটের আন্দোলন সংগ্রামের স্মৃতি বিজড়িত ওই মাঠ। কিন্তু হকাররা ধীরে ধীরে মাঠটি দখল করে হকার মার্কেট বানিয়ে দিচ্ছে। আর নিয়মিত ওই মাঠ থেকে টাকা আদায় করছে হকার লীগের কয়েকজন সদস্য। মঙ্গলবার মাঠ দখল নিয়ে সাব রেজিস্ট্রারি অফিসের দলিল লেখকরা বাধা প্রদান করলে হকার লীগের কয়েকজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এমনকি তারা সাব রেজিস্ট্রারি অফিসেও ভাঙচুর চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩২ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছুড়ে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনার পর থেকে আন্দোলনে রয়েছে দলিল লেখকরা। তারা ঘটনার পর পরই ৪ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে। বলেছে, শনিবারের মধ্যে হকার উচ্ছেদ না হলে তারা কর্মবিরতি শুরু করবেন। হকার উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে তারা গতকাল সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও স্মারকলিপি দিয়েছে। সিলেটের দলিল সমিতির সাধারণ সভাপতি হাজী মাহমুদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলাম খান সায়েক গতকাল জানিয়েছেন, হকাররা সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালালো। উল্টো এখন পুলিশ মামলায় দলিল লেখকদের হয়রানির পাঁয়তারা করছে। তারা বলেন, এবার কোনো রাজনৈতিক ভাওতাবাজি নয়। রেজিস্ট্রি মাঠ থেকে হকার উচ্ছেদ না হলে আন্দোলন চলবে। তারা বলেন, রেজিস্ট্রি মাঠে দিনে ব্যবসা ও রাতে অসামাজিক কাজ হয়। এতে করে গোটা রেজিস্ট্রি মাঠ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এদিকে, সিলেট হেড পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে হকার ও শ্রমিক নামধারীরা। ফলে চরম নিরাপত্তাহীন সিলেট হেডপোস্ট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। এ ঘটনায় মঙ্গলবার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। শ্রমিকলীগ ও হকারলীগ একটি স্বার্থান্বেষী মহল সিলেট হেড পোস্ট অফিসের ফটক ও সামনের ফুটপাথ ভাসমান দোকানিদের কাছে লিজ দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা  হাতিয়ে নেয়। ফলে সিলেট হেড পোস্ট অফিসের সার্বিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ কারণে পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা ভাসমান সবজি ও পিয়াজ ব্যবসায়ীদের গেইট ও সামনের ফুটপাথে দোকান বসাতে বাধা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে হকার ও শ্রমিকলীগ নামধারী চাঁদাবাজরা। তারা সোমবার দলবদ্ধ হয়ে পোস্ট  অফিসে হানা দেয় এবং আর্মগার্ড আবদুল মুহিতসহ কর্মকর্তা কর্মচারীদের অপহরণের হুমকি দেয়। তাদের এ হুমকিতে ডাকঘরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। অনেকে প্রাণভয়ে কর্তব্য পালনে অফিসে আসতে পারছেন না। তাই সিলেট হেড পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিরাপত্তা চেয়ে মঙ্গলবার সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

ফেসবুকে সিলেটের দিনকাল